.
১০০.
গরুর পালের পাড়ে ও বাঁধে ওঠা
মাঝখানের এই গভীর খাতটুকু বেশি চওড়া নয়। মোষটার পাশে-পাশে সাঁতার দিতে-দিতে নিতাই বোঝে, নিশ্চিতভাবেই তার আগের বোঝাটা বোঝে-বানার জল ঢুকে গেছে। সামনের মোষটা এরকম ভেলার মত ভেসে যাওয়ায় পেছনের গরুগুলোও গা এলিয়ে ভেসে থাকে। কিন্তু, নিতাই যেমন তার শরীর দিয়ে বোঝে, এই এতগুলো পশু তাদের এতগুলো শরীর দিয়ে নিশ্চয়ই তার মতই, বা তার চাইতেও বেশি করে বুঝছে এতক্ষণ তারা হাঁটু জল দিয়ে হেঁটে এসে এই যে-গভীর জলে পড়ল সেটার রকম-সকম আলাদা। কিন্তু সেটা বুঝে উঠতে-উঠতেই মাঝখানের সোঁতাটা শেষ হয়ে যায়। মোষটা পায়ে মাটি পায়, মাটি পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, কিন্তু পাড়ে ওঠার জন্যে পা তোলে না। নিতাই একটু এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, দাঁড়িয়ে পা দিয়ে দিয়ে অনুভব করে এখানেও জলের নীচে পাড় ভেঙেছে। সে দাঁড়িয়ে দেখে, এই গরুর পালের গায়ে লেগে সোঁতার জলটা একটু আবর্তিত হচ্ছে আর ফেনা উঠছে। গরুগুলোর ফাঁক দিয়ে বা থেকে ডাইনে জল বয়ে যাচ্ছে–একটু ফেনা তুলে।
নিতাই পায়ে-পায়ে পাড়ের আন্দাজ নিয়ে পালটা থেকে একটু উত্তরে সরে। সেখানে জায়গা পেয়ে যায়। নিতাই সেখানে দাঁড়িয়েই ডাকে আয়-আয়, আর জিভে টর-র-র-র আওয়াজ তোলে।
মোষটা প্রথমে তাকিয়ে দেখে-ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে, তারপর আস্তে ডাইনে ঘোরে। তার পেছন-পেছন গরুগুলোও পা ফেলে। একটু ফাঁক হতেই একটা শব্দ তুলে স্রোতের জল বেরিয়ে যায়–এতটা স্রোত এই সোঁতায় কখনোই থাকে না। নিতাই জলের বেরিয়ে যাওয়া দেখে অনুমান করে কতটা বেগে জল এখানে ঢুকছে। বানা এসে গেছে।
নিতাই একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। মোষটা কাছে এসে পঁড়াতে সেই অন্যমনস্কতা নিয়েই সে তার গলার দড়িয়ে হাত দিয়ে আবার স্রোতের দিকে তাকায়–পালের গরুগুলোর গায়ে কত জোরে স্রোতটা আছড়ে পড়ে, যেন সেটা আন্দাজ করতেই। মোষটা তার মাথা ঝাঁকিয়ে নিতাইকে মনে পড়িয়ে দেয়–তাদের এখন পাড়ে ওঠার কথা। নিতাই তাড়াতাড়ি মোষটার আড়াআড়ি দাঁড়ায়, দুহাত দিয়ে ওপরের বাছুরটাকে ধরে, চেঁচিয়ে ওঠে, হে এ গজেন, অমূল্যা, ধর, এইখানে আয়।
নরেশ নিচু স্বরে জানায়, তুল না তুই, আছি।
নরেশ কখন সেই দক্ষিণ পাড় থেকে এই এতটা রাস্তা পার হয়ে এসে এপারে উঠে গেছে? তা হলে তিস্তা ব্রিজেও কি বানের ধাক্কা লাগতে দেখে এসেছে নরেশ? নিতাই ভাবে বটে কিন্তু জিজ্ঞাসা করতে পারে না।
মোষটা আস্তে করে তার সামনের বা পা তোলে। একটু সময় নিয়ে সে ডান পাটাও পাড়ে তুলে দেয়। তার পর একটু সময় নিয়ে, বা, বাছুরটাকে সামলাবার জন্যে নিতাইকে একটু সময় দিয়ে, অত বড় শরীরটাকে একটা ঝাঁকিতে পাড়ের ওপর তুলে, পেছনের পা দুটো দ্রুত টেনে বোল্ডার আর জলের মাঝখানের সঙ্কীর্ণ জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে পড়ে।
জলের সোঁতাটা, বা নদীর শাখাটা পেরবার চাইতেও নদীর পাড় থেকে বাঁধের ওপর ওঠাটা গরুর পালের পক্ষে কঠিন। বাঁধের মাটি বৃষ্টিতে যাতে ক্ষয়ে না যায় আর স্বাধ আর নদীর মাঝখানের পাড়টুকু যাতে স্রোতে না ভাঙে সেজন্যে বোল্ডার দিয়ে পুরোটা বাধানো-সে বোন্ডার আবার তারের জালে ঢাকা। পাড়ের বোন্ডার আর জলের সীমানাটুকুতে একফালি জমি। অনেক জায়গায় সে জমি ভেঙে গেছে, অনেক জায়গায় জলসহ বোল্ডার একেবারে জলের মধ্যে ঝুলে পড়েছে। ঐ সঙ্কীর্ণ জায়গা দিয়ে গরুর পালটা চলতে পারবে না। আর বোল্ডারের ওপর পা দিয়ে গরুগুলো এমনিতেই উঠতে পারবে না–তাদের ক্ষুর বোল্ডারে পিছলে যাবে; তারের জালের জন্যে আরো পারবে না–তারে পা আটকে যাবে।
গজেন আর নরেশ আগেই একটা ডাঙার কাছে দুটো সমতল বোল্ডার পাশাপাশি দিয়ে সিঁড়ির মত করে রেখেছে। সেটা দিয়ে উঠে তারের জালে আটকানো বোল্ডারগুলোর দুটো সারি পেরতে পারলেই একটা বোল্ডারহীন নালী পাওয়া যাবে। নালীটার ওপরের দিকে আবার বোল্ডার ও তারের জাল। একমাত্র এই পথটা দিয়েই গরুর পালটাকে তোলা যাবে। গজেন আর নরেশ মোষটাকে সেদিকেই নিয়ে যায়–গজেন মাটিতে মোষের গলার দড়িটা-ধরে, আর নরেশ বোল্ডারের ওপর দাঁড়িয়ে দেখে কোনো মোষটা আবার পাড় ভেঙে পড়ে যায় কি না।
জায়গাটা এতই সরু যে এমনি দেখলে মনেই হত না ওখান দিয়ে কোনো গরুর পক্ষে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু গরুগুলো পা ফেলে ঘেঁষে-ঘেঁষে–তাতে তাদের পায়ে-পায়ে একটু লেগেও যায় বটে কিন্তু এতই আস্তে যাচ্ছে যে কোনো গরু হুমড়ি খায় না। তারা বোল্ডার ঘেঁষেই চলেপেটটা বোল্ডারে ঘষে যায়, এইমাত্র। নরেশ কোমর ভেঙে গরুগুলোর পিঠ ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেয়।
জলের ভেতর থেকে নিতাই চিৎকার করে বলে, হে-এ নরেশ, একখান্ বোল্ডার ফেল্যা এইখ্যানে, মাটি ভাইংগ্যা গিছে। নরেশ দেখে, প্রফুল্ল পালের বুড়ি ও ধুমসো গরুটাকে নিতাই পাড়ে তোলার চেষ্টা করছে–সে গরুটার সামনে, বালিশ আর সালিশ দুই পাশে আর বলরামের ছেলেটা পেছনে। বাকি গরুগুলো জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে।
আরে আরে–খাইছে রে খাইছে–ঐ বুড়িটারে তুললি ত এই ফালি দিয়্যা এক পাও আগাইবার পারব না, হে-হে-হে, বলতে বলতে নরেশ বোল্ডার থেকে ফালিটুকুতে নামে আর নেমে চেঁচায়–এই ন্যাতাই, আরে বুড়িটা পাশে রাখ, শ্যাষে তুলিস, চেঁচাতে-চেঁচাতে নরেশ গরুগুলোর পিঠে হাত ছুঁইয়েই যায়, ঘাড় নদীর দিকে ঘুরিয়ে রেখে।
