বালিশ-সালিশ দু জনেই পালের ভেতরে ঢুকে, হাতের লাঠি আর কঞ্চিটাকে ওপরে তুলে এ-গরুকে সরিয়ে, ও-গরুর পাশ দিয়ে মোষটার কাছে পৌঁছে যায়। তারপর বালিশ মোষের গলার দড়িগাছটা ধরে সেটাকে পাল থেকে বাইরে আনতে চায়। মোষটা মুখ নাড়িয়ে বালিশের হাতটা সরিয়ে দেয়। বালিশ দাঁড়িয়ে মোষের নাক ঘেঁয় মাত্র। সে হাতটা আবার মাথার ওপর তুলে আবার মোষের গলার দড়ি ধরে টেনে সরু গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, চল, কেনে, চ-ল, আগত চল্।
মোষটা এবার মাথা ঝাঁকিয়ে বালিশকে সরায় না বটে কিন্তু মুখটা একটুও নড়ায় না। বালিশ চল কেনে, চল বলতে বলতে টানতে-টানতে দড়ি ধরে প্রায় ঝুলে পড়ে কিন্তু মোষের গলার মাংসপেশীতে দড়িটা আরো বসে যায় মাত্র। মোষটা ঘাড় আর-একটু তুলে দেয়–বালিশের নাগালের বাইরে। বালিশ দড়ি ছেড়ে দেয়। মোষটা তার লেজ ঝাপ্টায়।
সালিশ হঠাৎ একটা লাফ দিয়ে দড়িটা ধরে ঝুলে পড়ে চেঁচায়, হে–এ বালিশ, পাছত খোঁচা মার কেনে, হেট, হেট, আগত-আগত।
ঠিক সেই সময়ই নিতাই সামনে থেকে টাকরায় ভি ঠেকিয়ে টরররর আওয়াজ তোলে বার দুয়েক আর চেঁচায়–হে-এ-এ-এ, আয় কেনে–এ-এ-এ। বাতাসের ঝাপ্টায় সে-আওয়াজের অনেকটা ভেসে চলে যায় বটে কিন্তু সেটুকু অন্তত পৌঁছে যায়, যাতে মোষটা বুঝতে পারে তাকে ডাকা হচ্ছে। সে ধীর পায়ে সালিশের টান অনুসরণ করে সারি থেকে বাইরে বেরতে ঘাড় ঘোরায়।
মোষটা খুব ধীর পায়ে চলে, তার পিঠের ওপর বাছুরটা দাঁড়াতে গিয়ে আবার পা মুড়িয়ে ফেলে আর মোষটার পেছন-পেছন গাইটাও বাছুরের দিকে গলা তুলে সারি থেকে বেরিয়ে আসে। সেই সারির পাশ দিয়ে তারা নিতাইয়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। নিতাই মোষের গলার দড়িটা ধরে তাদের বলে, যা, আস্তে-আস্তে পার হবি, হাল্লাগুল্লা করিস না। নিতাই আর দাঁড়ায় নামোষের দড়িটা ধরে নদীর দিকে হাঁটে। এখনো বানার জল ঢোকে নি কিন্তু গত কয়েক দিনের বৃষ্টির জলে ত এই চেনা নদীটাতেও অচেনা গন্ধ লেগে গেছে। জল ঠাণ্ডাও বটে। সারা রাত গোয়ালের গরমে কাটিয়ে জলে পা দেয়া মাত্র যদি গরু বা মোষ ভয় খেয়ে যায় তা হলে সারাটা পালই ছত্রখান হয়ে যাবে, এদিক-ওদিক দৌড়তে শুরু করবে, কোনো-কোনোটা জলে গিয়েও পড়তে পারে। পেটে জল লাগলেই ভয় পেয়ে যাবে–ভাবতে পারে তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
নিতাই জলে নেমে যায়, তার হাতটা মোষের দড়িতে, মোষটাও জলে নেমে কয়েক পা এগিয়েছে, হঠাৎ নিতাই গর্তে পড়ে যায়–পড়ে যাওয়ার আগে সে মোষের দড়ি ছেড়ে দেয়-না হলে মোষটাও পড়ে যেত। নিতাই, ধুস শালা বলে উঠে পেছিয়ে আবার পাড়ে উঠে আসে। পাড় থেকে একটা লাঠি মত তুলে সে আবার তাড়াতাড়ি মোষটার কাছে চলে যায়। মোষটার পা যদি আচমকা গর্তে পড়ে, তা হলে ওর পিঠ থেকে বাছুরটাও পড়ে যেতে পারে একেবারে নদীর মধ্যে। এখন লাঠিটা দিয়ে গর্ত বুঝে-বুঝে নিতাই হাঁটে আর মোষটাকে টানে–নিতাইয়ের বা হাতে লাঠি, ডান হাত মোষের গলার দড়িতে।
মোষটা যেন বুঝেই যায় তাকে খুব আস্তে-আস্তে বুঝেশুনে পা ফেলতে হবে। নিতাই লাঠি ফেলে দেখে পা ফেলে এগবার পর সে পা ফেলে এগয়। সাঁতার জল পর্যন্ত গেলেই মোষটা ভেসে যেতে পারবে। একটু কি বেশি ঠাণ্ডা লাগছে জল, এখন? বানার জল কি ভেতরে-ভেতরে ঢুকে গেছে। মোষটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে–আ-আ-আ-আঁ আওয়াজ তোলে। মোষ জলে ভয় পায় না, বরং আরাম পায়। সে জন্যে মোষটাকে দিয়ে এই পাল পার করানোর সুবিধে অনেক। হে-এ টরররর তালু দিয়ে আওয়াজ তোলে নিতাই। কিন্তু মোষটা নড়ে না। নিতাই পেছিয়ে গিয়ে মোষের পিঠের বাছুরটাকে দেখে-বেটা একটা পা পিঠ ছাড়িয়ে বাইরে বের করে দিয়েছে, ফলে তার শরীরটাও গড়িয়ে এসেছে, তার ঠিক পেছনে সেই গাই। এটা পেছনে আছে বলেই গোলমাল হচ্ছে। নিতাই লাঠিটা দিয়ে গাইটার মুখে মারে–শালো, গা চাটিবার ধরিছেন?
গাইটা ঘাড় নামিয়ে মুখটা সরিয়ে নেয়। নিতাই জলের মধ্যেই উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে পা-টা সহ বাছুরটাকে ভেতরে ঠেলে দেয় আর সঙ্গে-সঙ্গে মোটা চলতে শুরু করে। শুরু করে কিন্তু থেমে যায়। নিতাই আবার সামনে গিয়ে বা হাতে মোষের দড়ি ধরে। টাকরায় আওয়াজ তোলে–টবর রর-অ। মোষটা আবার পা ফেলে।
কিন্তু লাঠিসহই নিতাই একেবারে হুড়মুড় করে পড়ে যায়। পড়ে গিয়ে বোঝে ডুবজল। লাঠি ফেলে দিয়ে জলে হাতটা মারতেই সে স্রোতের টানে সরে যায়–আইস্যা গেছে রে, বান ঢুইক্যা গিছে। কিন্তু একটা ডুব দিয়েই নিতাই তার শরীরটাকে কজা করে ফেলে। সে চেঁচায় না। ভয় পেয়ে যাবে সবাই। এখন পালের অর্ধেকটাই জলে। এইবার মোষটা ডুবজলে নামবে। স্রোত ঢুকেছে কিন্তু জল এমন কিছু বাড়ে নি। নিতাই পা দিয়ে আন্দাজের চেষ্টা করে, যেখান থেকে সে পড়ে গিয়েছে সেই জায়গাটা কোথায়। পায় না। মোষটা দাঁড়িয়ে আছে একেবারে ডুবজলের কিনারায় হাঁটুজলে। নিতাই কী করে বোঝাবে, আর-এক পা পরেই ডুবজল, স্রোতের জল। যদি বোঝানো যেত তা হলে মোষটা সে ভাবেই নিজেকে ভাসিয়ে দিত। কিন্তু বোঝাবে কী করে নিতাই? মহিষটা ত ভাবব্যার ধরছে আস্তে-আস্তে ভাসব্যার লাগবে। গজেনকে ডাকবে? কিছু ঠিক করতে না পেরে আর স্রোতের ধাক্কায় সে যাতে সরে না যায় সে জন্যে, নিতাই হঠাৎ মোষটার বা পাটা হাটুর নীচে চেপে ধরে, যেন ওটা একটা খুঁটি। মোষটা তাতে কিছু বোঝে। সে আ-আ-আ-আঁ করে একটা ডাক ছেড়ে নিতাইয়ের হাতসহ বা পাটা তোলে, ও, নিতাই বোঝে, ডুবজলের দিকে এগিয়ে দেয়। সেই পা ভোলার ভঙ্গিতেই নিতাই বুঝে ফেলে মোষটা জেনে গেছে আর-এক পা পরেই ডুবজল। সে মোষের গলার তলা থেকে টরররর-অ করে ডেকে ওঠে। ডাকতে-ডাকতে নিতাই দেখে মাথার ওপর নেমে আসা আকাশটাতে নিজের মেঘের মত গলাটা বাড়িয়ে দিয়ে মোষটা তার ডান পাটাও ওঠাল আর নিমেষে চওড়া কাধটাকে জলের ভেতরে আরো চওড়া করে গলাটা তুলে ফেলল। সামনের পাদুটোকে যে জলের মধ্যেই একটু উঁচু করে জলে ভেসে উঠল, তাতেই তার পেছনের পা দুটো লম্বা হয়ে গেল, পিঠের উচ্চতা কমে গেল আর জলের মধ্যে সেই পিঠের ওপর বাদামি বাছুরটা ভাসতে-ভাসতে চলল, তার একটুও ঝাঁকি লাগে না। নিতাই মোষটার গলা জড়িয়ে ভেসে ওঠে, তারপর তার পাশে-পাশে সাঁতার কাটে–জিভে আওয়াজ তোলে–টরররর-অ।
