সেই গরুর পালের মাঝখানে, সবচেয়ে উঁচুতে মোষের কালো কুচকুচে পিঠের ওপর বাদামি বাছুরটা আবার পায়ের ওপর উঠতে যায় আর তার ঘাড় ভেঙে যায়। মোষটা তার গলা উঁচু করে। শিঙ দুটো বাতাসকে বেঁকিয়ে দেয়। সেই কানো শিঙ এতই বাঁকানো যে তলার দিকটা ভিজে কাল হয়ে গেছে কিন্তু উঁচলো বাকটার নীচে জল লাগতে পারছে না, সেটা ধূসরই আছে! মোষটা যেকারণেই হোক একটু অস্তির হয়ে ওঠে–হয়ত ও বুঝেছে তার একটা বিশেষ দায়িত্ব আছে, হয়ত তার মালিকের কোনো হদিশ পাচ্ছে না বলে একটু অনিশ্চিত ঠেকছে তার। সে তার লেজের ঝাঁপট মারে। যার বাছুর সেই গাইটা দাঁড়ানোর সুযোগে জিভটা বাড়িয়ে তুলে বাছুরটাকে চাটতে চাইছিল। দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হচ্ছিল, বুঝিবা পেরে যাবে। মোষের লেজটা তার মুখে ঝাপটা মারে। বোধহয়, চোখেও লাগে। গাইটা চোখ কুঁচকে মুখটা নামিয়ে বা দিকে ঘুরিয়ে নেয়। পালটা এইটুকু মাত্র দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যেই মাঝখানে এক এঁড়ে সামনের গরুটার ওপর দুই পা তুলে দেয় আর গরুটা সামনে হুমড়ি খায় এক বাছুরের ওপর। এঁড়ে পড়ে যায়। কিন্তু বাছুরটা গিয়ে পড়ে আর-এক বাছুরের ওপর। সে বাছুরটা ভাবে, আগের বাছুরটা তাকে টিসচ্ছে। সেটা শিঙ নামিয়ে তেড়ে যায়। পালের ঐ জায়গাটাতে একটা ধাক্কাধাক্কি পড়ে যায়।
নিতাই হঠাৎ লাফিয়ে সালিশের হাত থেকে তার লাঠিটা কেড়ে নিয়ে এড়েটার দিকে ধেয়ে যায়। এড়েটা বুঝতে পেরেছিল। সেটা প্রথমে ডান দিকে মুখ ঘোরায়, তারপর মুখ গলিয়ে একটু ফাঁক তৈরি করে উল্টো দিকে দৌড় দেয়। নিতাই ছিল পালের বায়ে, আর এঁড়ে দৌড়য় ডাইনে। ফলে নিতাই তার পেছনে ছুটতে পারে না। সে লাঠিটা উঁচিয়ে চেঁচায়–বাদ দে, ওটাক নিবার লাগিবে না, শালা, গরম খাইলেই হই! বানা নাই, ভাসা নাই, শালো বলদা!
কিন্তু বালিতে এডেটা দৌড়তে পারে না। ওদিক থেকে বালিশ দৌড়ে সেটাকে ধরে ফেলে।
নিতাই পালটার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ায়, নদীর দিকে পেছন করে–যেন একবার দেখতে চায় কোনো নতুন ব্যবস্থা নিতে হবে কিনা। সে একবার ডাইনে তাকায় নদীর ওপরটা অনেক দূর পর্যন্ত পরিষ্কার কিন্তু পারে এখনো আবছা অন্ধকার। নিতাই আকাশের দিকে তাকায়–আকাশ একেবারে মাটির বুকের ওপর নেমে এসেছে। পারের ঐ অন্ধকার আর আজ যাবে না। কদিন পর যাবে–এখন তাও বলা মুশকিল। বন্যাটা যেন উত্তরে, নিতাইয়ের বায়ের পাহাড় থেকে নামছে না–সমস্তটা আকাশই বন্যা হয়ে যেন এই চরের পৃথিরীর ওপর এসে পড়েছে। একেবারে পিষে মেরে ফেলবে। নিতাই আবার ডাইনে তাকায়, পুবে। তার লম্বা বাবরি চুলগুলো তার মাথা থেকে সমকোণে উড়তে থাকে। সে বা হাত দিয়ে চুলগুলোকে মুঠো করে ধরে কিন্তু ঘাড় ঘোরায় না। তার চোখে-মুখে জল আর বালির সুচ এসে বেঁধেনিতাই ঘাড় ঘোরায় না। ওদিক থেকে বান আসবে না, কিন্তু ওদিক থেকেই ত বাতাস আসছে, বৃষ্টি আসছে আর চরের পৃথিবীটাকে ঢেকে ফেলে নীচে নামা এই যে-মেঘ তার ওপর দিয়ে, তার ভেতর দিয়ে দিয়ে, আরো বহু মেঘ হু হু করে এদিকে ছুটে আসছে, ছুটে যাচ্ছে আরো উত্তরে। আরো বৃষ্টি হবে, আরো বন্যা আসবে। নিতাই সেই আগামী বৃষ্টি আর আগামী বন্যার আন্দাজ করতে, সামনের গরুর পালটা ভুলে গিয়ে শুধু তার ঘাড়টা ডাইনে ঘোরায়, আকাশে তোলে, আবার নামায়। নিতাইয়ের ধুতিটা যেন তাকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে চরে ফেলে দেবে এরকম ভাবে তার গায়ে সঁটে আর খসে।
নিতাই গরুর পালটার ওপর দিয়ে একবার চোখটাকে মেলে দেয়–পালের পেছনে, সেই খেতবাড়ির রাস্তায়, আরো পেছনে গ্রামের সেই রাস্তায়। এত কাছে গ্রামের সেই গাছগাছড়া। অথচ এখান থেকে দেখাচ্ছে যেন ঐ আকাশটাই নেমে এসে গ্রামের বেড়া হয়ে গেছে।
নিতাইয়ের মনে হয় সে এই গ্রামটাকে কি শেষবারের মত দেখছে? ঐ যে-গ্রামটা এখন তার চোখের আড়ালে চলে গেছে, বৃষ্টি আর বাতাসের ধূসরতায় যে-গ্রামটাকে সে দেখতে পাচ্ছে না ভাল করে-সেই গ্রামটাব গাছগাছালি বাড়িঘর জোতজমি সব, সব নদীর ঘোলা জলের তলায় চলে যাবে? নাকি, সে চলে যাওয়া শুরু হয়েই গেল? এখনো চর ডাঙাই আছে, এখনো এই নদীতে বানা ঢোকে নি কিন্তু আকাশ আর বাতাসের যা চেহারা তাতে ঐটুকুই মাত্র বাকি, বাকিটুকু ঘেরা হয়ে গেছে। নিতাইয়ের জীবনে প্রথম স্বাদ যে-নদীর তার ধাত আলাদা, জল আলাদা। আর এ-নদী ত নিতাইয়ের পুরো বয়সের নদী। জলের ভাষা নিতাই তার জলের তৈরি শরীর দিয়ে বোঝে।
নিতাই গরুর পালের দিকে তাকায়। পুরো পালটা যেন তার জন্যে অপেক্ষা করে আছে–সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে। বন্যার ভয়ে গরুগুলোকে বাধে তুললেও অনেক বার হয়ত বন্যা আসে নি কিন্তু গরু সনো মানেই ঘর ভাঙা। এই গরুর পাল ওপারে উঠিয়ে দিয়েই গ্রামের মানুষগুলোকে বাধে তুলতে হবে। কিন্তু নিতাই কেন তুলবে? সকলেই ত আকাশ দেখছে, বাতাস দেখছে। না। নিতাই কাউকে ডাকার আগেই হয়ত দেখা যাবে গ্রামের কিছু-কিছু লোক এখানে এসে জড়ো হয়েছে। হোক। এমনিতেই হবে। নজের গরুর গন্ধ ছাড়া আর কতক্ষণ এই চরের ঘরে বসে থাকতে পারবে?
নিতাই দেখে গরুগুলো পা বদলাচ্ছে। না, আর দেরি করা যায় না। সে সামনের গরুটির গলার দড়ি ধরে নদীর দিকে এগুতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। গরুটাকে ছেড়ে দেয়। তারপর চিৎকার করে বলে, হে-এ সালিশ, মইষটাক নিয়া আয় এইঠে।
