.
০৯৯.
গরুর পালের পাড়ে ও জলে নামা
জলের একটা গন্ধ আছে–গরুরা সে গন্ধ, চেনে। কিন্তু এখন জলের কোনো গন্ধ পাচ্ছিল না। বাতাস এলোমেলো ঝাঁপটে বইছিল, আর বাতাসের সঙ্গে মিশে ছিল সুচের মত জল। ধীরে-ধীরে গরুগুলোর বা দিকের পিঠের লোম ভিজে ওঠে বাতাসের ঝাপটা ঐ দিক থেকেই আসছিল। তাদের গায়ের লোমগুলো বাতাসের ঝাপসায় সরে-সরে যায় আর সেই ফাঁক দিয়ে জল একটু-একটু গড়ায়। তাদের বা মুখের লম্বা পাশটার নোমও সেরকম ফাঁক হয়ে থাকে আর সেই ফাঁক দিয়ে জল গড়িয়ে গলার দিকে নামে। বা দিক থেকে আসা বাতাস আর জলের ঝাপটা থেকে মুখটা বাঁচাতে পুরো পালটাই একটু ডান দিকে মুখটা ফিরিয়ে রাখতে চাইছিল। তাদের পা সোজা যাচ্ছে, তাদের শরীর সোজা আছে কিন্তু তাদের মুখগুলো একটু ডাইনে ফিরতে চাইছে। তাতে তাদের গতি এই খেতবাড়িতে আরো একটু কমে আসে। আর তাদের নাক থেকে জলের গন্ধ ক্রমেই হারায়। যতই তারা নদীর কাছাকাছি হয়, যতই তাদের বা চোখ, মুখ ও নাকের বা পাশ জলে ভিজে ওঠে, ততই তারা জলের গন্ধ থেকে দূরে সরে–যেন তারা জলের বিপরীতে ছুটছে। ..
খেতবাড়ি শেষ হয়ে যায়–পালের ক্ষুর পড়ে নদীর পাড়ের বালিতে! এখন আর পড়ে যাওয়ার ভয় নেই, এখন আর পিছলে যাবার ভয় নেই বালুবাড়িতে পা দিতে না-দিতেই পালটা যেন ছড়িয়ে পড়তে চায়। পুরোটা পালের ভেতর যে-একটা উদ্বেগ কাজ করছিল, বালুবাড়িতে পেঁছে সে উদ্বেগটা যেন আচমকা ও অতর্কিত শেষ হয়ে যায়, যেন তাদের এই বালুবাড়িতেই পৌঁছনোর কথাছিল। বালির ওপর দিয়ে হাঁটা যায় না, পায়ের ফাঁকে বালি ঢুকে যায়। সেই কারণে যে পালের গতি কমে আসে তাই নয়, বালিতে হটার জন্যে পালটা ছড়িয়ে যেতে চায়, গরুগুলো যে যার মত হাঁটতে চায়। কিন্তু সেই বাচ্চাগুলি এখন তাদের কঞ্চি আর লাঠি উঁচিয়ে সামনে এসে গেছে। দুদিক থেকে লাঠি আর কঞ্চি গরুর পালের ওপর নেমে আসতেই গরুগুলো দাঁড়িয়ে পড়ে মুখ সরিয়ে নেয় আর পায়ে-পায়ে আরার পুরনো লাইনে ফিরে আসে। সেই ছেলেরা আর এগয় না, ঐ জায়গায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে গরুগুলোকে লাইনে রাখে। তারপর বালির ওপর ধীর পায়ে পালটা যখন নদীর দিকে একটু টলতে-টলতেই এগয় তখন সেই ছেলেরা আরো পেছিয়ে গিয়ে চেঁচায় হেট হেট। পালটা এখন এই বালুবাড়িতে যেন একটা লাইনের মত দাঁড়িয়ে গেছে। দুপাশে নদীর খাত দিয়ে সারা রাতের বাতাস দক্ষিণ থেকে পূর্ব থেকে উত্তরে আর। পশ্চিমে শান-শানকরে ওড়ে আর সেই নদীখাতের অবকাশেই এই গরুরা যেন একটার্সাকো বা বাধ। নিতাই, গজেন, আর অমূল্য পাড়ের কাছের জলে ছিল। রাবণ সেই পাড়েই বসে ছিল। গরুর পাল দেখে জল থেকে উঠে নিতাই, গজেন, অমূল্য ছুটতে শুরু করে। জল ছেড়ে উঠেই ওরা পাড়ে ফেলে রাখা ধুতি-নেংটি এক পাক দিয়ে পরে নেয়। একে বালি, তায় ভেজা, বাতাসের বিপরীতে ওরা এগতে পারে না। নিতাই কিছু একটা বলে চেঁচায়–সে চেঁচানি বাতাসে উল্টো দিকে উড়ে চলে যায়। নিতাই একটু এগিয়ে ছিল অমূল্য তখনো জল থেকে যেন পুরো উঠতে পারে না। হঠাৎ অমূল্য জল থেকে না উঠে, আবার জলের দিকে চলে যায়, তারপর ডুব জলে পৌঁছে সাঁতার দেয়। নিতাই এ গজেন বলে ডাক দিয়ে পেছন ফিরতেই দেখে অমূল্য আবার জলে সাঁতার কাটছে। নিতাই দাঁড়িয়ে পড়ে কোমরে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, এহন তর সাঁতার দেওনের টাইম? জলে ত তখনো বান ঢোকেনি। অমূল্য চিত হয়ে হাত মাথার দিকে ছুঁড়ে দেখায় সে ওপারে যাচ্ছে।
নিতাই বুঝে নেয়। ভালই ত করছে অমূল্য। গরুর পালকে নদী পার করানোর সময় ওপারে ত থাকতেই হবে কাউকে। কিন্তু একা অমূল্য কি পারবে। সে গজেনকে বলে, যা, তুইও যা ওপার–দেইখা আয়, কুনখান দিয়া পার করাই?
নিতাইয়ের কথায় গজেন জলে ফেরে কিন্তু সে অমূল্যর দিকে যায় না। পাড়ের কিনারা ঘেঁষা জলে ছপছপ করতে করতে সে এলোমলো পায়ে হাঁটতে থাকে। বালি দিয়ে হাঁটার সুবিধে অনেক। কিন্তু জলতল ত সমতল নয়। গজেন খানিকটা ছপছপ করে হেঁটে যাওয়ার পরই তার এক পা গর্তে পড়ে যায়–সে কাত হয়ে জলের মধ্যে পড়ে, তারপর হাতের ভরে আবার সোজা হয়ে হাঁটে। এবার সে পাড় ছেড়ে দিয়ে আর-একটু গভীরে যায়–সেখানে তার হাঁটু জল। খানিকটা মাটি শক্ত পায় গজেন–সে একটু আন্দাজের চেষ্টা করে শক্ত মাটির ঢালটা কোন দিকে। অন্তত হাঁটার আরামটুকু পাক। কিন্তু সেই মাপ নিতে গিয়েই গজেন আবার পড়ে, পড়ে গিয়ে সে আর ওঠে না–মাথাটা জলের তলায় নিয়ে যায়, অন্তত জলের তলায় ত আর ঐ বাতাস আর বৃষ্টির সুচ নেই! ভস করে মাথা তুলে গজেন একবার এপার-ওপার দেখে বটে, চুল থেকে জল ঝেড়ে ফেলেও বটে। হাত দিয়ে মুখচোখের জল সরিয়ে গজেন দেখে অমূল্য ওপারে উঠে হেঁটে-হেঁটে এদিকে আসছে। গরুগুলো যেখানে এখন দাঁড়িয়ে তার সোজাসুজি পশ্চিমের পাড়ের দিকে একটা জায়গা ঠিক করে গজেন আবার জলে ডুব দেয়।
ততক্ষণে বালুবাড়িতে গরুর পালটা এসে পড়েছে। আলগা দু-একটা গরু পেছনে আসছে। নিতাই সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচায়–হেই বালিশ-সালিশ–তোরা দুইডা দুই পাকে খাড়াবি আর ঐ বলরামের ছোঁয়াটাক কয়্যা দে পাছত যাইতে, পাছত। ভয় পাস না। বানার জল এখনো আসে নাই, কোনোটা এদিক-ওদিক হইলে হইব না, চিল্লাচিল্লি করিস না।
