হিশেব অনুযায়ী পাহাড়ের বন্যা এখানে আর দু-এক ঘণ্টার মধ্যেই এসে যাচ্ছে যখন, তখন গরুর পালের সঙ্গে গরুগুলোকে তাড়াতে-তাড়াতে বাড়ির ও পাড়ার বাচ্চাকাচ্চারাও ছুটতে থাকে। রাতশেষের বানাবাতাসে আর বৃষ্টির ছাটে বিদ্ধ এ চরে গরুর পালের সেই সমবেত হাম্বার যেন চরের ভেতর থেকে জেগে ওঠে। মানুষের স্বরের সঙ্গে মেশানো হাম্বা ডাকে কেমন এক স্বস্তি থাকে। কিন্তু মানুষের স্বরের সমর্থনহীন এই রাত শেষ করা হাম্বায় মানুষের বসত উৎখাত হয়ে যায়। নদীর পথে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় পাল বেঁধে গরুরা ছুটে আসছে। অথবা হয়ত স্পষ্টও হয় না–ঐ জলকুয়াশা সরে সরে যায় আর সেই অবকাশ জুড়ে জেগে ওঠে ধাবমান গোষ্ঠের চলমূর্তি। যখন গ্রাম থেকে আরো দূরে যায়, তখন দেখা যায় সেই পালের ভেতর গরুর গায়ে গা লাগিয়ে পেছনে-পেছনে, ভেতরে-ভেতরে গায়ের বাচ্চারাও ছুটে আসছে। তাদের এক-এক হাত তোলা। কোনো কোনো হাতে কঞ্চি বা লাঠি আছে। কিন্তু সে কঞ্চি বা লাঠি কোনো গরুর পিঠে পড়ে না, গরুর পাল এতটাই সারি বেঁধে ছুটছে, ছুটছে অথচ সারি থেকে সরছে না।
গাঁয়ের এই রাস্তা এই গরুগুলোর চেনা, এই বাচ্চাগুলোরও চেনা। এই রাস্তা দিয়ে এতটা বড় পালে না হলেও, ছোটখাট পালে এই গরুগুলোত প্রায় রোজই ঘরে ফেরে, যায়-আসে। কখনো কখনো কোনো-কোনো গরু ত বাধা বাছুরের হাম্বা শুনে ছোটেও বটে। এত বড় গায়ে, এক-একটি এত বড় পাড়ায় কোনো-না-কোনো গরুর ত দুধের বাছুর থাকেই–গরুদের ত আর পরিবার পরিকল্পনা হয়নি–দুধের বাছুরের ডাক শুনে কোনোনা-কোনো গরুকে ত ছুটতেও হয়। কিন্তু তাই বলে এমন ছোটা? তাও এই রাত শেষ হওয়ার আগেই? মানুষের গলার স্বরের গরমে কুয়াশা কেটে যাবারও আগে? তাও আবার এত তাড়াতাড়ির আঙুলে খোলা দড়ি ফেলে? গলায় পিঠে মানুষের হাতের ছোঁয়া না নিয়েই?
এই রাস্তা ত মানুষের ও গরুর পায়ে-পায়ে এরকম পাল বেঁধে পালানোর জন্যে তৈরি হয়নি। তাই এত গরুর সঙ্গে ঐ গরুটার পেটের ধাক্কা লেগে যায়। একটা গরু একটু সরে গেলে তার একটু পেছনের গরুটার কাঁধে ধাক্কা লাগে। সেটা একটু পেছিয়ে গেলে তার পেছনের গরুর গলা এসে আগের গরুটার কোমরের হাড়ের ওপর ওঠে। একটু জোয়ান হয়ে ওঠা বাছুর এই সুযোগে একে ধাক্কা দিয়ে, ওকে সরিয়ে, আরো সামনে এগিয়ে যেতে চায় আর তার মা তাকে ধরবার জন্যে আর-একটু জোরে ছুটতে গিয়ে ধাক্কা খায়। যে-বাছুর এখনো বাট ছাড়ে নি সে এই সুযোগে পেছন থেকে মায়ের সারা রাত ধরে ভরে ওঠা বাটে মুখ ঢুকিয়ে টান দেয়–সেই টানের আবেশে মায়ের গলা লম্বা আর পা চারটে শিথিল হতে না-হতেই পেছনের গরুটার ধাক্কায় বাছুরটা ছিটকে যায়। মার বাটে মুখ ঢোকানোর জন্যে ওর ঘাড়টা নোয়ানো ছিল আর নোয়ানো ঘাড়ের ভারে সামনের পা দুটোর কুঁচকিতে ভাজ পড়ে। সেই ভাজের ঝোঁক সামলাতে পেছনের পা দুটো ফাঁক হয়ে থাকে, হাঁটু দুটোতেও একটু ভাজ পড়ে। পেছনের গরুর ধাক্কা খেয়ে তাই সে বাছুরটা প্রথমে ডাইনে ছিটকে যায়। ছিটকোতে-ছিটকোতে তার সামনের পা দুটো ভেঙে যায়, সেটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে, পড়ে কাত হয়ে যায়। পেছনের গরুগুলোর ধাক্কায় তার মা চলে যায়, তার মার বোটা থেকে প্রথমে সরু ধারায়, তারপর ফোঁটায়-ফোঁটায় দুধ মাটিতে পড়তে থাকে–অনেকক্ষণ। বাছুরের পেছনের গরুগুলো তার ওপর এসে পড়ে না। তাকে পাশ দিতে বায়ে সরে যায়। ফলে, সবচেয়ে বায়ের গরুটা রাস্তা থেকে গড়িয়ে পড়তে গিয়ে মাথাটা নীচে নামিয়ে পেটটাকে রাস্তার ওপর এনে ফেলে। এর মধ্যেই পেছনের গরুটা তার জায়গা নিয়ে নেয়। সে এবার মাথাটা তুলে গলাটাকে ভিড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়, তারপর পেটটাকে। ততক্ষণে বাছুরটা সামনের দুই পায়ের ওপর ভর দিয়ে সোজা হয়ে পেছনের পায়ের ওপর ভর দিয়ে গড়ায়, দৌড়য়, হা-স্বা, গরুর পালের ভেতর থেকে অনেকগুলো গভীর হাম্বা ওঠে। কার বাছুরের সাড়া কে দেয় বোঝা যায় না। প্রফুল্ল পালের গাইটা বুড়ি হয়েছে, মোটা হয়েছে। সেটা জোরে ছুটতে পারে না। কিন্তু পালের মাঝখানে তাকে জোরে ছুটতেই হয়। তার অত বড় পেটটার দোলনে সে নিজেই হাঁফিয়ে ওঠে। তার নাক দিয়ে ফেনা গড়ায়। দেড়া গজেনের গাইটা দুদিন আগে বিইয়েছে। তার বাছুরটা ছুটতে পারে না। তাকে তুলে দেয়া হয়েছে জগদীশের মোষের পিঠে। বাছুরটাকে নিয়ে মোষটা বেশ তালে-তালে দুলে-দুলে ছোটে পালের মাঝখানে। তার গায়ের ধাক্কায় অন্য গরুগুলো দু পাশে সরে যায়। কিন্তু বাছুরটা বারবারই পিঠের ওপর উঠে দাঁড়ানোর জন্যে সামনের পা দুটো কোলের ভেতর থেকে বের করতে চায় আর মোষের চলার দোলায় ও বেগে সঙ্গে-সঙ্গে তার ঘাড়টা নুয়ে পড়ে। সে আবার পা দুটোকে গুটিয়ে নিয়ে ঘাড়টা সোজা করে। তার মা-গাই মোষটার পেছন-পেছন ছোটে। বাছুরটাকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে পেছন দিকে মুখ করে। তার মা জিভ বের করে গলা তুলে বাছুরটাকে চাটতে চায়। কিন্তু মোষের অত উঁচু পিঠ পর্যন্ত তার জিভ যায় না। তার বাছুরচাটা এখনো শেষ হয়নি।
গাঁয়ের বসতসীমানা ছেড়ে পালটা এবার চাষের সীমানায় আসে। এও ঠিক রাস্তা নয়। একটি বড় আল, দুপাশে মোটা ঘাস, মাঝখানে কাল মাটি জলে পিছল। রাস্তা থেকে দুপাশের জমি কোথাও বেশ ঢালুতে, কোথাও তার থেকে সামান্য উঁচু। পিছলে গেলে ঐ মাঠেই পড়ে যেতে হবে। পালটার গতি একটু কমে আসে। ছুটছে কিন্তু পদক্ষেপগুলো একটু ছোট হয়ে এসেছে যাতে পিছলে গেলে সামলানো যায়। আর হুড়োহুড়িটাও যেন কম। সঙ্গের ছেলেগুলো লাঠি বা কঞ্চি উঁচিয়ে দু পাশের খেতে নেমে গেছে। সেই ঢাল থেকে তারা কঞ্চি বা লাঠির ঘা মারছে রাস্তায়–হেই হেই হেই আওয়াজে–গরুর পা যেন পিছলে না যায়। গরুর পাল ছুটছে আর মাঠ দিয়ে ছেলেগুলোও ছুটছে। এখন আর দুপাশে গাছ বা বাড়িঘরের সারি নেই, যেন এতক্ষণ সেই সারি এই প্রায় ভোরে, এই শানশান বাতাসে, এই জলে খানিকটা আশ্রয় দিচ্ছিল। কিন্তু এই খেতিজমিও ত চেনাই। এই মাটি আর ঘাসপাতার ভেজাগন্ধও ত চেনাই। এই দু পাশের অবকাশ দিয়ে নদী ও নদীর বাঁক দেখাও ত এই পালের অভ্যন্তই। কিন্তু তারও ত একটা সময় আছে। এখন রোদ নেই, এখন ঘাসে মুখ দেয়া নেই, এখন কালো মাটির ওপর পেট ঢেলে দিয়ে শোয়া নেই, এখন গলা তুলে ভেতরের ঘাস মুখে নিয়ে আসা নেই। এখন ছোটা, ছোটা।
