নিতাই তার ডুবজলে পৌঁছে ভেসে ওঠে। দেখা যায়, সে তার বাবরি চুল ঘাড়ের এক-এক দোলায় ঝাপটাচ্ছে। ভেজা বাবরি তার মাথার ওপরে ঝলসে উঠছে।
জল নতুন চুকিবার ধইরছে? ঐঠে পাস? রাবণ তার ভঙ্গি না বদলে বলে। নিতাইকে বলে। নিতাইয়ের যেন একটা ছুততা দেওয়ার দরকার হয়–কেন সে এতটা দূরে, এতটা জলে, এতটা তৃপ্তি পাচ্ছে। ওখান থেকেই সে বলে, সারা মাথা-গা বালি কিচকিচাছে–
গরুর পালকে কোথা দিয়ে ওপারে তুলবে সেই পথনির্ণয়, নিতাইয়ের এই জলমগ্নতার কারণ হিশেবে যথেষ্ট ছিল না।
এই লেগুন-এর মত খালটুকু তিস্তারই অন্য কোনো বন্যায় তৈরি হয়েছিল।
তিস্তার মূলস্রোতের মাঝখানে বিচ্ছিন্ন সামান্য বালুচর, তার পাশ দিয়ে জলের ছোট রেখা কখনোকখনো বহমান থাকে। এই খালের মত তিস্তাটুকু পেরিয়েই এই চরের জীবনযাত্রাকে শহরের, বাজারের, পঞ্চায়েতের, ভোটের, সরকারের জীবনযাত্রার সঙ্গে গ্রথিত থাকতে হয়। সেই সামান্য বালুচর আর-কিছুক্ষণের মধ্যে হাজার-হাজার কিউসেক জলের আঘাতে কোথায় উবে যাবে, হয়ত, এই খালটুকু, লেগুন-এর মত খালটুকু, খালের মত তিস্তাটুকু সেই প্রবল মুহূর্তে এই প্রতিদিনের ইতিহাস থেকে উপকথায় চলে যাবে, এই চুর, এই মানুষজন, এই গাইবলদ, এই আবাদ, বালুচরে বসে থাকা ঐ বৃদ্ধ–যে তার শরীর দিয়েই শুধু জানে আর বোঝে, শরীরের বাইরে যার আর-কোথাও মন নেই–এই সব সহ, সব সহ।
পুরানা, পুরানা, এইঠে সব পুরানা, মাঝনদী থেকে নিতাইয়ের গলা ভেসে আসে রাবণের কতক্ষণ আগে করা প্রশ্নের জবাবে। সে তখন স্রোতের টানে গা ভাসিয়ে দক্ষিণে যাচ্ছে। খানিকটা গিয়েই নিতাই একট সরে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে–আরে, রে, রে, অতগুলা মশাল জ্বালাইয়া মিস্তিরি পাড়ার দক্ষিণ পাকে.. বলতে বলতে থেমে যায় নিতাই। সে চিনতে পেরে যায়, এই খালের তিস্তার ভেতর থেকে ঐ দক্ষিণ পাড়া দেখা যাচ্ছে, ঐ তিস্তা ব্রিজ দেখা যাচ্ছে লাইট জ্বলে আছে, ঐখানে নরেশ আর নকু বাতাসের মধ্যে, জলকুয়াশার মধ্যে পাহারা দিচ্ছে তিস্তা ব্রিজের দিকে তাকিয়ে। নিতাই চেঁচায়, অশ্বিনী রায়ের জমিতে পাকা ভাদই কাইটতে নামছে..
এই চর জুড়ে তিস্তার বন্যার ছোঁয়া লেগে গেছে, এখন বন্যাটা আসাটুকুই বাকি। খেতের দাঁড়ানো পাকা ধান যতটুকু পারা যায় কেটে নেয়া।
নিতাই সেই জলের ভেতর থেকে দেখে–এই চরটার ওপর দিয়ে তিস্তা বয়ে যাচ্ছে। নিতাই সেই জলের ভেতর থেকে দেখে-আর-কোনো একটা নতুন চর তাকে খুঁজতে হচ্ছে। নিতাই সেই জলের ভেতর থেকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে একটু ভেসে গেলেই ওপারে রংধামালি রায়পুরের বাধে উঠে সে বসে বসে আর-কিছুক্ষণের মধ্যে এই চর ডোবানো, এই খালের মত তিস্তা ভাসানো, নতুন জলের ফ্লাড় দেখতে পাবে।
নিতাই সেই মশালের আলো থেকে চোখ শেষবারের মত সরিয়ে নিয়ে উত্তর দিকে সাঁতার কাটে, এই খালের স্রোতটুকুর বিপরীতে, পাহাড়ের ফ্লাড ঐ দিক দিয়েই ত আসবে। এখনো এই পুরনো জলে, এই প্রতিদিনের জলে, এই জীবনযাত্রার জলের ভেতর দিয়ে সঁতরাতে-সঁতরাতে নিতাই হাঁক দেয়, গজেন, অমূল্যা, আয়, ফ্লাড দেইখ্যা আসি, কতদূর আইসল, আয়…
এতক্ষণে নিতাই সম্পূর্ণ উপলক্ষহীন হয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারে–এই চরের আসন্ন সম্ভাব্য ধ্বংসের মুখে সে চরের সঙ্গে এক আসঙ্গে লিপ্ত হয়ে যেতে চায়।
সে এই চর আর জল জন্মসূত্রে পায় নি। প্রবাসী বলেই বোধহয় এ জলের টান এত বেশি, এত গাঢ়। এই জল ধ্বংস হওয়ার আগে নিতাই বোঝে এই জল তার শরীরেরই অংশ। এই শরীরে ও এই জলে তখন শেষ স্মৃতি ছিল বন্যার আগের শেষ স্মৃতি।
গজেন আর অমূল্য দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের নেংটি আর ধুতি পাড়ে খুলে রেখে–সাঁতার কেটে কোনাকুনি নিতাইয়ের দিকে চলে স্রোতের উজানে এগিয়ে, বন্যাঢোকার সম্ভাব্য মুখে। এখানে জলকুয়াশা ছিল না, আকাশের আলো একটু হালকা ছিল, ওরা জলের মধ্যে মাছের মত বয়ে চলে এই পুরনো জলে, প্রতিদিনের জলে, জীবনযাত্রার জলে। ..
পাড়ে অনড় রাবণ শুনতে পায়, বংশানুক্রমে পাওয়া তার এই নদী বেয়ে যেবান ধারাবাহিক এসেই যাচ্ছে, সেই এখনো অনুপস্থিত বন্যার সামনে, চরের মাটি ছেড়ে প্রথম উদ্বাস্তুর পাল, শেষ রাত্রিকে বা প্রথম সকালকে হাম্বা রবে চকিত করে ছুটে আসছে।
.
০৯৮.
অকাল গোষ্ঠ
বাঁধের ওপর গরু ভোলা মানেই বন্যা স্বীকার করে নেওয়া। গোয়াল থেকে গরু বের করে সারাটা চর পেরিয়ে সোঁতাটা কিছু হেঁটে, কিছু সাঁতরিয়ে, বাঁধের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে পড়া মানেই ঘর ভাসল। মুখে যতই বলা যাক না কেন যে গরুগুলোকে আগে তুলে দিলে ত আর ক্ষতি নেই, বন্যা যদি নাই আসে বা নেহাৎ ছোটখাট বন্যা যদি আসে, তা হলে নামিয়ে আনলেই হবে–গরুকে একবার ঘর ছাড়া করলে সে ঘরে আর টেকা যায় না। এমনি গরু আশেপাশে চরছে, বা, পাল করে গরুগুলোকে মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়েছে–সে এক কথা। সে ত জানাই আছে-কখন সে গরু ফিরবে। বাড়ির সবচেয়ে ছোট ছেলে যদি সারা সকাল এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়ায় তা হলেও যেমন বাড়ি ভরাই থাকে। কিন্তু গোয়াল শূন্য করে, গরুর পালকে পাড়া ছাড়িয়ে, চর ছাড়িয়ে, নদী ছাড়িয়ে একেবারে বাঁধের মাথায় তুলে দেয়া–আর তারপর সেই ঘরবাড়িতেই থাকা–এ অসম্ভব। গোয়ালঘরের দড়িটা, গোয়ালঘরে গরুর মুখ থেকে খসে পড়া পোয়াল,আর ঘাস গরুর চোনা আর গোবরের গন্ধে বাড়িতে আর তিষ্ঠনো যায় না, কেমন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। যেন সারা পাড়াতেই কোনো শোক নেমেছে, বা, একটা কোনো বাড়ির শোকই সারা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।
