নদীর ভেতর থেকে নিতাই এই চরের দিকে মুখ করে তাকায়। ডাইনে মুখ ঘোরায়-দক্ষিণের বাঁক পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। বায়ে মুখ ঘোরায়-বেশি দূর দেখা যায় না, এই দিকটাতে মাটি জলের মধ্যে অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। নিতাই ঐ খালের বাকটার দিকে তাকায়, বেশ বড় বাক নিয়ে ঘুরে গেছে। ঐখানটাতে আলো আর একটু পরিষ্কার মনে হয়। নিতাই এক আঁজলা জল তুলে ঠোঁটের কাছে ধরে। তারপর ভেজা হাত সারা মুখে বোলাতে গিয়ে বলে, হে-এ, বালি এককারে কিচকিচ করত্যাছে
নিতাই মাথাতেও হাত দেয়, হে, বালি কিচকিচায়।
জলের ভেতর থেকে নিতাই ডাকে, গজেন।
ক কেনে।
নামবি? জলে?
তুই ত নামিই আছিস।
আমি ত এইখানে খাড়য়্যা আছি, অমূল্যা, গরুগুলাকে আইনতে কইছিস?
এতক্ষণ রওনা দিয়্যা সারছে।
ত দ্যাখ, কোথা দিয়্যা পার করবি? দ্যাখ। একটু বিরতি দিয়ে নিতাই বলে, এ্যাহনও পুরানা নদীই আছে
হয়?
গজেন জিজ্ঞাসা করে।
হয়। এ্যাহনও পুরানা নদীই খানিকটা জল তুলে বুকেপেটে লাগায় নিতাই, যেন বালি পরিষ্কার করছে।
নতুন জল ঢুকে নাই? অমূল্য জিজ্ঞাসা করে।
দেখি বুঝিবার পার না? শুধাবার ধরছেন? রাবণ এমন ভাবে পায়ের ওপর বসে পড়ে যেন বন্যার স্রোতের ধাক্কায় এখনি একটা গাছ উপড়ে আকাশটা খালি করে দিল। রাবণ নদীর দিকে তাকিয়ে দেখে আরো, আরো বুঝে যায়।
নিতাই হাঁটু জলে ছিল, একটু উঠে আসে। পেছনে বা হাত দিয়ে কাছাটা খুলে খুব সাবধানে দুই পায়ের ভেতর দিয়ে সামনে গলিয়ে ডান হাতে ধরে। তারপরে আবার বা হাতে তুলে কাঁধের ওপর রাখে। তার পর দুই হাত দিয়ে ধুতিটার পাজা খুলতে থাকে। খোলার পর প্রথমে দুই হাতে দুদিক থেকে গুটিয়ে নিয়ে, ডান কাঁধে রেখে, হাত নামিয়ে কোমরের গিট খুলে দেয়। দুই হাতে কাপড়টাকে মাথার ওপর দিয়ে তুলে পোটলা পাকায়। পোটলাটা দুই হাতে বুকের কাছে ধরে। একটু পরেই বোঝা গেল নিতাই হিশেব কষছিল–ওখান থেকে কাপড়টা ছুঁড়ে দিলে পাড়ে পৌঁছবে নাকি বাতাসের ধাক্কায় জলে পড়ে যাবে। নিতাই বুকের কাছে তার কাপড়টা ধরে ঐ কয়েক পা হেঁটে এসে ভেজা বালুচরে ধুতিটা ফেলে দেয়। মাটিতে পড়ার আগে ধুতিটা একটু খুলে যায়। পাড়ে এলিয়ে পড়ে থাকে।
ততক্ষণে নিতাই পেছন ফিরে জলের ভেতরে হেঁটে যাচ্ছে।
সামনেই ওপারে বাঁধের পটভূমি ছিল বলে, নাকি, এখানে জলকুয়াশা নেই বলে, নাকি, আলো একটু হালকা বলে–জলের ভেতরে হেঁটে-হেঁটে আরো ভেতরে নিতাই যখন চলে যায়, তখন, নদীর মধ্যে–ঠিক নদীর মধ্যে নয়, নদী আর আকাশের মধ্যবর্তী আকাশ জুড়ে–তার শরীরের পরিণাহরেখা ক্ষোদিত হয়ে ওঠে ছায়াময়–তার মাথার ওপরে বাবরির সামান্য ঢেউ আর কাঁধের দুপাশে সেই বাবরির ফুলে ওঠা; তার ঘাড় বাবরিতে ঢাকা; সেই ঢাকা ঘাড়ের দুপাশ দিয়ে কাঁধের তরঙ্গিত বয়ে যাওয়া, বাহুর গোল, বাহু থেকে কনুই পর্যন্ত ঢেউ, কনুইয়ের চওড়া ক্রমে সরু হয়ে আঙুরে বিচ্ছিন্নতায় জলের ওপর দোলে। নিতাই হেঁটে যায়। আর এই চলন্ত রেখা নীচ থেকে জলে ডুবে যায়।
নিতাই হেঁটে-হেঁটে জলের ভেতর থেকে ভেতরে চলে যায়।
এখন হেঁটে যাওয়ার একটি উপলক্ষ ত নিতাই-এর আছেই। গরুগুলো রওনা দিয়েছে। বন্যা আসার আগে সেগুলোকে ওপারে পৌঁছে দিতে পারলে অনেকটা নিশ্চিন্ত। এখনো এখানে পুরনো নদী, পুরনো জল। গরুগুলোকে চেনা পথে ওপারে নিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু পথটা আগে ঠিক করা ভাল। গজেনকে তাই জলে নামতে বলছিল নিতাই। জলে নেমে নিতাইও যেন সেই পথটাই পাকাপাকি ঠিক করছে।
নিতাইয়ের এখন গলাটুকু জেগে আছে, গলা মানে বাবরিটুকু। পাড় থেকে মনে হচ্ছে, প্রায় মাঝখানে। কিন্তু অভিজ্ঞতায় জানা আছে, এটা ঠিক মাঝখান নয়, মাঝখান আরো একটু দূরে। কিন্তু, এতদূর পর্যন্তও যদি হেঁটে যেতে পারে, নিতাই, তা হলে গরুগুলোকে সহজেই পার করে দেয়া যাবে, এখনো।
অমূল্য জিজ্ঞাসা করে, হে রাবণ কাহা, শুইনবার পান? গরুগুলা বাহির হইছে?
রাবণ মাটির ওপর তার প্রায়নগ্ন শরীর নিয়ে বসে ছিল নদীর দিকে মুখ করে। তার বা হাঁটু মাটিতে শোয়ানো, ডান হাঁটু খাড়া। দুই হাতে সেই হাটুটা জড়িয়ে থাকে বারণ, মুখটা পায়ের মাঝামাঝি। যেন ওটা তার নিজের হাঁটু নয়, কোনো গাছটাছ। সে নদীর দিকে মুখ করে বসে ছিল বটে কিন্তু তার ঘাড়ের ভেতর মাথাটা এমনই সেঁদানো আর তার বাহুর গোড়ার হাড় দুটো লম্বা হয়ে তার কান পর্যন্ত এমনই উঠেছে যে বোঝা যায় না সে নিতাইয়ের দিকে তাকিয়ে, নাকি নিতাইকে ছাড়িয়ে বধের দিকে, নাকি সামনে, একটু দূরের, মাটির দিকে।
হয়। বাহির হছে মনত খায়, রাবণ আস্তে বলে।
বাতাস পুর্ব থেকে পশ্চিমে আসছে। রাবণ এখন এই রাত-পেরনো নদীর তীরে মাটিতে এমন স্থির বসে যে, সে হয়ত বাতাসের নিহিত আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছে–তিস্তার ভূখণ্ড বদলানো যেবন্যা পাহাড় থেকে নামছে এই চর, ও এই রকম আরো অনেক চর, বা, গ্রাম, বন, ভাসিয়ে নতুন রকমে ভূখণ্ডটাকে সাজাতে, সেটা পৌঁছবার আগেই চরের প্রথম উদ্বাস্তুর পাল অনভ্যস্ত সময়ে চার পায়ে পথে নেমে প্রায় অন্ধের মত এই নদীতীরে ছুটে আসছে। এ রাস্তায় তারা রাতে আসতে অভ্যস্ত নয়। তাদের অভ্যস্ত পথে তারা আর-কোনোদিন এই চরে ফিরে না-আসতেও পারে।
