হ্যাজাকের কাছাকাছি থেকে অমূল্য চিৎকার করে বলে, যাই যাই, আগাও, ধইরত্যাছি।
নিতাই অন্ধকার থেকে হাঁক দিয়ে বলে, গাইবদল বাছুরগুলাক লাইন বাইন্ধ্যা ঘাটে নিয়্যা আইসবার কয়্যা দে হককলরে
অমূল্য জিজ্ঞাসা করে, এহনই?
নিতাই গলা এত তুলে কথা বলছিল যে তার ধমক বোঝা যায় না, কিন্তু তার কথা যারা জানে তারা বুঝে নেয় নিতাই ধমকই দিল, অহনই, অহনই।
এই রাস্তাটা চরের ভেতরের রাস্তা। শক্ত আল, বৃষ্টিতে ভেজা ও পিছল, কিন্তু কাদা নেই। ফলে, ওরা প্রায় দৌড়ে-দৌড়ে যেতে পারছিল। বাতাস এখন পেছনে। মাঝে-মাঝে ধাক্কা মারছিল। কিন্তু তখনো ওরা বাড়িঘর, গাছপালা, বনবাদাড়ের ভেতর দিয়েই ছুটছে–ফলে বাতাসটা বেঁকে যাচ্ছে, ওদের গায়ে লাগছে না। পশ্চিমঘাটে যেতে বেশি সময় লাগবে না, কাজেই। কিন্তু সেজন্যে ওরা এত তাড়াতাড়ি ছুটছে না। ঐ দক্ষিণের বালুবাড়ি থেকে যে বাতাস ও বালি ঠেলে ওরা গায়ে ঢুকেছে, তার তুলনায় নাউয়াপাড়া থেকে পশ্চিমঘাটে যাওয়াটাতে যেন আরামই লাগে।
পেছন থেকে গজেন বলে, খাড়া কেনে নিতাই, একখান বিড়ি খা।
গজেন আর রাবণ এসে দেখে নিতাই দাঁড়িয়েছে। ওরা তিনজন মিলে গোল হয়ে দাঁড়ায়, নিতাই কাপড়ের অনেক গভীর থেকে শালাই বের করে। তিনজন যখন আগুনের ওপর ঝুঁকে পড়েছে, পেছনে চিৎকার শোনা যায়, নিতাই, খাড়া, আইসত্যাছি।
.
০৯৭.
নদী এখনো পুরনো
নিতাই, রাবণ, গজেন আর অমূল্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে এখন নদীর দিকে চেয়ে। ওপারে একেবারে সামনে রংধামালি-রায়পুরের বাধ। এখন দেখে মনে হচ্ছে বন্যা যদি আসে তা হলেও এইটুকু এক খালের মত তিস্তা পার হয়ে ওপারে উঠতে আর কতক্ষণ। এ ত এখন যা অবস্থা তাতে দুই ডুব দিলেই পার। কিন্তু ওরা জানে, বন্যার জল একবার এখানে ঢুকে গেলে আর এই খাল সহজে পার হওয়া যাবে না। পার ত হতেই হবে। এই দিক দিয়ে পার হওয়া ছাড়া ত গতি নেই। কিন্তু এখন ত এখানে নদী পার হওয়ার জন্যে কয়েক পা যেতে হবে, ওপারেও এরকমই কয়েক পা উঠতে হবে। তারপরই ত বাঁধের বোল্ডার। কিন্তু একবার যদি এই খালে বন্যার জল ঢুকে যায় তা হলে ঐ বাধ থেকে বেরনো লম্বালম্বা পারগুলো ধাক্কা দিয়ে-দিয়ে স্রোত ঠেলে দেবে এই চরেরই দিকে, যাতে স্রোতের ধাক্কা গিয়ে বাধে না লাগে। তখন, এখান থেকে ওপারে যাওয়ার মানে এত বেগে ছুটে আসা বন্যার স্রোতের বিপরীতে যাওয়া, স্রোত ঠেলে যাওয়া। স্রোতের গায়ে যদি গা ভাসিয়ে দেয়া যায়, তা হলে সোজা এক টানে সেই দক্ষিণের পাকে নিয়ে যাবে–ব্রিজের দিকে। অভিজ্ঞতায় এরা একটা বিষয় জেনে গেছে–স্পারগুলোর ধাক্কায় স্রোতে এ দিকেই সব ছুটে আসে বলে, স্রোতে ভেসে গেলেও এই চরের এদিকে কোথাও ঠেকে যাবে। কিন্তু সেটা কতক্ষণ? যতক্ষণ, এই খালটা চওড়ায় মাত্র ততটুকুই থাকবে, যাতে, স্পার-এর ধাক্কায় স্রোত উল্টে এই পারের কাছাকাছি পর্যন্ত আসতে পারে। কিন্তু এই খালটা ত বন্যার জল ঢোকামাত্র এমন চওড়া হয়ে যাবে যে, এই এখন যেখানে নিতাইরা দাঁড়িয়ে আছে, সেসব প্রথম ধাক্কাতেই ডুবে জল উঠে যাবে, ঐ খানখেতের কাছে। তাতেই ত স্রোতের উল্টো ধাক্কা জলের মধ্যে কোথায় মিলিয়ে যাবে। তখন সবটাই ত তিস্তা। তখন জলের একটাই স্রোত, একটাই টান। সেই স্রোতের মধ্যে কেউ পড়লে, সেই টান থেকে সে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না।
নিতাই, রাবণ, গজেন আর অমূল্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নদীটাকে মাপে, একটু কোনাকুনি। এখন গরুগুলোকে এখানে ছেড়ে দিলে কানচি মেরে ওপারে গিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু, এখন এই আবছা আলোতে ওদের এই সব হিশেবনিকেশে কোনো ভুল হচ্ছে না ত?
কয়ডা বাজে রে অমূল্যা, নিতাই আপন মনে জিজ্ঞাসা করে।
খাইছে, ঘড়ি দেখি নাই, অমূল্য বলে।
নিতাই আকাশের দিকে তাকায়। এখানে আকাশ যেন একটু উঁচু, সেই কুয়াশার ভার যেন একটু কম। বৃষ্টি কমে থাকতেও পারে, কিন্তু এখানে বাতাস ত আসছে অনেকটা বাধা পেয়ে-পেয়ে। যে-জোর বাতাসের বাকি থাকে, সে-জোর নিয়ে ওপারের বাঁধের ওপর হামলে পড়ছে। ফলে, মনে হয় বাতাসটা যেন এদের মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে।
সামনের বাঁধের ওপর দিয়ে ওদিকে রায়পুর রংধামালির আকাশের দিকে তাকালে উজ্জ্বল লাগে একটু, ওখানে ইলেকট্রিক লাইট আছে।
নিতাই কয়েক পা এগিয়ে বলে, গজেন, নাববি নি? নিতাই জলে পা দেয়, তার পায়ে স্রোতের টান লাগে, একটু গরম জল, বানার জল ঢোকে নাই এ্যাহনও, জল গরম।
নিতাইয়ের পেছন-পেছন ওরা একটু এগিয়ে আসে, টান কী রকম? অমূল্যও জলে পা ছোঁয়াতে-ঘেঁয়াতে জিজ্ঞেসা করে।
নিতাই হাঁটু জলে নেমে গিয়ে বলে, সকালে ও ত এ্যামনিই ছিল, জলের ওপর নিচু হয়ে নিতাই পায়ের বালি পরিষ্কার করতে শুরু করে। জলের ভেতরে তাকে কনুই ছাড়িয়ে ডোবাতে হয়। মুখটা প্রায় জলের ওপর নেমে আসে। জলের গন্ধ পায়। নিতাই গন্ধ শোকার জন্যে নাক নামায় নি। কিন্তু নাকে জলের গন্ধটা ঠেকলে তার নিজেরই মনে আসে–এটা বন্যার জলের গন্ধ না, রোজকার জলের গন্ধ। এই জায়গার জলটা পার হতে নৌকো লাগে ঠিকই, কিন্তু একদিকে বধ, আর-এক দিকে চরের মাঝখানে এই জলটায় কেমন মানুষের গায়ের গন্ধ লেগে থাকে, জলের ভেতরে মানুষের কাজের গন্ধ। এখন এই রাত্রিতে সে গন্ধ অনেকটা পাতলা, কারণ নিতাইয়ের মাথার ওপর দিয়ে সেই ঝা বয়ে যাচ্ছে ওপারের দিকে;কারণ, গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে এই খালের মত তিস্তার সোঁতার জলও কিছুটা বেড়েছে। ফলে, গন্ধটা তরল হয়েছে। কিন্তু তবু নিতাই গন্ধ পায়, অনিবার্যভাবেই পায়। রাত এখন বন্যার দিকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। আর, ঘণ্টাখানেক থেকে ঘণ্টা দুইয়েকের মধ্যে পাহাড় থেকে নামা বন্যায় এই খালটা একেবারে রামকান্তর জোত পর্যন্ত উঠে যাবে। কিন্তু রামাকান্তর জোত পর্যন্ত কেন? এই চরটা পুরোই জলের তলায় চলে যেতে পারে। পুরোটা? এই পুরোটা চর?
