আরে বস আগে। কও কী, ক্যান?
তোমরা ভেলা বানাও ক্যান? নিতাই হাসে।
রেডিওয় ত কইল, শুইনল্যাম, তা ভাবল্যাম, যা-হয় তা-হয়, কয়ডা বানাইয়্যা রাখি।
নিজেগার খুব ভাইবছ, চরের কথা কেডা ভাইবব? জগদীশ বলে।
যারা ভাইব্যা ঘুইর্যা অ্যাল, তারাই ভাবব। ত আমাগো কাম কী আগাইয়্যা থুল, নাকি পিছাইয়্যা থুল সেইডা কও। আর কী দেইখলা কও।
ঘোড়ার মাথা আর গাধার ডিম। চুপ যা। ঐদিকের পাড়ায় খবর দিছিস না দ্যাশ নাই? নিতাই সামনের লোকটাকে ধমকে ওঠে। নিতাইয়ের এই ধমকটাই হচ্ছে ওর সামাজিক সম্ভাষণ। সবাই একবার হেসে উঠল।
যাকে বলল সে বলে, আরে সারা চর ঘুইর্যা আইল্যা, এ্যাখন কি তোমরাই আবার খবর দিব্যার ছুইটব্যা নাকি? পোলাপান আছে কোন কামে? তোমরা বসো। এই ভোলা, সাইকেল বাইর কর খানদুই, না, খানতিন–
নিতাই দোকানের বারান্দায় গিয়ে বসে। তারপর হেসেই বলে আরে অমূইল্যা, তর মাথাত কী আছে একবার একসূরে করি দেখি আসিস ত।
অমূল্যর হাতে তখন দা। সে সেটা হাতে নিয়ে ঘোরাতে-ঘোরাতে বলে, ক্যান, কী কইরল্যাম?
কী কইরলি মানে? আরে, বানা আইসব তরা ত শুনছিস শেষ নিউজে।
হয়।
তা তহন আর কত রাইত? একবার সবাইক খোঁজডাক কইর্যা নিস ন্যাই?
এইহানে ভেলা বানাইস আর ঐহানে রমণী কাহা এমন ঘুমাইছে ঠেলা মাইর্যা তুলা যায় না। বন্যাতে ভাসি গেইলেও ত টের পাইব না–
এই নীলমোহন, যা ত রমণী কাকাক ডাইক্যা নিয়্যা আয়, অমূল্য বলে।
আর ডাইক্যা আইনতে হবে না, সে এতক্ষণে দৌড় দিয়্যা আসত্যাছে, জগদীশ একটা ঘরের দাওয়ায় বসে ছিল, সেখান থেকে বলে।
সাইকেল আনতে যাকে বলা হয়েছিল সে ও আরো দুজন সাইকেল নিয়ে এসে দাঁড়ায়। অমূল্য বলে, দাদা, ভোলারা আইছে, কয়্যা দ্যাও কুথায় কী খবর দিবে।
নিতাই একটু থেমে বলে, এক কাম কর, সিধ্যা ঘুইর্যা আয়। যদি দেখিস আর সব পাড়ায় সবাই জাইগ্যা আছে কয়্যা দিস আমরা এইখানে আছি, আর যদি দেখিস কুনো পাড়া চুপচাপ আছে ডাইক্যা জাগায়্যা দিস।
জগদীশ ডাকে, এই ভুলা, শুন্।
কন।
তর জেঠিরে কয়্যা দিস, আমি এইখানে আছি।
ত আপনার আর থাকনের কাম কী, ভুলার সাইকেলের পিছনে বইস্যা চইল্যা যান। ভুলারা ঘুইর্যা আইসলে আমরাও যাব নে, নিতাই বলে।
তাই যাব? জগদীশ কিছু ভাবে।
যাবেন না ক্যান, আপনার কি কালরাত্তির নাকি? গেলে ত ঐ পাড়াটার একটা বিলিবন্দবস্ত দইখবার পাইরবেন–নিতাই বলে।
তালি যাই, কী কস? জগদীশ ভোলার দিকে এগিয়ে যায়। ভোলা সাইকেলটা সোজা করে ধরে। জগদীশ সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে দুপা দুদিকে ঝুলিয়ে বসে। তার ওঠার মধ্যে এমন স্বাচ্ছন্দ্য ছিল যাতে বোঝা যায় সে এরকম চড়তে অভ্যস্ত। ভোলা শক্ত হাতে সাইকেলটা ধরে বলে, তিনজনই কি একদিকে যাব নাকি?
একদিকেই যা, দরকার হইলে একজন আইস্যা খবর দিতে পারবি নে, নিতাই বলে।
এখানে একটা হ্যাজাক জ্বালানো হয়েছে বলে আলোর একটা কেন্দ্র দেখা যাচ্ছে মাত্র। হ্যাজাকের আলোটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নি–গোল হয়ে স্থির আছে, যেন হ্যাজাকটাকেই দেখানোর জন্যে হ্যাজাকটা জ্বালানো হয়েছে। সেই আলোর মধ্যে এসেই সবাই কাজকর্ম করছে–তার বাইরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, যেন, হ্যাজাকের আলোটাই আলোর পেছনটাকে আড়াল করে রেখেছে। সেই আড়ালের দিকে তাকিয়ে নিতাই জিজ্ঞাসা করে, অমূল্য, কয়ডা বানাইছিস?
তিনখান বানাইছি। কিন্তু গরুগুলার জন্যে একড়া বড় করি বানাইব্যার ধরছি।
ধুর বোকা, ভেলার উপুরে খাড়াইব্যার পারব না, শুয়্যা পড়ব নে, এক-এক ভেলায় এক-এক গরু ভাইসব্যার ধরবে নে
অমূল্য ওর গাই-বদলগিলাফ ভাসান দিবার ধরিবে, স্যালায় উমরার পাছত-পাছত গিয়া ধরিবে, কোন রত ঠেকিছে– গজেন বলে।
তোমরা কী দেইখল্যা, বানা আইসবেই? নিতাই, কত বড় বানা? অমূল্য হঠাৎ কাতর হয়।
রেডিও শুইনলি ত তুই, আমরা ত তখন ব্রিজের দিকে চাইয়্যা আছি বালুবাড়িতে, তুইই ক না। কইছে? কত বড় বানা?
ও শালা এত গলা কাঁপাইয়্যাকাঁপাইয়্যা কয়, মনে হয় পাহাড়গুলা সব হাঁটা দিছে এই দিকে। ক কত জল, কত কিউসেক, সেই সবের বালাই নাই।
সগাক সরিবার কহিছে-নদীপারঠে? রাবণ শ্লেষ্মাজড়িত স্বরে বলে।
হে রাবণকাকা, তুমি এ বাড়িতে যাও না, কত আর ঘুইরব্যা? বাড়ির জিনিশপত্র গুছাবেনে কেডা? নিতাই বলে।
সে মোর তানে ফেলি রাখিছে নাকি হে, যেন রাবণ আগে থাকতেই জানে,, গোছানোর কথা আগে থাকতেই ঠিক হয়ে ছিল।
আরে কাকি খবর পাইছে কি পায় নাই, তয়? নিতাই বলে।
সারা চর জাগি আছে, আর তর কাকির যদি বেউলার ঘুম হয় ত হক কেনে?
এই অমুল্যা, বলে নিতাই উঠে দাঁড়ায়, চল ত পশ্চিম ঘাটাখান দেইখ্যা আসি, এ্যাখন জল কতখান বাইড়ছে–কম থাইকলে গরুবলদগুলাক পার করি দে।
নিতাই তাড়াতাড়ি রওনা দেয়। গজেন আর রাবণ ছুটে তার সঙ্গ নেয়।
এখান থেকে সোজা রাস্তা ধরে কিছুটা গেলে বাঁ দিকে পশ্চিমের ঘাটে যাবার রাস্তা। নিতাই যেতে-যেতেই অমূল্যা বলে ডাক দিয়ে এগিয়ে যায়। এখানে বসে থাকতে-থাকতে হ্যাজাকের আলোটা কেমন আড়ালের মত লাগছিল, হ্যাজাকের আলোটাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেলে বোঝা যায় ঐ আলো একটু ছড়িয়ে গেছে। সেই ছড়ানো আলো জুড়ে নিতাইয়ের ছায়াটা ক্রমেই লম্বা হয়, মাটিতে শোয়, কিছু একটা বেয়ে খাড়া হয়, ছায়ার ঘত্ব কমতে থাকে, তারপর আকাশের দিকে উঠে ছায়াটা মিলিয়ে যায়। রাবণের ছায়া নিতাইয়ের শরীরটা আড়াল করে দেয়, আর বেঁটে গজেনের ছায়া লম্বা বারণকে ছাড়িয়ে ওঠে। মাত্র কয়েকবার এই তিনটি ছায়ার কাটাকুটি চলতে থাকে। তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে নিতাইয়ের চিৎকার ভেসে আসে–অমূল্যা, এই অমূল্যা।
