হগলরে আইসতে কবা, না, চিল্ল্যায়্যা কয়া দিবা? নিতাই জিজ্ঞাসা করে।
গজেন হেসে ওঠে, নিতাইচন্দ্র সরকার এ্যালায় ভাষণ দিবার ধইরবেন। আপনারা দলে দলে যোগদান দ্যান।
গজেন একটু জোরেই কথা বলে ওঠে। পাশের বাড়ির ভেতর থেকে নিদ্রা ও শ্লেম্মাজড়িত গলা শোনা যায়, কে রে? কে?
জগদীশ চিৎকার করে বলে, শালো, উইঠ্যা দ্যাখ তোর বাপ আইসছে, মানষির আওয়াজ পায়্যাও উঠার নাম নাই। বাড়িটা রমণী সরকারের।
রাস্তার ওপর থেকে আওয়াজে বোঝা যায়, ভেতরে রমণী সরকার উঠছে।
রাবণ বলে, হ্যালায় কি হামরালার মাইয়্যার বিয়া বইচছে–সাগাই কুটুমক নেমন্তন দিবার ধইচছি? রমণীর ত উঠিবার মাগিবে আধাঘণ্টা, তারপর বিড়ি ধরিবে তারপর লণ্ঠন জ্বালিবে, তারপর ঘর খুলিবে, চিল্লি কহি দেন না কেনে–
নিতাই চিৎকার করে, হে-এ কাহা, লাল সিগন্যাল দিয়া দিছে, শেষ রাতত বানা আসিবে; ভেলা বানি রাখো, হামরালা হরিসভাত আছি, এই চলো কেনে।
ওরা আবার রওনা হতেই ঘরের ভেতর থেকে রমণী চিৎকার করে ওঠে, এই খাড়া, খাড়া।
গজেন পেছন থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, আর খাড়াবেন কায়, তোমরালা আইস।
রাবণ বলে, এই তোমার লাল সিগন্যাল, মানষিলা সগায় ঘুমাছে।
জগদীশ হ্যাঁ হ্যাঁ করে হেসে বলে, হালা সম্বন্ধীর বাপরা বুঝবেনে যখন ঘুমের মইধ্যে ফ্লাড ঢইকবে, বলেও জগদীশ হ্যা হ্যাঁ করে হাসে, যেন সে একটা মজা দেখার অপেক্ষায় আছে।
জগদীশকে বেশ ব্যস্ত দেখায়। নদীর পাড়ে তাকে অস্থির লাগছিল, যা হওয়া উচিত তা যেন হচ্ছে না। কিন্তু যখনই জানা গেছে লাল সিগন্যাল পড়ে গেছে, পাহাড় থেকে বন্যা নামছে, শেষ রাতে বন্যা এখানে পৌঁছে যাবে, তার জন্যে এখন থেকে ভেলা তৈরি করতে হবে–তখনই জগদীশ স্থির হয়ে গেছে। সেই স্থিরতায় সে তাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড় হয়েও, প্রায় কিশোরের মত উৎসাহে টগবগ করছে। শেষ রাতে ঘুমের ভেতর তিস্তার মাঝখানে জেগে উঠে রমণীর কী হবে, তা ভেবে সে আপন মনেই খ্যাক খ্যাক করে হাসে। হাসে আর দৌড়ে-দৌড়ে ঘটে। তাকে দৌড়ে-দৌড়েই ঘটতে হয়, কারণ, নিতাই আর রাবণ লম্বা-লম্বা পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
মিস্ত্রিপাড়াটা মূল বসতি এলাকার বাইরে। ধানি জমির মাঝখানে এই একটা পাড়া, তারপর আবার অনেকখানি ধানি খেত, তার শেষে আবার নাউয়াপাড়া। এখান থেকে বসতি জমাট। মিস্ত্রিপাড়া থেকে নাউয়াপাড়ার মাঝখানে দুপাশে ধানখেত, তারপরে এক বিরাট বাশবনের মধ্যে দিয়ে রাস্তাটা, এই রাস্তাটা, সমকাণে পশ্চিমে বেঁকে গেছে। এর পর থেকে নাউয়াপাড়া। নাউয়াপাড়ার পরে ছোট এক খাল, তিস্তার পুরনো বেনো জল আটকে গেছে, এখন জল সবুজ। সেই খালের ওপারে মাহিন্দরপাড়া, তার ডান পাশে আবার একটা বাশঝাড়। তার পরে সরকারপাড়া দুই নম্বর। এই ভাবে ধীরে-ধীরে চর যেন আর চর থাকে নি, হয়ে উঠেছে ভরভরন্ত গ্রাম, কাল শক্ত মাটির গ্রাম, বড়-বড় গাছের আড়ালে ছায়ার নীচে প্রবীণ সব গ্রাম। সে গ্রামের ভেতর ঢুকে কারো মনে হবে না আর-মাত্র ঘণ্টা দুই-তিন পরে এই সমস্ত কিছুর ওপর দিয়ে তিস্তার ঘোলা জল তীব্র আবর্তে বয়ে যাবে আর এই গ্রামের কিছু চিহ্ন সেই জলের ওপরে নিশানা দেবে। বাতাস এখানে কম ছিল, কিন্তু তাতে বাশবনের প্রায় মাটির কাছাকাছি নেমে এসে ছিলাছেঁড়া ধনুকের মত উঠে যাওয়া ঠেকে না। বাশপাতাগুলো এই বাতাসে এত আওয়াজ করে যেন মনে হয় আড়ালে কোথাও জলের স্রোত বইছে। বাশগুলো হেঁচকি তোলার মত মুচড়ে ওঠে–সে আওয়াজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
নাউয়াপাড়ার বাক নিয়েই ওরা দেখে এক হ্যাজাক জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে দীননাথের মুদিখানায় আর তার সামনের মাঠটুকুতে মরা মানুষের মত ফেলা কলাগাছের ধড়। একপাশে পাতার প। আলোতে অন্তত জনা ছয়-সাত কাজ করতে লেগে গেছে। দূর থেকে দেখে নিতাই বলে, আরে এগুলাও রেডিওর খবর পাইয়া গিছে, যাউক বাঁচাইল, হে-এ অমূল্যা।
ওদের হাঁক শুনে সবাই এদিকে তাকায়। কিন্তু কেউই কিছু দেখতে পায় না, আরো ওদের মুখের ওপরই পড়ে চোখ ধাধিয়ে দিয়েছে। হাতে কারো কারো দা, আর-এক হাতে কলাগাছ ধরে থাকা, কেউ শুধু হাতে, কারো হাতে উঁচলো লাঠি, সবাই এই বঁশবনের দিকে তাকিয়ে।
তারপর ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ চেঁচায়, কে হয়।
ততক্ষণে ওরা আলোর সীমানার ভেতর ঢুকে গেছে। নিতাই আগে-আগে, হাসতে-হাসতে।
৩.২ দক্ষিণে, পশ্চিমে–জাগো, আইস
তাও কেউ নিতাইকে চিনতে পারছে না দেখে সে চিৎকার করে ওঠে, আরে, সব ভূত দেইখছে নাকি?
আরে নিতাই? জগদীশ কাহা? আরে, তোমরা কুথায় গিছিল্যা? কলাগাছ ফেলে দিয়ে সবাই এগিয়ে আসে। ঐ আলোতে এদের চেহারা দেখলে মনে হয় অনেকদূর থেকে এল–প্রত্যেকের হাঁটু পর্যন্ত বালি। নিতাইয়ের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত বালি। ভিজে সে বালি গায়ের সঙ্গে লেগে গেছে। তাকে দেখাচ্ছে যেন বালির তলা থেকে বালি ফুড়ে উঠে এল। রাবণের অত লম্বা শরীরটায় বৃষ্টি আর বাতাস যেন বেশি লেগেছে। সেই অনেক বেশি বৃষ্টি আর বাতাস বহন করে সে কুঁজো হয়ে গেছে। জগদীশ পেছন থেকে লাফিয়ে ওঠে, সেই ধরো উত্তর পাক থিক্যা দক্ষিণ পাক পর্যন্ত জল মাইপ্যা আসছি, তিস্তা ব্রিজে সারা রাত্তির লাইট জ্বালাইয়া থুইছে।
