শালা, নিতাই উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত ঘষে রালি ঝাড়ে, তারপর দু চোখের পাতা থেকে বালি ঝরিয়ে দেয়।
বালিয়াড়ি ঘিরে সামনে দুজন এসে গেছে। নিতাই বলে, শালা, সিধ্যা হাঁটতে হাঁটতে উঠছি বালুবাড়ির মাথায়।
নিতাই আবার হাঁটতে শুরু করে।
.
০৯৫.
বানা, জাগরণ ও ঘুম
হেই, দেখ কেনে, জগদীশ আবার তিস্তার ভিতরত সিন্ধি না যায়, রাবণ এগিয়ে যেতে-যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে।
তুই চল না, শালো, পাহাড়ের নাগাল কুয়াশা নাড়ি-নাড়ি চইলব্যার লাগছে, রাবণের ঠিক পেছনেই জগদীশ ছিল, এটা রাবণ বুঝতে পারে নি।
বালিয়াড়িটা পার হতেই এদের একটা লাইন হয়ে যায়। পায়ে আলের মাটি পাওয়া মাত্র পায়ের আঙুলগুলো মাটি আঁকড়ে ধরতে পারে, চেনা মাটি আঁকড়ে ধরতে পারে যেমন অভ্যস্ত আঙুল। এই সব আলে ওদের পায়ের চিহ্নগুলো থেকে গেছে। নিজেদের সেই প্রাচীন পদচিহ্নের ওপর ওরা পা ফেলে, আন্দাজে কুয়াশায়। এই কুয়াশায় পায়ের মাটি স্পষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু পা দিয়ে মাটি অনুভব করা যায়। চরের উঁচু ডাঙা শুরু হয়ে গেছে। এখন সামনে ধানি জমি। তাতে অশ্বিনী রায় ভাদই পাকাচ্ছে বিঘা পাঁচ জমিতে। এবারের ফলন খুব ভাল ছিল। আজ শেষ রাত্রে পাকা ধান জলে ভাসবে।
অশ্বিনী রায়ের খেতের আগেই সরু-সরু ফালিতে সিঁড়ির মত উঠে গেছে নতুন চাষের ধান। এখন ধান গাছগুলো তলার জমি থেকে আল পর্যন্ত ওঠে নি। বাতাসে গত তিন দিন ধরে জলের মত উথালপাতাল খাচ্ছে। আর জলকুয়াশার ভারে নেতিয়ে প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে আছে। এই বাতাস আর বৃষ্টি দুটোই এই ধানের পক্ষে ভাল। যদি এরকমই চলে আরও দু-একদিন তাও মন্দ না। তারপর এক বেলা রোদ পেলেই মাটিতে শোয়া ধানখেত চাঙা হয়ে আকাশে, নীল আকাশের তলায় মাথা তুলবে অন্তত বিঘৎখানেকের কাছাকাছি লম্বা হয়ে। ধানখেতের এই লম্বা হওয়াটা বোঝা যায়, এরকম টানা বাতাসজলের পর ত আরও বোঝা যায়। বাচ্চারা যেমন হাত-পা ছাড় দিলে কেমন লম্বা আর রোগা হয়ে যায়, ধানখেতটাকেও সেরকম লাগে। এরপর যখন টানে নুয়ে যাবে তখন মোটা লাগবে। কিন্তু এই ধানখেতগুলো আর লম্বাও হবে না, মোটাও হবে না। আজ শেষ রাতে কাঁচা খেত ভাসবে।
এদিক থেকে প্রথম পড়বে–দুই নম্বর মিস্ত্রিপাড়া। এখান থেকেই চরের বসতি শুরু। মাঝখান দিয়ে রাস্তা আর দুই পাশে খেত। সেই বসতের পেছনে আবাদ। মনে-মনে ভাবলে পাহাড়ের মত লাগে। নীচের ধাপে বালুবাড়ি, পরের ধাপে খেত, মাথার ধাপে বসত। কিন্তু তাই যদি হত, পাহাড়ের মত উঁচুই যদি হত তাহলে ত নিজেদের বাড়িতে বসে বসে পাকা ধান, কাঁচা খেত সব জায়গায় জলঢোকা, বানভাসা দেখতে পারত। কিন্তু তিস্তার বন্যার কাছে এ উঁচুনিচুটা কোনো ব্যাপার নয়।
মিস্ত্রিপাড়ায় ঢুকে কিছুটা এগলেই কুয়াশা হালকা। দুই দিকে বাড়িঘর থাকায় বাতাস আর কুয়াশা ভেতরে ঢুকতে পারে না। কিন্তু বাড়ি ঘরের ওপরে ত জলকুয়াশা লেগেই আছে। আকাশের আলোত আর সে-সব ভেদ করে নীচে নামতে পারে না। তবু, মিস্ত্রিপাড়ার ভেতরে খানিকটা এগিয়ে ঐ মধ্যরাত্রিতে ওরা যেন পরস্পরকে দেখতে পায়, প্রায় ভোরের আলোতেই। নিতাই দাঁড়ায়। নিতাইয়ের মালকোচামারা কাপড় তার ঊরুতে সেঁটে আছে, তার শরীরের জল আর বালি কেমন চমকায়। নিতাই তার বাবরি চুলের গোছা সামনে আনে, তারপর এক ঝটকায় পেছনে ঠেলে দেয়। চুলের বালি আর জল ঝেড়ে ফেলে। রাবণ দাঁড়ায়। রাবণ সবচেয়ে বয়স্ক, সবচেয়ে লম্বা। তার মাথায় চুল নেই, একেবারে গোড়া হাঁটা। তাকে ঐ আবছায়ায় গাছের মত লাগে। তার লম্বা শরীরের অতটা দৈর্ঘ্য, জুড়ে জলবিন্দু চমকে ওঠে–তার পরনে শুধু একটা নেংটি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত রাবণকে মনে হয় ঐ জলে প্রতিবিম্বিত আলো দিয়েই আবছায়া তৈরি সে তার দুই চওড়া হাতে, মুখের, গায়ের ও হাতের প্রতিবিম্ব মুছে ফেলে।
জগদীশ সবচেয়ে খাটো যে সেটা বোঝা যায় রাবণের পরে সে আর গজেন পর পর দাঁড়িয়ে গেলে। তার ধুতি, কোমরে খুঁট দিয়ে পরা, আবার খানিকটা গোটানো। তার ওপর কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত অংশটা থাকে-থাকে বসানো। বড় মাথা ছোট ঘাড়ের ওপর যেন আলগা করে রাখা আর সেই মাথার জায়গা করে দিতেই ঘাড় দুটো দু পাশে উঁচু হয়ে আছে, যেন হালবওয়ার মত উঁচু। জলবিন্দু সেই সব। উঁচুনিচু জায়গা, চওড়া বুক, বুকের খাজ, ছোট মেদহীন পেট ভরে রেখেছে। জগদীশের শরীরের সবটা এই অস্পষ্টতায় দেখা যায় না কিন্তু জলে আলোর আবছায়া প্রতিফলনেও বোঝা যায়, তার শরীরের দৈর্ঘ্যের অভাব, প্রস্থে সামলানো হয়েছে-পেশিবহুল প্রস্থে। জগদীশ খুট থেকে অনেকখানি কাপড় বের করে, ভেতরে গোঁজা ছিল। সেই শুকনো কাপড়ে সে মাথা, ঘাড়, মুখ মোছে, দুই হাতে। তার মুখ দিয়ে একটু তৃপ্তিরও আওয়াজ হয়, যেন, এইমাত্র স্নান সেরে উঠল।
গজেন দাঁড়িয়ে পড়ে এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে, যেন ঐ ছোটখাট পাতলা শরীরের ওজন একটি পায়ের পক্ষেও যথেষ্ট নয়। সে এমন ভাবে দাঁড়ায় যেন এতটা রাস্তা বাতাস ঠেলে, বালি ঠেলে, আসে নি, যেন এই রাস্তাটুকু আসতে তার সারা শরীরের পেশিগুলো যদিও দলিত হয়েছে–সে আরো এমন অনেকখানি রাস্তা যেতে পারে। গজেনের মাথা থেকে পা খালি, শুধু মাঝখানে একটুখানি নেংটি। সে তার শরীরের কোনো জলকণা মোছে না, যেন ওগুলো জলকণা নয়, তার শরীরের ভেতর থেকে বেরিয়েছে। সেই জলকণার আবছায়া প্রতিফলনে গজেন নিজের শরীরকে নিজের শরীরে খোদাই করে দাঁড়িয়েছিল–তার কিশোরের মত শরীরকে খোদাই করে।
