ফলে, এরা যেন এদের পায়ের পক্ষে অপরিচিত এক ভূখণ্ড দিয়ে হাঁটছিল। সাধারণভাবে, ত এদের প্রায় চোখ বুজে চলে যাওয়া উচিত, এই চরের প্রতিটি অংশ পায়ের তলায় তলায় এমনই চেনা। কিন্তু গত মাত্র দু-তিন দিনে একেবারে পারের এই বালুবাড়ি এমন অচেনা হয়ে গেছে যে যদি বাতাস না থাকত, যদি আলো এমন ছায়াহীন ধূসর না হত, তা হলেও ওদের পক্ষে সোজা হেঁটে যাওয়া সম্ভর হত না।
কে, বোঝা যায় না, কিন্তু, একজন ওদের চাইতে একটু বেশি লম্বা হয়ে যায়। পেছনের সবাই দেখতে পায় সে ধীরে ধীরে উঁচুতে উঠছে। আর, একটু উঁচুতে উঠেছে বলেই হয়ত বাতাস থেকে মুখটা একটু সরাতে পেরেছে। বালিয়াড়ির চড়াই ওভাবে ভাঙায় নীচ থেকে মনে হচ্ছে যেন পুরো বালিয়াড়িটাই যেন হাঁটছে। ধূসরতায় বালি আর মানুষ একে হয়ে গেছে। শুধু মানুষের মাথার চুল, তার পদক্ষেপের ভঙ্গি, তার শরীরের বিন্যাস বুঝিয়ে দেয় ওখানে একটা শারীরিক আলোড়ন আছে, বাধার সামনে মানুষের শরীরের আলোড়ন।
ঐ বালিয়াড়িতে যে উঠেছিল, সে টের না পেয়ে উঠেছে। সব জায়গাতেই ত বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে, সব জায়গাতেই ত পা ডুবে যাচ্ছে। সামনের পায়ের ওপর ভর দিয়ে পেছনের পা তুলতে গেলে, সামনের পা ডুবে যাচ্ছে। পায়ের বাটিতে টান লাগছে। দুই পায়ের সমতা ঠিক রাখতে না পেরে টলে যেতে হচ্ছে। আর টলে যাওয়ার ফলে দিক বদলে যাচ্ছে। এরকমভাবে এই আচ্ছন্নতার ভিতর পথ চলতে গেলে কারো কী আর পায়ে-পায়ে টের পাওয়ার কথা যে সে চড়াইয়ে উঠছে, তাও আবার বালিয়াড়ির চড়াইয়ের মত পিচ্ছিল চড়াইয়ে? সে টের পায় না। তাকে ঐ পুরো চড়াইটা ভাঙতেই হয়। কিন্তু, নীচে যারা ছিল তারা ত চলমান ঐ বালিয়াড়ি দেখে বুঝতে পারে কেউ একজন বালিয়াড়ি ভাঙছে, ওখানে বালিয়াড়ি আছে। সুতরাং তারা বায়ে ঘুরে যেতে চেষ্টা করে–যতটা বায়ে ঘোরা সম্ভব, যতটা চেষ্টা করা সম্ভব। বায়ে ঘুরতে গিয়ে আর-একটা চড়াই ওরা ডিঙবে কী না সে বিষয়েও নিশ্চয়তা। নেই। কিন্তু সামনে একজন বালিয়াড়ির মাঝখান থেকে যখন জানান দেয় যে ওখানে বালিয়াড়ির চড়াই, তখন আর-সবাইকে একটু ডাইনে বায়ে সরে যেতেই হয়–বালিয়াড়ি না ডিঙিয়ে শুধু বালিয়াড়িটাকে ঘের দিয়ে ঘুরলেই ওপারে যাওয়া যাবে। ডানদিকে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না–বাতাস ওদিক থেকেই আসছে। বরং বাঁয়ে ঘুরে গেলে ঐ বালিয়াড়িতেই বাতাস থেকে একটু বাঁচা যাবে। একটু হলেও সে ত। সঁচাই।
যে চরটাকে নিজেরা হাসিল করে আবাদের জায়গা বানিয়েছে, বসবাসের জায়গা বানিয়েছে, সেই জায়গাটা দিয়ে এমন অন্ধের মত হাঁটায় একটা পরাজয় আছে। সেই পরাজয় মানতে-মানতে ওদের হাঁটতে হয়। বাতাসের ধাক্কায় নিজেদের চলার গতির আন্দাজ মেলে না–কতক্ষণে কতটা পৌঁছানো। যায়, বোঝা যায় না। বালির পেছুটানে নিজেদের হাঁটার গতির আন্দাজ মেলে না–কতটা হাঁটলে কতটা পৌঁছানো যায় টের পাওয়া যায় না। জলকুয়াশা-দৃষ্টির গতির আন্দাজ মেলে না–কতটা এল আর কতটা যেতে হবে হিশেব পাওয়া যায় না।
যারা নীচে ছিল তাদের ভিতর একজন চিৎকার করে, সগায় মিলি ফিরিবার ধইচছি, এ্যালায় ঐটা কুনটা আকাশত উঠিবার ধরিছেন হে?
স্বরে চেনা যায়, কথাটা রাবণের। কোনো জিজ্ঞাস নেই–কেবল মন্তব্য, একজন আকাশে উঠে যাচ্ছে।
আকাশখান এইঠে বালিত মিশি আছে, কায় জানে? কথাটা নিতাইয়ের, বালিয়াড়ির মাথা থেকে।
ঐঠেও কি বানা আছে হে? রাবণ রসিকতা করে।
বালিয়াড়ির মাথায় নিতাইয়েরও হাসি শোনা যায়–এইহানে ব্রিজের নাগাল লাইট জ্বলিছেন।
দেইখ্যা লাভটা কী হবে হে? এতক্ষণ ত গাড়ি-গাড়ি আলো দেইখলেন না? গজেন বলে। মনে হয়, নিতাই আরো এক ধাপ উঠেছে। এখন যদি বালিয়াড়ি ভেঙে ওখান থেকে পড়ে যায়, নিতাইকে তাহলে আর পুরোটা ঠেলতে হয় না।
রাবণ বালিয়াড়ির ভিত দিয়ে একটু ঘুরতে পারে।
সেখান থেকে মাথা উঁচু করে বলে, ঐ আলো দেখি ত জানলু বানা আসিবার ধইচছে, নয় ত নিন্দির মাঝত বানভাসি হবার ধইরত রাবণ বোধহয় বালিয়াড়ির একটু আড়াল পায়, তার কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যায়।
তা ঠিক, ঠিক, ঠিক কথা, জগদীশ বারুইয়ের ছানিচোখের অবলম্বনহীনতা তার স্বরে শোনা যায়। কিন্তু বোঝা যায় না, আরো যে কজন বালিয়াড়ির ভিত ধরে এগচ্ছে তার ভেতর কোনটা জগদীশ।
সগায় ত জানে হামরালা এইঠে আছি, নৌকা আসতি পারে, গজেন বলে।
কেউ জবাব দেয় না বলে সে আরো যোগ করে, মিলিটারি নামিবার পারে, নৌকা আসিবার পারে, রিসকু করিবার তানে।
রিসকু আসিলে কি ফিরি যাবে না ডাকি-ডাকি তুলিবার ধইরেব? রাবণ বলে।
ক্যানং করি মিলিটারি মানষি বুঝিবার পারে এ্যানং বালুবাড়ি আর ধান্ধিনা পাথারের পাছত একখান চর আছে।
.
মিলিটারির নৌকা ত ভটভটি নৌকা, শুইন্যা ঘর থিক্যা আসা যায়, নিতাই বলে।
ভটভটি নৌকা চলব্যার পারে না, কাদা টুইক্যা যায়, জগদীশ হে হে করে আনন্দ জানায় হঠাৎ, যেন, এই জলে মোটরবোট না-চলায় তার কোনো আনন্দের ব্যাপার আছে। নিতাই বালিয়াড়ির মাথার ভেতরে হঠাৎ ডুবে যায়। তাকে আর দেখা যায় না। তারপর সম্পূর্ণ নৈঃশব্দ্যে সেই বালিয়াড়ির মাথা থেকে বালির ভেতর ডুবে তল দিয়ে বেরিয়ে আসে। নিতাই যখন দাঁড়ায় তখন তার ভেজা শরীরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভেজা বালি সেঁটে যায়।
