গজেন আবার প্রশ্ন করে।
হয়, আসুক, সেই প্রায় শোনা যায় না গলায় আবার ধুয়ো ওঠে। জগদীশ মাথা নাড়ে।
পাহাড়ঠে যে ফ্লাড নামিবার ধইচছে, স্যালায় ত আর হারি যাবার না পারে?
না পারে
এইঠেই নামিবার নাগিবে, এই ঠেই, এই তোমার চরত আসি ধাক্কা মারিবেই।
মারিবেই
স্যালায় হামাক এসকু (রেসকিউ) হবা নাগিবে?
নাগিবে
ও এসকু হবার তানে কী নাগিবে? নৌকা নাগিবে।
নাগিবে
নৌকা ত নাই রো—
নাই রো।
এক আছে রংধামালির হাটের ভাঙা নৌকাখান–সেইটা কুনো কাজে লাগিবার না হয়।
না হয়
হামরালা যেইলা এসকু হয়্যা যাম তার পাছত মিলিটারির নৌকা নামিবে।
নামিবে
এ্যালায় এসখু আছে, নৌকা নাই।
নাই
স্যালায় নৌকা আছে, এসকু নাই।
নাই
নিতাই দু হাতে তার পাশের লোকজনকে একটু সরিয়ে দিয়ে নিজে দুই পা পেছিয়ে যায়। তারপর গজেনের পেছনে এমন জোরে লাথি কষায় যে গজেন উল্টো দিকে রাবণের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে যায়। রাবণ সরে যেতেই সে ভেজা বালির মধ্যে গিয়ে পড়ে। নিতাই তার দিকে আবার ধেয়ে যায়, শালা, হিন্দি সিনেমা দেইখ্যা দেইখ্যা জোকার করা শিখছে; তর কথা কওয়ার নাম নাই; এইডা হয়, না হয়, এইডা না হয়, হয়। কিন্তু নিতাই ধেয়েই যায়, আর মারে না। ততক্ষণে গজেন সোজা হয়ে গেছে, উঠে দাঁড়াতে পারে নি। এক হাতের কনুইয়ে মাটির ওপর ভর রেখে আর-এক হাত তুলে, গজেন বলে, ছাড়ি দে, ছাড়ি দে, কহিছু, কহিছু এ্যালায় ভেলা বানাবার ধরি চল দুই চারিখান।
গজেনের কথায় নিতাই সোজা হয়ে জিজ্ঞাসা করে, আর?
গজেন এবার উঠে বসার সুযোগ পায়, আর কহিছু দুই-চারখান পাট প্যাচি মশাল বানি রাখ কেনে, যদি কামত নাগে।
সমস্যার এমন সহজ সমাধানে নিতাই চিৎকার করে ওঠে, ত, উঠ কেনে।
.
০৯৪.
বালিয়াড়ির মাথায় কে?
এতক্ষণ এত আলাপ আলোচনা যেন হয়ই নি এমনভাবে নিতাই রওনা দেয়, যেন বহু আগে থেকেই ঠিক করা আছে যে আজ রাত্রিতে ভেলা বানানো হবে। নিতাই দু-এক পা হাঁটতেই বাকি সবাই তার পিছন পিছন-পিছন চলতে শুরু করে।
সবাই মিলে কথাবার্তা যতক্ষণ চলছিল, ততক্ষণ যেন বাতাসটা আড়ালে-আবডালে ছিল। বা, এরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে বাতাসটাকে এক রকম রুখে রেখেছিল, নিজেদের ভেতর কথাবার্তা সারার জন্যে। কথাবার্তার সময় তারা নিজেদের মাথা এত নাবিয়ে আনে, ঝুঁকিয়ে আনে, যে মাথার ওপর আকাশটাও যেন আকাশের মত ওপরে উঠে যেতে পারে। প্রলয়ের ভেতর আত্মরক্ষার চেষ্টায় যে এক ধরনের বিচ্ছিন্ন প্রকার নিজের চারপাশে তৈরি করে নেয়া যায়, সেই রকম অস্থায়ী প্রাকার নিজেরাই ভেঙে ফেলে এরা হাঁটতে শুরু করলে তিস্তা থেকে আকাশ জোড়া জলকুয়াশা আর বাতাস মুহূর্তের মধ্যে এদের ঘিরে ধরে, এদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দু-চার পা যেতেই মনে হয় যেন এরা এতক্ষণ অন্য ভূমণ্ডলে ছিল, এখন এইমাত্র এখানে পা ফেলেছে। আকাশ একেবারে মাথার ওপর নেমে আসে। দুই হাতে সেই আকাশ সরিয়ে সরিয়ে ওদের পথ করে নিতে হয়। কিন্তু বাতাসের ধাক্কায় আবার পেছিয়ে আসতে হয়, বা দাঁড়িয়ে পড়তে হয়। বাতাস যেন এতক্ষণে এতগুলো মানবশরীর পেয়ে এই শরীরগুলোর ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই শরীরগুলোর প্রত্যেকটিকে ঘিরে যেন আলাদা-আলাদা ঘূর্ণি, চলমান। এদের চলার সঙ্গে সঙ্গে ঘূর্ণিগুলিও চলছে। এই শরীরগুলোকে বাদ দিয়ে বাতাসের আর কোনো অবলম্বন নেই যেন এখানে।
সত্যি করে নেইও। মাইল চারেক লম্বা আর মাইল তিন চওড়া এই চরের এই দক্ষিণ সীমা ঢালু হয়ে নদীতে মিশেছে। এই জায়গাটা বালুবাড়ি মাঝখানের উঁচু ডাঙা থেকে গড়িয়ে-গড়িয়ে জলে নেমেছে। এমন হতে পারে যে এখান দিয়েই চরটা প্রথম নদীর ভেতর থেকে সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে উঠে এসেছে। সঙ্গে নিয়ে এসেছিল নদীর ভেতরের বালি, পাথর। তারপর, এখানে বসতি হল, চাষ হল কিন্তু এর বালি আর ঘোচে নি।
ওরা এখানে এসেছিল পশ্চিম পারের রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে। এখন ওদের ফিরতে হচ্ছে পুবদিক বরাবর হেঁটে। ফিরতে হচ্ছে, প্রথমত, বাতাসের বাধা সঙ্গে নিয়ে। দ্বিতীয়ত, পায়ের তলায় ভেজা বালিতে পা গেড়ে যাচ্ছে ও তোলার সময় পিছলেও যাচ্ছে। তৃতীয়ত, এই জায়গাটা একটু চড়াই–সেই চড়াইটাই ওদের ঠেলতে হচ্ছে।
নিতাই হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে, নরেশুয়া আর নকু তোরা টর্চ হাতে এইঠে থাকি যা। কিছু দেইখলে দৌড় পাড়া খবর দিবি।
এইঠে দৌড়াবে ক্যানং করি গজেন চিৎকার করে হাসে, জল..দিয়া যাস কেনে, সাঁতরিয়া।
নরেশ আর নকু পেছনে দাঁড়িয়ে যায়, তারপরে ফিরতে শুরু করে।
একটু দূর থেকে বা ওপর থেকে যদি এই কজনকে দেখা যেত তা হলে তেমন দৃশ্যঅভিজ্ঞ কারো মনে হতে পারত, বালিরই কতকগুলি স্তম্ভ বাতাসের টানে এগিয়ে চলেছে। জলকুয়াশার অস্পষ্টতা আর বালির অস্পষ্টতা মিলে একাকার হয়ে গিয়েছে এমন, সমস্ত দৃশ্যটাকেই একটা মাত্র দৃশ্য মনে হয়। কিন্তু পায়ে-পায়ে সেই দৃশ্যের বৈচিত্র্য টের পাওয়া যাচ্ছিল, বাতাসের ধাক্কায় অন্ধের মত পথ চলতে চলতেও।
কারণ, বৃষ্টিতে সমস্ত বালি ভিজে যাওয়ার আগেই বাতাসে বাতাসে এই বালির ভূগোল পরিবর্তমান থেকেছে। জলের তল থেকে শুশুকের মত উঠে আসা কোনো বাতাসে নীচের থেকে বালি আকাশে উঠে ঝুরঝুর করে জমা হয়ে গেছে একটু ওপরে বা আকাশের ভেতর থেকে চিলের মত নেমে আসা কোনো বাতাসে ওপরের কোনো স্কুপের মাথা ঝুরঝুর করে ভেঙে ছড়িয়ে গেছে। চারদিকে বালির ডাঙার মাঝখানে একটুখানি কালো জল টলটল করত-বাচ্চারা সাঁতার কাটতে পারে এ রকমই জল-এই ক-দিনের বাতাসে সে পুকুর ভরে গেছে, আর ফলে, জায়গাটিই হয়ে গেছে ফুটবল মাঠের মতন সমান। এই পরিবর্তনের পর বৃষ্টি নেমে তাকে পরবর্তী কয়েক দিনের রো পর্যন্ত একটা স্থায়িত্ব দেয়।
