শুইনলি কইছে আসামের গাড়ি বন্ধ কইরা দিছে, তা রেলগাড়ি কি তিস্তাবাজার দিয়া যায় নাকি? নিতাই ঠাণ্ডা গলাতেই বলে।
শুইনছে উপর থিক্যা বন্যা নামবার ধরছে, তাই বন্ধ কইরা দিছে, সে আবার কোন বছর দেয় না, জগদীশ বলে।
ঐ কথাখান ত এডিওত ভাল করি শনিবার নাগত, এলের ব্রিজত গাড়ি বন্ধ হইয়া গিছে নাকি আগতই বন্ধ করিছে রাবণ বলে।
এ্যাহন ত কথা ঝাড়ত্যাছ পুরুতের নাগান, তখন রেডিও শুইনতে গেলেই পারত্যা, রাবণের কথায় জগদীশ ঝাঁঝিয়ে উঠে রাবণের দিকে না তাকিয়েই জবাব দেয়। তাতে মনে হয় সে বোধহয় নরেশকেই বলে।
কহসেন কী আগরবাগর, বেলা আড়াইটার গাড়ি ত এই ব্রিজ দিয়া পার হইসে, গজেনের হঠাৎ মনে পড়ে যায় আর সে সবাইকে তাড়াতাড়ি মনে করিয়ে দেয়।
হ্যাঁ, কথাটা সকলের মনে পড়ে। মনে পড়ে, গোপনে, একান্তে। এটা এমন মনে পড়া নয় যা নিয়ে লাফালাফি ঝাপাঝাপি করতে হবে। গজেন ওটা খুব ভাল কাজ করেছে যে তার মনে পড়েছে, সে মনে পড়িয়ে দিয়েছে। এখন তারা এই ট্রেনের হিশেব থেকে পেছিয়ে-পেছিয়ে হিশেব কষতে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই এই শেষ সিগন্যালের পরে শিবকের রেলব্রিজ দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তার মানে কাল থেকে আর ট্রেন চলবে না। তার মানে, তাহলে সিগন্যালটা তিস্তাবাজার থেকেই এসেছে। এখানে সেই জল আসতে আসতে সেই সকাল হয়ে যাবে। তা হলে আজ রাত্রিতে আর চর ছেড়ে না গেলেও চলে।
নিতাই বলে, ট্রেন না হয় গিছে, কিন্তু সিগন্যাল দিল কুখন। স্থানীয় সংবাদ কেউ শুইনছে?
আমি ত শুনছি, বাজার দর শুনছি, না, তহন ত কিছু কয় নাই, না কয় নাই, জগদীশ তাড়াতাড়ি বলে। একটু চুপ করে থেকে নিতাই বলে, তালই, ভাল করি ভাইব্যা দ্যাখেন কয় নাই ত–
জগদীশ একটু চুপ করে থাকে। তার পক্ষে সেই সন্ধ্যার কথার স্মৃতি এই মধ্য রাতে খুঁচিয়ে তোলা খুব সহজ নয়। কিন্তু তবু সে একবার মনে করতে চেষ্টা করে যে কোন অবস্থায়, কী ভাবে সে খবরটা শুনছিল। বাজার দর শোনার সময় ত হাতের কাজ ফেলে কান খাড়া করল। কিন্তু দিন তিনেক ধরে এই বাতাসে আর জলের মধ্যে থেকেও কি জগদীশ বন্যার খবরটা শোনার জন্যে কান খাড়া করে থাকে নি? হঠাৎ মনে পড়ে যায় জগদীশের–না, কয় নাই, তোর কাকি জিগ্যাইল চিক্কর দিয়্যা, কী বানাটানার কাথা কিছু কইসে, আমি কইল্যাম, চিকুর দিয়্যা, না কয় নাই, কয় নাই, না, কয় মাই
তয় এতক্ষণ কী নিদ্রা গিছিলেন? নিতাই খেঁকিয়ে ওঠে, ধরো রাইত আটটার মইধ্যো সিগন্যাল দ্যায় নাই, সিগন্যাল দিছে তার বাদে, দশটাও যদি ধরো, রাত্তির চাইরড়ার আগে জল আইসবে না, আর ধরো, যদি একঘণ্টা আগেও ধরো, তা হলিও ত রাইত তিনড়ার আগে আইসবে না।
তা তিনটাত আসিলে করিবেনটা কী! স্যালায় যা আন্ধার হইবে, চান্দ ডুবি যাবে, রাবণ বলে।
আকাশের দিকে না তাকিয়ে তারা সেই ছায়াহীন মরা আলোতে চাঁদের হিবেশনিকেশ বুঝে নেয়। এখন শুক্লপক্ষ চলছে। চাঁদের আলো ঐ জলকুয়াশা ভেদ করে মাটিতে এসে পৌঁছচ্ছে না। তার ওপর আছে আকাশের মেঘ। আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদটা কোথায়, তার হদিশও করা যায় না। শুধু চারদিকের এই আবছাভাবে বোঝা যায় কোথাও থেকে একটা আলো আসছে, নিশ্চিতই আসছে। রাত তিনটের সময় এই আলো থাকবে না। কিন্তু তখন যদি সকলে মিলে জিনিশপত্তর নিয়ে পারের দিকে যেতে হয়, তা হলে? চারটের সময়, চারটে কেন, পৌনে চারটের সময়ই এই সমস্যা আর থাকবে না। কিন্তু ফ্লাডের ঐ জল ত এক-ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট দেরি করে আসবে না। তাহলে?
ঘুরে-ফিরে তারা আবার সেই একই সমস্যার সামনে এসে পড়ে। ট্রেন এই ব্রিজের ওপর দিয়ে শেষ কখন গেছে তা গজেনের মনে পড়া সত্ত্বেও বন্যা আসার সময় নির্ণয় করা যাচ্ছে না।
গজেন হঠাৎ বলে, হরে নিতাই, ফ্লাড চারিটায় আসিলে কি তোর হাতত পাখনা গজাবে, পাখির নাখান উড়ি যাবি, পারত?
কী হইছে ক না, শালা পালা গাবার ধরছে, নিতাই ধমকে ওঠে।
না, কহিবার ধইরছি কি, সকালেও ত যাবার নাগিবে, পারত, স্যাল্যায় ক্যানং যাবি?
সাঁতরি যাবে, দিনের আলোয় আবার কী, সব ত দেইখব্যার পাব।
হে-ই ধর সুখরঞ্জনের মাও, কানকাটুর মাও, আর তালইয়ের শাশুড়ি–সগায় সাঁতরি যাবার পারিবে? না, উমরাত বিসর্জন দিয়া যাম–, গজেন বেশ প্যাচানো যুক্তি পায়।
দে, দে, বিসর্জন দিয়া দে; ঐ বুড়িক নিব্যার জইন্যেই ফ্লাড আসিবার দে, এ্যাহন ঘাও দিয়্যা এ্যামন গন্ধ ছাড়ে যে ঘরে থাকন যায় না, জগদীশ বারুই হাত তুলে বলে। তার শাশুড়ি অসুখ নিয়ে এখানে মৃত্যু শয্যায়।
তা কইব্যার চাস কী, কয়্যা দে না, নিতাই ধমকে উঠেও যেন গজেনকে মিনতি করে। সমস্যার সমাধানটা এখনই দরকার।
এক কাম ধরো কেনে, সিগন্যাল য্যালায় দিবার ধইচছে, ফ্লাডের জল নামিবার ধইচছে, কী, কও, ধইচ্ছে কি ধরে নাই, গজেন প্রশ্নোত্তরে নিজের কথা গুছিয়ে নিতে চায়।
হয়, ধইচছে, ধইচছে, কেউ একজন সায় দেয়, নিম্ন স্বরেই, যেন জানাই আছে, এটুকু সায়েই গজেন কথাগুলো বলে যেতে পারবে। জগদীশ মাথা ঝাঁকায় সম্মতি জানিয়ে, এমনকি যেন গজেনের পরের কথাটাতেও সে আগাম সম্মতি জানাচ্ছে।
সেই তোমার রাইত তিন ঘড়িত আসুক আর ধরো কেনে কালি সকালত আসুক?
