সেই মুহূর্তটিতে ওরা যেন এই নদীর ভেতরে চরের লোক আর থাকে না। নদীর ভিতরের এই চরে ওদের এমনই স্বাভাবিক বসবাস যে ওরা চরকে চর বলে মনে রাখে না, নদীকে নদী বলে চেনে না। ডাঙা দিয়ে হাঁটার মতই জল দিয়ে হেঁটে যায়। কিন্তু তখন ঐ বাতাসের মধ্যে ওরা ভয় পেয়ে যায়, নিজের নিজের মত করে গোপন, একান্ত ভয়, গভীর চাঁদনিতে কোনো অচেনা চরের বালুর ওপর দিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে আসার সময় যেমন ভয় হয় পাশে কেউ হাঁটছে। এই চরটা জলপাইগুড়ি শহরের কাছে, রায়পুর চা বাগানের পাশে, তিস্তার রোড-ব্রিজ আর রেলব্রিজর উত্তরে। বাঁ দিকে দোমোহনি। এখান থেকে তিস্তা-ব্রিজের আলো, দেখা যাচ্ছে শুধু নয়, এতক্ষণ দেখে দেখে মনে হচ্ছে তারাও ঐ আলোর অন্তর্গত। নিরাপত্তা এত কাছে। ইলেকট্রিক আলল, বাঁধ, পাকা বাড়ি, লোহার ব্রিজ, কংক্রিটের ব্রিজ–এই সমস্ত মিলে এক নিরাপত্তা, তাদের ডাইনোয়ে, তাদের সামনে, এমনই প্রত্যক্ষ যে ছ-ঘণ্টা বা চার-ঘণ্টা পরে মরেও যেতে পারে এমন বাঁচতে এখন ভয় হচ্ছে।
জল বাড়ছে গত বুধবার থেকেই। বৃষ্টি শুরু হয়েছিল মঙ্গলবার রাত থেকে। কিন্তু মঙ্গলবার রাতের জলে ত আর এ নদীর জল বাড়বে না। বরং এ নদীর জল বাড়তে শুরু করেছিল এখানে বৃষ্টি থেমে যাবার পর। তখন বাতাস উঠেছে। এই টানা বাতাস। একেবারে যেন নদীর ভেতর থেকে জল নিয়ে এই বাতাস উঠে আসছে আর নদীর আকাশ জুড়ে সেই জলকণা ছিটিয়ে দিচ্ছে। বাতাসবাহিত জলকণায় আকাশমাটি জুড়ে এই জলকুয়াশা স্থির হয়ে আছে। বাতাস থাকলে ত হিমকুয়াশা মুহূর্তে কেটে যায়। কিন্তু এ জলকুয়াশা বাতাসের সঙ্গে-সঙ্গে বাড়ে, যত বাতাস তত ঘন হয়। বাইরে থেকে বা ওপর থেকে দেখলে এই চরটাকে আর আলাদা করে বোঝা যেত না, মনে হত, নদী-আকাশ জোড়া এই জলবাত্যায় চরটাকে নদীর মধ্যে টেনে নিয়েছে।
কিন্তু এত সত্ত্বেও এরা জল দেখে বুঝেছিল বিপদ নেই।
বিপদের গন্ধ বাতাসে এল শুক্রবার, আজকের, সকাল থেকে, বা বেস্পতিবার, কাল শেষ রাত থেকে। সেও রেডিয়োর ফলে, আর, পারে গিয়ে নানা জন নানা খবর নিয়ে আসায়। পাহাড়ে তুমুল ধস নামছে, পাহাড় ভেঙে ঢল নামছে। বন্যা-ডিপার্টমেন্ট থেকে সিগন্যাল দেয়া শুরু হয়েছে।
এত সত্ত্বেও আজকের এই শুক্রবারের রাতটা, এখন, এই রাত প্রায় বারটায়, যে রকম বিপদসঙ্কুল হয়ে উঠল, তেমন না হতেও পারত। বাতাস কমে যেতে পারত। জল আর না বাড়তেও পারত। সেরকম একটা হিশেব ছিল বলেই আজ বিকেল পর্যন্ত সবাই দেখেছে। আর, দেখার পর আজ রাতে এরকম দল বেঁধে চর ঘুরতে বেরিয়েছে, নদীর জলের ধরন-ধারণ বুঝতে। তিস্তা ব্রিজের ওপর যদি রাত দশটাতেও আলো না দেখত, তা হলে হয়ত জলটল দেখে, সকাল নাগাদ আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাবে এ রকম একটি আন্দাজ নিয়ে, যে যার মত ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। তার পর, সেই রাত আড়াইটে-তিনটের সময় ঘুমের ভেতর বন্যা ঢুকে যেত, সেই আটষট্টির মত। কিন্তু এখন, এখান থেকে সেই পনের-ষোল বছর আগের সময়টাকে যেন সহজ ঠেকে। যেন, তখন সেবন্যা তাও সামলানো, গেছে, এখন সেরকম বন্যা আর সামলানো যাবে না। তিস্তা ব্রিজের আলো থেকে রেডিওর সংবাদে জানা সিগন্যাল পর্যন্ত সেই বন্যা এত বেশি পূর্বজ্ঞাত হয়ে গেল যে চার বা ছ-ঘণ্টা পর গভীর ঘুম থেকে মুহূর্তে সম্পূর্ণ জাগরণে জেগে প্রায় অনিবারণীয় মৃত্যুর ভেতর থেকে বেঁচে ওঠার জন্যে প্রয়োজনীয় তড়িৎস্পর্শ শরীরের ভেতরে আর খেলে না। বরং তার বদলে ভয় ছড়িয়ে যায় সারা শরীরে। জানা গেল, অথচ, সেই জানা থেকে কোনো উপায় হাতে এল না–এমনি এক নিরুপায়ের ভেতরে সেই মধ্যরাত্রিতে ঝড় জলের মধ্যে ওরা দাঁড়িয়ে থাকে। যেন, এই খবর, এই খবর জানার আনুষঙ্গিক ছিল–অন্তত এমন কিছু নৌকো, যা সারারাত ধরে এই চরের মানুষের সংসারকে ডাঙায় নিয়ে গিয়ে তুলতে পারে। কিন্তু এত বড় চরে ত এখন নৌকো বলতে দু-তিনটে ভাঙা ডিঙি আর একটা খেয়া নৌকো। এই খেয়াতেই সারা দিন প্রধান স্রোতটা পেরনো হয়। তার পরে হেঁটে, সাঁতরে পারে ওঠা যায়।
তিস্তা ব্রিজে আলো জ্বলছে। তার মানে তিস্তা ব্রিজ রক্ষার কাজ শুরু হয়ে গেছে। আটষট্টির বন্যার সময় বন্যার খবরই পাওয়া যায় নি। আর এখন বন্যার খবর আসার পর সিগন্যাল দেওয়া ত হয়েইছে, সাইরেনও বোধহয় বেজে গেছে, এমন কি তিস্তা ব্রিজের আশেপাশে যাতে ভাঙন না ধরে তার জন্যে হয়ত গাড়ি গাড়ি বোন্ডার নিয়ে সারি সারি ট্রাকও দাঁড়িয়ে গেছে।
কিন্তু এখন এই দলের ভেতরে আটষট্টির বানভাসা এতগুলো লোক আটষট্টি থেকে পনের-ষোল বছর পরে বন্যার নিশ্চয়তা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞানটুকু নিয়ে একই উপায়হীনতায় অপেক্ষা করছে। আটষট্টিতে জ্ঞানই ছিল না, অপেক্ষাও ছিল না। তখন মনে হয়েছিল–আগে জানলে বাঁচা যেত। এখন, এত আগে জেনেও বাঁচার কোনো নিরাপত্তা, এরা, এই দলের এরা, নিজেদের ভেতর থেকে সংগ্রহ করতে পারে না।
.
০৯৩.
হিন্দি সিনেমার জোকার
বানার খবরের হিশাব ত ঐ তিস্তাবাজার থিক্যাই দেয়, ঐখান থিক্যাই ত সিগন্যাল দ্যায়, এর মইধ্যে আবার শিবক আইসল কবে থিক্যা? নরেশ বলে, এটা না বুঝেই সে-ই একটু আগে এর উল্টো কথাটা বলেছে।
