ত টাইম জিগাইলি, বেটাইম কব নাকি?
হে-ই, চুপ যা, চুপ যা–নিতাই এই ভিড়ের মাঝখানটাতে দাঁড়ায়। নিতাইয়ের চুলগুলো বাবরি। বাতাসে সব চুল তার মাথায় ওপরে উঠে আসে আর মাঝে-মধ্যেই ফণা তোলে। সেই চাপা আলোয় নিতাইয়ের মেদহীন শরীরের রেখাটা যেন খোদাই হয়ে যায়। এতক্ষণ এরা একসঙ্গে এখানে আছে–যেন দঙ্গলে ছিল সবাই। এতক্ষণ, এই বাতাস, এই বৃষ্টি, এই আলো তাদের ঢেকে রেখেছে। এখন কি স্পষ্ট হতে শুরু করল? নিতাই দুই হাত ওপরে তুলল, খাড়াও, এই তালই চিল্লাবেন না, শুনেন–
ভিড়টা একটু ঘন হয়।
নিতাই বলে; শুনেন, এখন বাজে রাত্তির সাড়ে এগার। ধরেন, তিস্তা বাজার থিক্যা এই খানত ফ্লাড আইসতে লাগে, কতক্ষণ, এই নরেইশ্যা, ছয় ঘণ্টা
হয়, ছয় ঘণ্টা
তয় ত ধর কেনে, সাড়ে এগার সাড়ে
এগার ত এ্যাহেন বাজে, নিউজ হয়্যা গিছে সেই পনে এগারটায়।
হয়, পনে এগারডায়।
পনে এগারডায়? নিতাই জিজ্ঞাসা করে।
হয়, পনে এগারডায়।
তা হউক গ্যা, তর পনে এগারডাই হইল, তার সঙ্গে ছয় ঘণ্টা যোগ দেকয়ডা হয়? পনে এগারডা আর ছয় ঘণ্টা?
এ ধর কেনে এগারডা, হিশাবের সুবিধা তানে, গজেন বলে।
শালো, তোর সুবিধার লাইগ্যা ফ্লাড লেট কইরা আইসবে–জগদীশ ধমকে ওঠে।
হেই তালই, আপনি কথা কহেন তয়, আমি চুপ যাই–, নিতাই ঠাণ্ডা গলায় জগদীশকে বলে।
ভুইল্যা গিছিলাম ন্যাতাই, তুই ক, তুই ক, এই শালো গজেনটা সব উল্টাপাল্টা কথা কয়-
– নিতাই আবার গলা তোলে, শুনেন, যে হিশাবই করেন, এইখানে ফ্লাড কাইল সকাল চাইড়ডার আগে আইসব না–
নিতাইয়ের এই হিশাবের একটা বড় তাৎপর্য আছে। সকাল চারটে মানে তারা আজ রাত্রির জন্যে নিরাপদ। এমন কি সকাল চারটোতও যদি চর ছেড়ে ডাঙায় চলে যাওয়ার দরকার হয়, তা হলে দিনের আলো ফুটে যাবে। নিতাই সকলের হয়ে মুখ ফুটে সময়টা বলেছে। এখন সবাই সময়টা খতিয়ে দেখছে। রাবণ কিছুক্ষণ পরে বলে ওঠে, কহিল যে আসামের রেলগাড়ি বন্ধ করি দিসে। স্যালায় ত ফ্লাড শিবক–তক আসি গেইসে
রাবণের কথার জবাবে নিতাই, বা অন্য কেউ, কিছু বলে না। তারা সবাই সঙ্গে সঙ্গে আর-একটা হিশাব করতে থাকে। ফ্লাডের ওয়ার্নিং দেয়ার উৎস–পাহাড়ের ভেতর, কালিম্পঙের পথে তিস্তারাজার বলে একটি জায়গা। সেখান থেকে জলের হিশেব পেলে, সেই অনুযায়ী আন্দাজ করা যায়–তিস্তাবাজার থেকে হলদিবাড়ির কাশিয়াবাড়ি পর্যন্ত তিস্তার বুকের ওপর দিয়ে প্রায় ষাট মাইল পথ আসতে জলের কতক্ষণ সময় লাগবে। শিবক ব্রিজ পর্যন্ত নদী নামে পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে। তিস্তাবাজার থেকে শিবক পর্যন্ত যত তাড়াতাড়ি নামবে, শিবক থেকে জলপাইগুড়ি তার চাইতে বেশি সময় লাগে–এই জায়গাটাতে তিস্তা শুধু সমতল তা-ই নয়, তিস্তার সেই ভূখণ্ড শুরু–তার নানা খাত, নানা পথ।
নরেশ বলে, এ্যাহন ত তাও সৰ্গলে জাইগ্যা আছে, রাত আড়াই তিনডায় যদি চর ছাইড়্যার লাগে ত অন্ধেকের বেশি ভাইস্যা যাবে নে
.
০৯২.
আটষট্টির বন্যার স্মৃতি
নরেশ কথাটা যেন কাউকে শোনানোর জন্যে বলে না। কিন্তু এই বাতাসে তার স্বরে সেই নিভৃতি আর থাকে না, ভেঙে যায়। তার কথা শেষ হওয়ার পর তার কথার স্মৃতিতে সকলের মনে হতে থাকে, নরেশ যেন সবাইকে সাবধান করে দিচ্ছে। তারপরও, তাদের ওরকম চুপ করে থেকেই সেই সাবধান বাণীর অর্থ বুঝে নিতে হয়। সেই অন্ধকার শেষ রাতে জল চরে উঠতে শুরু করেছে। জলের সেই চেহারা দেখেই যে যার মত মুহূর্তে ঠিক করে ফেলবে-তখনই সব কিছু ফেলে পারের দিকে যেতে হবে। কেউ কারো সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে পারবে না–সবাই মিলে জলপাইগুড়ি শহরের পারের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কে পেছনে থাকল, কে পারল, কে পারল না, কে ভাসল, কে উঠল, সেসব হিশেব হবে পারে। ওঠার পর, খোঁজাখুঁজির পর, বাঁচার পর। একা-একা বাঁচার পর সবাই মিলে বাঁচা গেল কিনা সেই হিশাব হবে।
এখানে যারা আছে, তাদের প্রায় সবাই আটষট্টির বন্যায় তিস্তাকে দেখেছে। সবাই এখানেই ছিল, তা নয়। কিন্তু সকলেরই নিজের নিজের মত করে জানা আছে, কী করে বানভাসি মানুষের হিশেব বেরয়, কী ভাবে এক ধাক্কায় গোয়াল খালি হয়ে যায়, দিন পাঁচ-সাতের ভেতর ভরভরন্ত, ধানিজমি হাঁটুভর বালুয়ারি হয়ে যায় কী ভাবে। প্রত্যেকে একই পদ্ধতিতে হয়ত এই স্মৃতিচারণ করছিল না, কিন্তু সেই স্মৃতিই তাদের এই সব হিশেবনিকেশকে নিয়ন্ত্রণ করছিল। আগামী চার থেকে ছ ঘণ্টার হিশেবের সঙ্গে মিলে ছিল, প্রায় পনের-ষোল বছর আগের অভিজ্ঞতা।
কিন্তু পনের-ষোল বছর আগের অভিজ্ঞতা এখন এদের মধ্যে কতটা সক্রিয় থাকতে পারে। নিতাই-এর বয়স এখন কত হবে? ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ! তা হলে পনের বছর আগে তাকে থাকতে হয় পনের-বিশ বছরে। কিন্তু তখনই ত নিতাইকে দেখাত পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের। তা হলে, এখন কি নিতাইয়ের বয়স চল্লিশ হয়ে গেল? বা চল্লিশ পেরিয়ে গেল? জগদীশের বয়স কত? পনের-ষোল বছর আগেও জগদীশকে ত এখনকার মতই পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ লাগত। জগদীশের কি এখনই ষাট হল, না, তখনই তিরিশ ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তিস্তার ঐ চরে ঝঞ্জার ভেতরে বাতাসময় বৃষ্টিপাতে বিদ্ধ হতে হতে ঐ দঙ্গলবাধা মানুষগুলি এক অপরিবর্তিত ব্যক্তিগতে পৌঁছে গিয়েছিল। প্রত্যেকেই নিজের নিজের মত করে শেষ রাত্রির হিমেল জলের পাহাড়ভাঙা বন্যার ভেতর দিয়ে নিরাপত্তার খোঁজে সপরিবার ভাসছিল। সেই স্রোত হাতে কিছু রাখতে দেয় না। সেই স্রোতে শরীরের ভিতর থেকে শরীরটা বের করে আনে। সেই স্রোত শুধু অতলে টানে, শুধু অতলে। এখন সেই স্রোত রওনা হয়েছে ছ-ঘণ্টা দূরে, না চার-ঘণ্টা দূরে, কে জানে।
