নকু দাঁড়িয়ে পড়ে। জগদীশ চিৎকার করে ওঠে, কী কইল রেডিওতে?
এখন, এই চরে কুয়াশায় তিনটি দাঁড়ানো মূর্তি রাবণ, নকু আর জগদীশ। একটু দূরে সেই দলটা গোল হয়ে বসে–মাথা নিচু করে। নকুকে জগদীশ ডাকতেই সেই দলের দু-একজন দাঁড়িয়ে পড়ে। নকু জগদীশের দিকে ফিরে গলার সমস্ত জোর দিয়ে চিৎকার করে-লাল সিগন্যাল দিই দিসে, লাল সিগন্যালনকুর চিৎকার ঐ বাতাসে ছিঁড়ে যায় আর আওয়াজগুলো পুর্ব থেকে পশ্চিমে চলে যায়। আওয়াজগুলো এমন টুকরো-টুকরো হয়ে উড়ে যায় যে এরা ছাড়া অন্য কারো পক্ষে সেগুলোর ভেতর কোনো সংযোগ তৈরি করা অসম্ভব হত–সেগুলোকে বাতাসেরই শব্দ মনে হত।
তিন-তিনজন দাঁড়িয়ে থাকায় বাতাস তাদের ঘিরে আরো উত্তাল হয়ে উঠতে পারে। জগদীশ পেছন ঘুরে এই দলটির দিকে ফিরে আসতে শুরু করে। এতক্ষণ জগদীশ বাতাস ঠেলে এগতে পারছিল না আর এখন হঠাৎ বাতাসটা তাকে পেছন থেকে ধাক্কায় ধাক্কায় সামনে ঠেলে দেয়। তাতে তার শরীরটা কেমন হালকা লাগে। স্রোতের বিপক্ষে সাঁতার কেটে হঠাৎ স্রোতের মুখে গা ছেড়ে দেয়ার মত।
নকুর কথা ঐ দলটাকে মুহূর্তে ভেঙে দেয়। সবাই যেমন একসঙ্গে গোল হয়ে ঘাড় নিচু করে বৃষ্টি আর বাতাস থেকে বাচছিলনকুর চিৎকারে বাঁচার সেই চেষ্টাটা তুচ্ছ হয়ে যায়। সবাই দাঁড়িয়ে পড়েছে আর কেমন আগোছালো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। বাতাস এতক্ষণ এক রকম করে বইছিল, যেন জলের স্রোতের ঢালের মত, এরা যেন কোনোক্রমে সেই ঢালের নীচে মাথা বাঁচিয়ে বসে ছিল। আর, এখন ওরা দাঁড়াতেই বাতাস ওদের এতগুলো শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। তাতে বাতাসের আওয়াজ যেন হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে গেল। ঐ আওয়াজের মধ্যে ওরা খাবি খেতে লাগল।
এই দলের সবাই বাতাস ঠেলে নকু জগদীশ আর রাবণের দিকে এগতে চাইছিল। কিন্তু তার আগেই বাতাসের ঠেলায় ওরা এদের কাছে এসে পৌঁছে গেছে।
নকুই এই পুনর্গঠিত দলের ঠিক মাঝখানে পড়ে যায়, কহিল যে লাল সিগন্যাল দেয়্যা গেইল। সগায় রেডি থাকেন। ধাধছাড়, নদীর পারত যেইলা আছেন সায় ছাড়ি চলি যান, ছাড়ি চলি যান। যেইলা মানষিক এলায়ও যান নাই, স্যালার দায়ি সরকার না নিবেক। চরত যে মানষিলা আছেন স্যালায় এ্যানং এই রাতত ডাঙায় চলি যান, ডাঙায় চলি যান। পাহাড়ঠে বান নাবিবার শুরু করিছে, শিবক পাহাড়ের তলায় রেলের ব্রিজখান ভাঙি যাবার পারে-সেই তানে আসামের সব রেল ক্যানসেল, ক্যানসেল, ক্যানসেল নকুর দম ফুরিয়ে যায়। সে থামার পর তার কথার বাকি অংশ শেষ করে দিতেই যেন বাতাস হঠাৎ-গর্জনে মাটি থেকে আকাশে লাফ দিয়ে ওঠে। নকুর কথাটা যে এমন আচমকা শেষ হয়ে যাবে, সেটা কেউ বোঝে নি। তাই নকুর কথা শেষ হওয়ার পরও কেউ কোনো কথা বলতে পারে না। ঐ আকাশ জুড়ে বাতাস গর্জায়, গর্জে-গর্জে লাফায়।
নরেশ ব্রিজের দিকে মুখ করে বলে–সিগন্যাল আগেই আইসছে, ব্রিজের বাতি সারা রাত্রি জ্বালাইয়া রাইখচে
নিতাই বলে ওঠে, এই ব্রিজের তানে কিছু কইল?
নকু আবার পুরনো স্বরেই চিৎকার করে বলে, এই ব্রিজের তানে কিছু না কইসে, চরুয়া মানষি ডাঙায় যাও, ডাঙায় যাও, কায়ও নদীর কিনারাত থাকিবেন না, কায়ও থাকিবেন না
গজেন জিজ্ঞাসা করে, বান পাহাড়ত নামিবে কইসে, নাকি নামা ধরিসে, নকু? যেন নকু প্রাসঙ্গিক পাহাড় থেকে এইমাত্র নেমে এল, এরা তার কাছ থেকে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ জেনে নিচ্ছে। কথাটার জবাব নকু চট করে দিতে পারে না। সে বাতাসের গর্জনের মধ্যে এক নিজস্ব নীরবতায় মনে আনবার চেষ্টা করে, এই একটু আগে রেডিওতে যা শুনেছে তার যথাযথ ভাষা।
মনত খায়নামা ধরিসেই বলিছে। নামা ধরিসে, শিবক পাহাড়ের রেল ব্রিজ বন্ধ করি দিয়া হইসে, হয়, হয়, নামা ধরিসে বলিছে, নামা ধরিসে, নামা ধরিসে। নকু পুনরাবৃত্তিতে নিজের কথার সত্য নিজেই পরীক্ষা করে যায়।
রাবণ উঁচু থেকে নীচে জিজ্ঞাসা করে, রাতত কি আবার নিউজ দিবা ধরিবে?
না দিবে। কহি দিছে–এইখানই শেষ নিউজ, এর বাদে আর কুনো নিউজ নাই, আর কহিসে সাইরেন বাজি দেয়া হইসে–
সাইরেন? বাজি দেয়া হইসে? শুনো নাই রো? কায় শুনিছেন? গজেন বলে ওঠে।
জগদীশ ধমকে ওঠে, চুপ যা বলদের দল, বাতাস কী সাইরেন বাজায়, শুনিস নাই? তর বিয়ার বাদে সানাই বাজাবার ধইরবে, শালো, নিজের আওয়াজ নিজে শোনন যায় না, সাইরেন শুনব? করবা কী তাড়াতাড়ি কও, তাড়াতাড়ি কও, জগদীশ চুপ করে গিয়ে আবার হঠাৎ কথা বলে ওঠে, হে-ই নকু, নকু, নকু কই রে? জগদীশ ছানিকা চোখ এলোমেলো বোলায়।
কহেন না, এইঠে আছি।
তর জেঠি রেডিওটা খুইল্যা রাইখল ত? বন্ধ কইর্যা থোয় নাই ত?
কহেন কী? এ্যালায় জেঠি গান শুনিবার বইসবে নাকি?
চুপ যা শুয়ার। যদি আবার নিউজ দ্যায়।
জয়হিন্দ কয়্যা দিছে, আবার নিউজ দেবে?
জয়হিন্দ কয়্যা দিছে? তা হইলে, কী, হইব ডা কী, এই ন্যাতাই কেউ জবাব দেয় না।
জগদীশ আবার হাঁকড়ে ওঠে, এই ন্যাতাই, ন্যাতাই নাই এইখানে।
নিতাই ধমকে ওঠে, আরে, চুপ যান তো দেখি, শুধু চিল্লাবার ধরেন। এই নরেশ, বাজে কয়ডা রে দেখ ত?
নরেশের টর্চের আলোয় এতগুলো লোকের শরীরের ওপর সময় ঝলকে ওঠে
এগারোটা বাইশ।
হে-এ, এককেরে বাইশ, শাপলা আকাশবাণী শিলিগুড়ির টাইম দিবার ধরসে, গজেন বলে।
