থাকতে পারে না, কিন্তু আবার একরকমভাবে থাকেও বটে। সবার আর্থিক ক্ষমতা সমান না, সব বাড়িতে কাজের লোক সমান না। কখনো কখনো অনেককেই টাকার ধার করতে হয়। কাউকে কম সময়ের জন্যে, কাউকে বেশি সময়ে জন্যে। সে সময় টাকার ধার দেয়ার দেউনিয়া দরকার হয়। চরে এসমস্ত ধার অনেকটা নগদ টাকায়, শোধ হয়। যার নিজেরও টাকার ক্ষমতা আছে, সে টাকা দিয়ে সুদসহ ধার শোধ করে। কিন্তু এর মধ্যে কারো কারো আবার ফসলে শোধ করলে সুবিধে হয় বেশি। তার হয়ত টাকার জোর কম। তখন, যেমন জোতদারিতে, তেমনি চরেও, যখন শোধ করা হচ্ছে তখনকার শস্তা দরে না, যখন ধার দেয়া হয়েছিল তখনকার আক্ৰা দরে ঋণ শোধ করতে হয়। কিছু কিছু জমিতে কৃষক আর নিজে চাষ করে কুলোতে পারে না–সেখানে তারা কিছু-কিছু জমিতে কাজের জন্যে লোক রাখে। তেমন লোক সহজেই পাওয়া যায়-রাজবংশীরা এসে হালের সময়, বোয়া গাড়ার সময়, ধানকাটার সময় কাজ করে দেয়। সাধারণভাবে চরের অর্থনীতিতে আধিয়ারি চলে না। কিন্তু মজুরি জমা রেখে-রেখে ফলনের ভাগে মজুরি নিয়ে রোয়াও চালু আছে। এতে যেন রাজবংশী হালুয়ার অন্তত আধিয়ারির মর্যাদাটুকু জোটে।
এই চরগুলোতে একটা অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চালু আছে–উৎপাদনের ভূমিকা থেকে তৈরি গণতন্ত্র। রাজবংশীরা কোনোদিন দলবদ্ধভাবে চরে বসতি গাড়ে নিতাই নমশূদ্রেরা চরকে বাসযোগ্য করে তোলার পর রাজবংশীরা সেখানে নিজেদের অধিকার দাবিও করে নি, সে নিয়ে কোনো ঝামেলাও হয় নি। বরং, যাকে বলা হয় কায়েম এলাকা, অর্থাৎ সরকার যে-জমি সেটেলমেন্ট মারফৎ জরিপ করতে পারে সেই আইনি জমিতে নমশূদ্ররা যেখানে বসতি গেড়েছে, সেখানে কোনো-কোনো সময় পুরনো রাজবংশী বসতির সঙ্গে দাঙ্গাহাঙ্গামা ঘটেছে। এরকম সবচেয়ে খারাপ ঘটনা ঘটেছিল বছর চোদ্দ-পনের আগে তিস্তাপারের ক্রান্তি থানার ঝাড়মাঝগ্রাম এলাকায়। সেখানে আগুন লাগানো, আগুনে পুড়িয়ে মারা, কুপিয়ে কাটা–এ সবই ঘটেছিল। কিন্তু চরে এখনো এরকম কোনো ঘটনা ঘটে নি, সাম্প্রদায়িক হুজ্জতহাঙ্গামার কোনো ঘটনাই নয়! আর প্রথম দিকে যদিবা বলা যেত যে নমশূদ্রেরা চরে নিজেদের লোক ছাড়া কাউকে বসতে দেয় না–তেমন কে-ই বা বসতে চেয়েছে–কিন্তু পরে, যখন চর বাসযোগ্য ও কর্ষণযোগ্য জায়গা হিশেবে সাধারণ ভাবে স্বীকৃত হয়ে গেল, তখন, প্রধানত মনশূদ্ররা হলেও, রাজবংশীদেরও বেশ কিছু অংশ একসঙ্গে চরে এসে বসতি গাড়ে, আবাদ করে।
ব্যাপারটা তখন এরকম দাঁড়িয়েছে যে, চরে নমশূদ্রেরাই যাবে তা নয়, চর যখন আছে, তখন সবাই মিলেই সেখানে যাওয়া যাক। এরকম একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিশেষত, তিস্তার দুই পারেই ত রাজবংশী জনবসতি আছে। তাদের সেই সব গ্রামবন্দরের ভেতর দিয়েই চরের মানুষজনকে যাতায়াত করতে হয়। এক ধরনের চেনাজানা, তার ফলে হয়েই যায়। স্বাধীনতার পরেই সেই প্রথম ধাক্কায় যা হওয়ার হয়েছে, কিন্তু তার পরে তিস্তার চরগুলিতে নমশূদ্র ও রাজবংশীদের মিশ্র জনবসতি তৈরি হয়েছে। তাতে হয়ত বেশির ভাগ জায়গাতেই নমশূদ্রদের প্রাধান্য, কিন্তু কোনো-কোনো জায়গায় রাজবংশীরাও সংখ্যাগুরু।
সামাজিক দিক থেকে, অন্তত সমাজের বাইরে দিক থেকে, বা, বলা ভাল, এই সমস্ত চরের জনসংগঠনের দিক থেকে নমশূদ্র ও রাজবংশীদের মিলিত জীবনযাপনই প্রধান, সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর প্রশ্নটা সেখানে অবান্তর। জগদীশ বারুই-এর মত নমশূদ্র মহাজন এক-এক চরে নিশ্চয়ই আছে কিন্তু চরের কৃষকও আর পুরুষাক্রমিক খাতক নয়, সুতরাং সে বারুইয়ের ধার ধারতে পারে কিন্তু ভাত ধারে না। জনসংগঠনের এই গণতন্ত্র থেকেই বোধহয় চরের কৃষকদের ভাষাতেও পূর্ববঙ্গের আর রাজবংশী ভাষার একটা মিশ্রণ ঘটেছে। অন্ধকারে ভাষা শুনে বোঝা মুশকিল ভিড়টার প্রধান অংশ–ভাটিয়া না দেশিয়া। এই যেমন জগদীশ বারুই যে-ভাষায় খিস্তি করে উঠে যায়, রাবণ রায়বর্মন তাকে সেই ভাষাতেই প্রায় বুঝিয়েসুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে যায়।
.
০৯১.
ফ্লাড আসতে কতক্ষণ–চার ঘণ্টা না ছয় ঘণ্টা
কিন্তু এবাতাস ঠেলে জগদীশও এগতে পারে না, রাবণও জগদীশের কাছে পৌঁছতে পারে না। এরা এখানে প্রায় গোল হয়ে বাতাসের ঝাপটায় শাণিত বৃষ্টির তীর পিঠে-ঘাড়ে-মাথায় নিতে নিতে দেখে, তাদের এখান থেকে উঠে গিয়েও জগদীশ বা রাবণ কোথাও যেতে পারছে না।
বৃষ্টিভরা বাতাসের কুয়াশার ভেতরে ওদিক থেকে বাতাসের অনুকূলতায় কু ক্রমেই ছুটে কাছে আসে। সে জগদীশকে এরকম দলছুট একাকী দেখবে, ভাবে নি। ভাবে নি বলেই যেন জগদীশকে দেখেও না দেখেই ছুটে আসে। জগদীশ নকুকে চিনতে পারে না। কিন্তু তার যেন মনে হয় বিপরীত দিক থেকে জমাট কুয়াশা নড়ে চড়ে এদিকে আসছে। এখন ওদিক থেকে এক নকুই আসবে। কিন্তু সেটা, তার কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও কুয়াশার আরো ভেতরে চলে যায় দেখে জগদীশ চিৎকার করে ডেকে ওঠে,হে-এ নকু। সেই চিৎকারে আহ্বানের সঙ্গে ধমকও ছিল, বা হয়ত ওটাই জগদীশের স্বরের পাকা ভঙ্গি–সে কথা বললেই একটু জোরে বলে ফেলে। কিন্তু জোরটা এখানে তার স্বভাবের চাইতে অনেক বেশিই ছিল-নইলে এই বাতাসে সে-আওয়াজ রাবণের কাছে ও তারও পেছনে ঐ দলের কাছে অমন হুমড়ি খেয়ে পড়ত না-হে-এ নকু।
