ঠিক যেন পুঁজিপুথি মেনেই, ১৯৫০ সালে তিস্তায় যেবন্যা এল, তার সঙ্গে জানা ইতিহাসের কোনো কথার তুলনাই চলে না। তিস্তার চরটর কোথায় উড়ে গেল। পারের ফরেস্টকে-ফরেস্ট, স্রোতের সঙ্গে উধাও হয়ে গেল। সেই প্রথম জলপাইগুড়ি শহরের ভেতরে তিস্তার জল ঢুকল।
এখন যদি তিস্তার চরের এই জনবসতির কথা ভেবে বিচার করা যায়, তা হলে, মনে হয়, ১৯৫০ সালের ঐ বন্যাটা হয়ে সব দিক থেকেই ভাল হয়েছে।
তখনো সব চরে ত বসতি হয়নি। সবে মউয়ামারির চরে কিছুটা জায়গা হাসিল করে বসবাস শুরু হয়েছে, চাষআবাদও একটু-আধটু হচ্ছে। ঠিক সেই সময়েই সেখানকার, ঐ মউয়ামারির নমশূদ্রেরা, বুঝে নিতে পারল তিস্তার অনিশ্চয়তাটা আসলে কী রকম অনিশ্চয়তা। জল যে এমন আচমকা এসে যায়, তাও আবার এরকম বেগে, তা এরা ভাবতেও পারে নি। নৌকো ছিল একটা মাত্র। ওস্তাদ মাঝির অভ্যস্ত হাল নৌকোর টাল সামলাতে পারে বটে কিন্তু জলের তলায় বিরাট-বিরাট পাথরের চাঙরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে যে-নৌকোর তলা খসে যেতে পারে–সেটা জানা ছিল না। বন্যা নেমে গেলে ঐ চরেই আবার ঘর ভোলার ও আবাদের কাজ শুরু হল।
আর সেই প্রথম তিস্তাকে একটু সামলাবার ব্যবস্থা হল। সব দিক খোলা তিস্তা বর্ষাকালে শেবক পাহাড়ের তলা থেকে হলদিবাড়ি-মেখলিগঞ্জ পর্যন্ত ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। যেখান দিয়ে খুশি বয়ে যেত। পঞ্চাশ সালের বন্যার পর শহর ঘিরে বাধ হল। তারপর তিস্তার দুই পারেই বাধ বেড়ে যেতে লাগল। লম্বা হতে-হতে সেই ওদলাবাড়ি থেকে কাশিয়াবাড়ি পর্যন্ত তিস্তার দুই পারই বাধে বাধা হয়ে গেল।
এরই ভেতর তিস্তার ওপর দিয়ে দুটো ব্রিজ তৈরি হল, একটা রোড ব্রিজ, আর একটা রেল ব্রিজ। ১৯৬৮ সালে তিস্তার বন্যা এই ব্রিজের পাশের বাধ ভেঙে শহরে ঢুকল। তার আগে ওদলাবাড়ির বন উপড়েছে, ন্যাওড়া আর ধরলার মাঝখানের ত্রিভুজটাকে মাটি থেকে খুবলে নিয়েছে, মউয়ামারির চর থেকে বোয়ালমারির চর পর্যন্ত সমস্ত জায়গায় তিস্তা তার পুরনো খাত বানে ভাসিয়ে দিয়েছে। ১৯৬৮ বন্যা কেন হয়েছে তার কারণ নিয়ে বহুবিধ মত আছে। মতের বৈচিত্র্য নির্ভর করে বন্যার সঙ্গে জড়িত সরকারি বিভাগের সংখ্যার ওপরে। তাতে অন্তত এটা প্রমাণিত হয়ে যায়, প্রত্যেক বিভাগেরই বন্যা বানাবার মত যথেষ্ট কারণ ছিল। এখানে ১৯৬৮র বন্যা আলোচ্য নয়। আলোচ্য তিস্তা ১৯৬৮ বন্যাতে এরকম প্রমাণ আবার পাওয়া গেল যে তিস্তা, বাধ বাধার ফলে, আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এটাও সত্যি যে বাহান্ন থেকে আটষট্টি ত ষোল বছর। এই সোল বছরে তিস্তার বন্যা ত অনেকটাই সামলানো গেছে। ৫০-এর পর ওরকম, বা ওর চাইতে বেশি বন্যার জন্যেও ৬৮ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। ৬৮র পর নিশ্চয়ই আরো বিশ বছর কাটার আগেই তিস্তা সম্পর্কে আরো বৈজ্ঞানিক ও সংগঠিত ব্যবস্থা নেয়া যাবে। ইতিমধ্যেই তিস্তা ব্যারেজের কাজ প্রথম দফা শেষ হয়ে গেছে। যদিও এখনো অতটা নিশ্চিত করে বলা যায় না, এবং এখনো বন্যার ভয় সব সময়ই আছে, তবু তিস্তার জল যাতে পাহাড় থেকে আচমকা নেমে সমতল ভাসিয়ে দিতে না পারে তার জন্যে তিস্তার মাঝামাঝি ত ব্যারেজ বাধা হয়েছে।
তিস্তার চরে যে স্থায়ীভাবে বসবাস করা যায়, চাষ-আবাদ করা যায়,সেটা পঞ্চাশ সালে প্রমাণিত ছিল না। উদ্বাস্তু নমশূদ্রেরা তখন তিস্তার চরে সবে আশ্রয় নিয়েছে। একটা বন্যা তাদের উৎখাত করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। এমনকি বাহান্ন ও চুয়ান্ন সালের বন্যাতেও তারা মরে-ভেসে আবার চরে ফিরে এল। যদিও তখনো তারা চরে শিকড় গাড়ে নি।
কিন্তু ৬৮ সালের বন্যায় চরের মাটিসুষ্ঠু উপড়ে গেলেও, চরের মানুষদের চরে ফিরে আসা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। কারণ ততদিনে, প্রায় দুই দশকে তিস্তার চর, মউয়ামারি থেকে কাশিয়াবাড়ি পর্যন্ত বসতি হিশেবে প্রায় পাকাপাকি গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে চরের কৃষকদের নিয়ে কো-অপারেটিভের চুরিজোচ্চুরি যেমন হয়েছে, তেমনি, চরের কৃষকের স্বাধীন উদ্যোগে, সরকারি সাহায্যহীন স্বাধীন উদ্যোগে, ধান ও তরকারির ফলনে জেলার কৃষি-অর্থনীতি ও বিপণনের চেহারা বদলে গেছে। ৬৮র বন্যার সময়, চরের কৃষক জলপাইগুড়ির জনবসতির একটা প্রধান অংশ, চরের ফসল ও ফলন আর্থিক জীবনের অপরিহার্য ভাগ।
তাই ৬৮র বন্যার পর চরের মানুষদের আবার চরে ফিরে আসা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। বন্যায় তিস্তার ভূখণ্ড পাল্টে গিয়েছিল। বন্যার পর সেই পরিবর্তিত ভূখণ্ডে এরাও নিজেদের মত করে আবার নিজেদের পুনর্বিন্যাস করে নিয়েছে। তাতে হয়ত দেখা যাবে, কোনো চর আর নেই, আবার নতুন চর দেখা দিয়েছে। তাতে হয়ত দেখা যাবে, তিস্তার সীমার মধ্যে তিস্তা নিজেকে যেমন বদলেছে, এই কৃষকরাও নিজেদের সেরকম বদলে নিয়েছে। কিন্তু ৬৮র বন্যাতেও তিস্তার ভেতর থেকে যাদের উচ্ছেদ করা যায় নি, তারা আর উচ্ছেদ হবার নয়। ৬৮-র বন্যাই যেন তিস্তার চরকে ও সেই চরের কৃষকদের প্রধান ভূভাগের অংশ করে দিল।
দেশ ভাগ হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু নমশূদ্র চাষী, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এ-নদীকে এক রকম করে জিতে নিল। ভূগোলের ওপর ইতিহাসের জয় ঘটল।
.
০৯০.
চরের ভেতরে চরুয়া
তিস্তার এই চর প্রধানত পূর্ববঙ্গের নমশূদ্র কৃষকরাই হাসিল করেছে, আবাদ করেছে। সরকারি আইন অনুযায়ী চরের জমির ওপর সাধারণ আইনকানুন খাটে না। কারণ নদীর চরকে, এরকম অনিশ্চিত চরকে, জনবসতির জায়গা হিশেবে সরকার মেতে নিতে পারে না। তাতে অবিশ্যি কোনো অধিকার থেকে এরা বঞ্চিত হয় নি। প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছে, এবার এমন-কি পঞ্চায়েতে সদস্যও পাঠিয়েছে। সরকারি আইন থেকে আইনই মুক্ত থাকার ফলে চরে প্রায় সবাই জোতদার, কেউই শুধু হালুয়া নয়। বা এই কথাটাই উল্টে বলা যায়, চরে সবাইই হালুয়া কেউই কেবল জোতদার না। জমির মালিকানা থেকে জমির ওপর, চাষের ওপর, ফসলের ওপর সমস্ত পুরুষানুক্রমিক ও আইনমাফিক স্বত্ব তৈরি হয়, চরে ত আর তেমন কোনো স্বত্বভোগের সুযোগ নেই। সুতরাং দেউনিয়া-জোতদারির কোনো ব্যাপার চরে যেন থাকতে পারে না।
