এখন, এই বর্ষার ছ-মাস তিস্তার ভেতরে-নদীগুলোর যোগবিয়োগ ঘটে চলেছে তীব্র অথচ অনিশ্চিত এক বেগে। জলের তলে তিস্তা-ভূখণ্ডের ভেতরেও সেই গতি সঞ্চারিত হয়ে গেছেনাটকীয় ঘনঘটায়, কিন্তু এমনই দ্রুততায় যেখানে কোনো নাটকীয় পরিকল্পনা নেই।
.
০৮৯.
ভূগোলের ভেতরে ইতিহাস
ওপরে, সেই মালবাজার-ওদলাবাড়ির কাছে মউয়ামারির চর থেকে শুরু করে নীচে হলদিবাড়ির কাশিয়াবাড়ি পর্যন্ত তিস্তার, মানে, তিস্তা বলতে যে-ভূখণ্ড বোঝায়, তার, একেবারে মাঝখানে, লোকবসতি তৈরি হয়ে আসছে অনেক দিন হল। কিন্তু সে অনেক দিনেরও একটা ইতিহাস আছে।
রাজবংশীরা তিস্তার চরে সাধারণত বসতি গাড়ত না, গাড়ে নি। তারা বরং যেন বেশি অভ্যস্ত ছিল তিস্তার পারে–জঙ্গলের মধ্যে। সেই জঙ্গল তাদের খেতিজমি দিত, দরকারী সার দিত, ঘর তুলবার ডালপাতা দিত।
নদীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল নদীর স্বভাবের মতই যখন যেমন, তখন তেমন। যে-নদী এমন ঘন-ঘন বদলায়, যে-নদী, নদী হিশেবে চিনতে-চিনতেই, ডাঙা হয়ে যায় আর ডাঙা, নদীর ভেতর চলে যায়, সে নদীকে নদীর জায়গা ছেড়ে দিয়ে রাজবংশীরা বনান্তরাল থেকে নদীকে ব্যবহার করত। ব্যবহার বলতে যে শোষণও বোঝায়, তেমন ব্যবহার নয়। এ যেন এই নিসর্গের মতই ব্যবহার–জলপাইগুড়ির এই নিসর্গ, যেখানে গহনতম ফরেস্ট নদীর জলপ্রান্তরকে আড়াল দিয়ে রাখে, যেখানে পাহাড়ের ঘের সেই ফরেস্টকে ঘিরে রাখে। যেন মনে হয়, এ নিসর্গকে দেখাতে পারে, পাহাড়বননদী দিয়ে ঘেরা, পাহাড়বন-নদী দিয়েই তৈরি এক রক্ষিত নিসর্গের মত। দেখাতে পারে এমন যে ঘিরে রাখা পাহাড় থেকে ধাপে-ধাপে নেমে এসেছে এই নদী বন-পাহাড়, যেন, এখানে এই ঘেরের মধ্যেই থাকবে বলে। এ ত মানসসরোবর নয়। এখানে, এই সীমার দক্ষিণে কোনো পাহাড় নেই, তিস্তা সেই মুক্তিতেই মিশে গেছে। কিন্তু তিন দিকে ত আছে। সেই তিন দিক ঘেরা এই দেশে পাহাড়বন-নদীর যে-সহাবস্থান ভূগোলের কারণেই ইতিহাস হয়ে উঠেছে, রাজবংশীরাও এই নদীর সঙ্গে সেই সহাবস্থানের নীতিতেই চলে আসে। সেখানে কোনো আক্রমণ নেই, কোনো দ্বিতীয় পক্ষ নেই, কোনো সংঘাত নেই। সেই অর্থে, রাজবংশীদের সঙ্গে তিস্তার সম্পর্কই নেই কোনো। কারণ, সম্পর্ক বলতেই ত দুইটি আলাদা জিনিশের ভেতরকার এক সংযোগকে বোঝায়। রাজবংশী সমাজ আর তিস্তা ত দুটো আলাদা জিনিশই নয় যে সেখানে আবার একটা সংযোগের দরকার হবে।
সেই সংযোগের দরকার হল, যখন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভাটিয়ারা এখানে এত বেশি সংখ্যায় আসতে লাগল যে, জনসংখ্যার পুরনো অনুপাত আর টিকল না। এই ভাটিয়াদের মধ্যে যারা আরো ভাটিয়া, তারা এল যেন গায়ে পদ্মা-মেঘনা এইসব জায়গার জলের গন্ধ নিয়ে। তাদের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক হচ্ছে আক্রমণের, সংঘাতের, জয়পরাজয়ের, দখলবেদখলের। এই নদীকে তারা চেনে না। তারা যে-নদীকে চেনে তার তল দেখা যায় না, আর এই নদী যেন তার তলদেশের রঙিন পাথরগুলোকে ঢেকে রাখার জন্যেই বয়ে চলেছে। তারা যে-নদীকে চেনে, তার জলের রং কাল, মাটির রং কাল। আর এ, নদীর জল রোদের মত ঝলকায়, বড় জোর কাদামাটিগোলা। তারা যে-নদীকে চেনে তার চৌহদ্দি অত্যন্ত চিহ্নিত ও সেই চৌহদ্দির মধ্যে মানুষের সঙ্গে নদীর মরণবাচন লড়াই। আর, এ নদীর কোনো চৌহদ্দিই নেইকখনো গাছের মাথায় চড়ে, কখনো গাছ নদীতে মাথা ডুবিয়ে স্নান করে। কিন্তু যত পার্থক্যই থাক-নদী ত নদীই। আর, তারাও, এত উত্তরে এসেও, ঐ নদীর ভেতরে, ঐ অচেনা নদীর ভেতরেই, নিজেদের অভ্যস্ত জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ খুঁজে পায়। জলে, জলের চেনা গন্ধ পায়।
পুব বাংলায় নমশূদ্রেরাই প্রধানত তিস্তার চরগুলোতে প্রথম বসতি গাড়ে। দলবদ্ধ ভাবে বসতি হিশাবে। এর আগে, তিস্তার চরের ভামনি বনের ভেতর বাঁশ পুঁতে সেই বাঁশের মাথায় ঘর তুলে যে দু-চারজন কখনো কখনো থাকত, তারা কখনো বসতি গড়ে নি, বসতি গড়ার মত করে থাকেও নি। কিন্তু নমশূদ্ররা এই চরগুলোতেই আবিষ্কার করল সেই জমি, যার দখলের জন্যে তাদের কারো সঙ্গে দাঙ্গাহাঙ্গামা করতে হবে না। চরের জমি তারা চেনে–নিজেদের পছন্দমত জমি তারা বেছে নিতে পারল। তারপর ভামনি বন কেটে নিজেদের বসতের জমি আর আবাদের জমি দুইই তৈরি করতে লাগল। তারা রাজবংশীদের মত বাঁশের মাথায় ঘর বানাল না–ভিটে গাড়ল, দাওয়া বানাল, তারপর তিস্তার চরের ছন দিয়ে আর পারের ফরেস্ট থেকে বাশ এনে ভাটিয়া বাংলার মতই চারচালা ঝর তুলল। তিস্তার চরে এত ভামনি আর তিস্তার পারে এত বাশ, যেন এই রকমের ঘরবাড়ি একমাত্র এখানেই হওয়া সম্ভব। নমশূদ্রেরা এক সৈন্যবাহিনীর মত স্বয়ংসম্পূর্ণতায় এমন ভাবে এই চরগুলির দখল নিল–ওপরে মউয়ামারি থেকে তলায় কাশিয়াবাড়ি পর্যন্ত তিস্তার একেবারে মাঝ বরাবর এই চরগুলির দখল এমনভাবে নিল, যেন, তারা বরাবর এখানেই থেকেছে, সৈন্যবাহিনীর কাছে যেমন কোনো জায়গাই বিদেশ না, যুদ্ধ না করলেও ত একটা সৈন্যবাহিনী একটা অজানা-অচেনা জায়গায় তাদের প্রতিদিনের রুটিনে বাধা থাকে।
ভয় নিশ্চয়ই ছিল–তিস্তার ভয়। কিন্তু সেখানেও আশ্বাস ছিল আবার নতুন বসতি ও আবাদ গড়ে তোলার, কোথাও-না-কোথাও ত ডাঙা জাগবেই, সব ত আর ভেসে যেতে পারে না। আর, তখন, সেই মুহূর্তে যে-কোনো একটি জায়গায় খুঁটি গেড়ে বসাটাই ছিল প্রধান দুশ্চিন্তা। তিস্তার মত নদীর স্বভাবকে ভয় করে চরে না-যাওয়ার চাইতেও প্রবলতর ছিল, সেই ভয়ঙ্কর স্বভাবের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও, একটা কোথাও ঘর তৈরি করা ও আবাদ বানানোর প্রয়োজন।
