বছরে ছ-মাস প্রায় এই ভূখণ্ডজোড়া অনেক নদীর পারস্পরিক যোগবিয়োগ ঘটতে থাকে।
কোনো নদী, বা সোঁতা, তার বহুদিনের খাত থেকে উঠে আসে, যেন মাটির সঙ্গে লেপটে থাকা হাতি হঠাৎ তার গুঁড়টা প্রথমে আকাশে নাচিয়ে, তারপর দুই-তিন ধাক্কায় এক ঘূর্ণিঝড় তুলে, জেগে উঠল, আর নিজের এতক্ষণের ঘুমের ক্ষতি পোষাতে, যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই, খানিকটা ছুটে, আবার ফিরে আসে, তার পায়ের চাপে ধুলোর ঝড় ওঠে, তার গা থেকে ধুলোর ঝড় ঝরে, তার শুড়ের ঝাঁপটে শুকনো ঝড় মাটি থেকে আকাশে লাফিয়ে ওঠে হঠাৎ। তারপর, এমন হতে পারে, সে আবার তার পুরনো খাতেই ফিরে যাবে, অভ্যস্ত পুরনো খাতে। আবার, এমনও হতে পারে, ছুটতে ছুটতে খেলতে-খেলতে ঘুরতে-ঘুরতে, নিজের তৈরি ধুলোর ঝড়ে তার নিজেরই চোখে আঁধি লাগে। সে আর তার পুরনো খাত চিনে নিতে পারে না।
কোনো নদী, বা সোঁতা, তার মূল ধারা থেকে ছিটকে চলে যায়, একটা বড় হাতির পাল বা চলমান মহিষ বাথান থেকে যেমন কোনো বাছুর একটু বেশি স্বাধীনতায় এদিক-ওদিক করতে করতে দলছুট হয়ে পড়ে। দলছুট হওয়ার প্রথম আনন্দে সে যেন তার স্বাধীনতার স্বাদ পেতে থাকে চারপাশের আকাশবাতাস থেকে। মাটি কত রকম, কোন মাটিতে কী ভাবে হাঁটতে হয় সেসবও দলের কাছ থেকে যার শিখে নেয়া হয় নি, সে তার নিজের গায়ে-গায়ে মাটি চিনে নেই, ছোট্ট শুড় বা লালচে নাক তুলে বাতাস থেকে অজানা সব ঘ্রাণ নিতে শেখে। যেন সে জানেই, এরকম ভাবে আবার পালে বা বাথানে ফিরে যাওয়া যায়। কিন্তু তারপর সেই তরুণ হাতি বা মহিষ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে অদৃঢ় ঘাড় একবার পেছনে ফেরায়। তখনো সে ঘাড়ে, অতিক্রান্ত পথ দেখার অভিজ্ঞতার দাগ পড়ে নি। তখনো সেই খাটো গুঁড়ে নিজের অতিবাহিত বাতাস শোকার টান পড়ে নি। একবার, একবার শুধু নিজের লুপ্ত পদচিহ্নের জন্যে তীব্র করুণ ডাক দেয়। তারপর প্রতিধ্বনিকে প্রত্যুত্তর ভেবে পালে বা বাথানে ফিরে যাওয়ার জন্যে ভয়ের তাড়নায় ছোটে। সেই তরুণ পশু তখনো ধ্বনি-প্রতিধ্বনির নিয়ম শেখে নি। সে-নদী, বা সোঁতা চিরকালের জন্যে তার মূল খাত থেকে ছিন্ন হয়ে যায়, প্রত্যাবর্তনের সব পথ মুছে দিয়ে।
বা, তখনো পর্যন্ত নদীর মূল ধারা অবিচ্ছিন্ন গতিতে তার বিরাট বিস্তার নিয়ে প্রাকৃতিক নিয়মে বয়ে চলে, কোথাও কিছু ফেলে যায়–যেমন তার স্বভাব, যেন, হাতির একটা বিরাট পাল, বা মহিষেরই কোনো বিপুল বাথান। এ ত সেই পালের বা বাথানের নিয়মিত ঘোরাফেরা, চেনাজানা জায়গায়, নিজেদেরই অভ্যস্ত পায়ের ছাপ ধরেধরে, নিজেদেরই অভ্যস্ত গাছ-লতা পাতার গন্ধ শুঁকতে-শুঁকতে, নিজেদের ওপড়ানো বা ঘোড়া, গাছ বা মাটি, আরো ভেঙে ও খুঁড়ে, একটু বেশি রকম অসতর্ক। অভ্যস্ততায়। কিন্তু হঠাৎ কোথায় যূথপতির কান দুটো খাড়া হয়ে ওঠে, আকাশে গাছের মত উঠে যায় বিশাল মাথা, কিংবা হাতদুটো যেন বাতাস খুঁড়বে এমন শাণিত প্রস্তুতি নেয়, গুঁড়টা তখনো এক অনিশ্চয়তায় মাটির ওপর দোলে আর সেই দোলনের রেখা ধরে মাটির ওপরে নিশ্বাস পড়ে, ঘাস দোলে, কুটো ওড়ে, বা নাকের গরম নিশ্বাসে সামনে থেকে পোকামাকড় উড়ে যায়, ধীরে-ধীরে সেই শুড়ের দোলা বাড়তে থাকে, ডান দিকের পা দুটো একটু-একটু এগিয়ে থাকে, ঐ বিশাল মহীরুহের মত শরীরের ঢালে এক তীব্রতা আসে, তারপর হঠাৎ সেই যূথপতি শুড় বাতাসে তুলে এক চণ্ড বৃংহতিতে বন কাঁপিয়ে, বা শিং বাতাসে তুলে আর্ত আহ্বানকে প্রতিধ্বনিময় করে নিজের কান দুট্টোকে দু পাশে মেলে ধরে ছুটে চলে, এই বৃদ্ধের শ্রুতিতে কানে এসে পৌঁছেছে কোন সন্ততির পথ-হারানো সঙ্কেত, মুহূর্তে পুরো বাথান বা দল তৈরি হয়ে যায়, আকাশে মাঝে-মাঝেই সমবেত আহ্বানের সঙ্কেত তুলে-তুলে সেই হারানো বাছুরের খোঁজে এই পুরো পাল বা বাথান ছুটে চলে–সংক্ষিপ্ততম পথে, পথের মাঝখানে যত লতাপাতা, গাছগাছড়া, সব কিছুকে মুহূর্তে ধুলিসাৎ করে, ফলে সারা বাতাসে পিষ্ট পাতার গন্ধ মেশাতে-মেশাতে। সেই পাল, বা বাথান তার সন্ততিকে হয়ত আর কখনোই ফিরে পায় না, কিন্তু তার খোঁজে সে তার চারণভূমিই বদলে ফেলেছে, সেই পাল বা বাথান আর পুরনো জায়গায় ফিরে যায় না।
কিন্তু শুধু নদীই খাত বদলায়, তা ত নয়, ভূখণ্ডই বদলে যায় বছরের ছ মাস জুড়ে। আর তাতে ত নদীও বদলায়, নদীরা বদলায়। অদৃশ্য জলতলে কোথায় বালুবাড়ির ওপর থকথকে পলি পড়ে যায়, একেবারে সাত-আট ইঞ্চি পুরু–এক শীতের রোদে শক্ত হয়ে পরের বর্ষাতেই সেটা ধানি জমি হয়ে উঠতে পারে। আবার সেরকমই, দু-তিন, বা এমন-কি দশ-পনের, বছরের পুরনো ধানিজমি ও বসতি কলাগাছ-কুলগাছ ডোবানো জল বালির পাহাড়ে ঢেকে দেয়, যেন নদীর তলে কোথাও এক ধারাবাহিক মরুঝড় চলছে। জল সরে গেলে শীতে দেখা যাবে দু-একটা গাছের পাতাহীন শুকনো ডাল-যাদের শুকিয়ে যাওয়া তখনো শেষ হয় নি, দু-একটা আলগা বাশ–যেন বালির নিশানার জন্যে সদ্য পোতা কিন্তু আসলে বালির তলার মাটিতে সেগুলো পোতাই আছে। আর সেই বালির ওপর হুমড়ি খেয়ে থাকা কোনো বাড়ির চালের একটা টুকরো। তখন, শীতে দেখে মনে হয়, জলে নয়, ঝড়ে উড়ে গেছে, চালটা শুধু মুখ থুবড়ে আছে।
