.
০৮৮.
একটা নদীর ভেতর অনেক নদী
এই ঝোড়ো বাতাস, এই বৃষ্টি, এই বন্যার মধ্যেও আকাশ থেকে আলো ছিটকচ্ছে একটা–এমন আলো যা দেখা যায় না। কিন্তু অনেকক্ষণ এই আকাশের নীচে নদীর পাড়ে ঘোরাঘুরি করলে বোঝা যায়। সে আলো এমন নয় যে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাবে, বরং উল্টো, সে আলো এমনই, যা চোখের সামনে একটা আড়াল তৈরি করে, এমন ঘের, যা কিছুতেই ভেদ করা যায় না। সে আলো এমনই, যাতে কিছুই স্পষ্ট হয় না, অথচ সব কিছুরই বাইরের রেখাটা দেখা যায়। সব কিছুরই মানে, একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিসীমার ভেতরে সব কিছুর। সে আলোতে মাটি দেখা যায় না, অথচ মাটির অস্তিত্ব বোঝা যায়, পায়ের তলার মাটির অস্তিত্বটুকু, বড় জোর সামনে পা ফেলার জায়গাটুকুরও। সে আলোতে চোখের সামনে টেনে আনলেও মানুষের মুখের রেখাগুলো স্পষ্ট হয় না, অথচ তীরের ফলার মত বৃষ্টির ছাটগুলো এসে ঘাড়ে আর পিঠে বিধে থাকলে সেই জলবিন্দুগুলি নিষ্প্রভ এক উজ্জ্বলতায় পিঠটাকে, ঘাড়টাকেও আবছা স্পষ্টতা দেয়। এখন, পিঠঘাড়জোড়া আবছা উজ্জ্বলতায় এই দঙ্গলটা অনেকটা যেন স্পষ্ট, জলে ধুয়েধুয়ে যেমন পাথর স্পষ্ট করা হয়। কিন্তু, তার মধ্যেও, যারা বৃষ্টির ছাটটার দিকে পেছন ফিরে বসেছিল পূবের আর দক্ষিণের সেই লোকগুলির পিঠ ভিজে গেছে বেশি, উল্টো দিকের মানুষজনের পিঠ প্রায় শুকনো।
আলোটা আসছে আকাশ থেকেই, গত তিন দিনের সম্পূর্ণ লোপাট আকাশ থেকে। প্রথম থেকেই বাতাস দিয়ে শুরু, পরে বৃষ্টি এসেছে। যেন, দিন তিনেক আগে বুধবারে, এখানকার আকাশে, বাতাসই কোথাও থেকে খেদিয়ে নিয়ে এল মেঘ। তারপর বাতাসই সেগুলোকে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আকাশ আর তিস্তার মাঝখানের ফাঁকটা সম্পূর্ণ ভরে দিল। দিনের বেলা সূর্য দেখা যাচ্ছে না–আলোও মাঝেমধ্যে এত কমে আসছে যেন প্রায়ই অকালে সন্ধ্যা ঘনিয়ে উঠছে। আর ওপরে মেঘ, নীচে নদীর জলের মাঝখানের আকাশ জুড়ে বাতাস একেবারে দাপটে বেড়াচ্ছে। এই বাতাসে জল বাড়ে। এ বাতাস এখানকার বন্যার বাতাস না। ওপরে, পাহাড়ের ভেতরে কোথাও বর্ষা শুরু হয়েছে–সেই বর্ষা, যা মাটির তলায় ঢুকে যায়, তারপর সেখান থেকে মাটি খুঁড়ে, গাছ উপড়ে, পাথর টলিয়ে নেমে আসে নদীকে একেবারে দ্বিগুণ, তিনগুণ চওড়া করতে করতে। এখন ত তিস্তার প্রায় মাথা থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁধে মোড়ানো। কিন্তু, বাঁধ ত আর মাটিকে গভীর করে তুলতে পারে না। খাতনা-পাওয়া জল ফুঁসে উঠে বাঁধের গায়েই ধাক্কা মারতে চায়। তারপর আবার বিপরীত আক্রোশে ফিরে আসে কিছু মাটি খুবলে নিয়ে। সেই জন্যে বাধ থেকে লম্বা-লম্বা স্পার নদীর মধ্যে চলে এসেছে, জল যাতে সোজা পাড়ে গিয়ে ঘা না মারতে পারে।
বর্ষার তিস্তায় ত এরকম কোথাও না কোথাও হবেই। কোথায় হবে সেটা নির্ভর করে পাহাড়ে কোথায় বৃষ্টি হচ্ছে। এখানে না হয় এই একটা নদীকেই তিস্তা বলে, এখানে–এই সমতলে। কিন্তু ওপরে, পাহাড়ে, তিস্তা ত আর একটা নদী নয়। কোথা থেকে কত ঝোরা, কত ছোট নদী নেমে এসে তিস্তায় মেলে।
এত জায়গায় এত স্রোত তিস্তা দিয়ে যায় বলেই তিস্তাও যেন নিজেকে এমন ছড়িয়ে দেয়। এমনকি এই সমতলে, যেখানে তিস্তা তিস্তাই, সেখানেও পশ্চিম পারে বোদাগঞ্জ রংধামালি জলপাইগুড়ি-হলদিবাড়ি আর পুব পারে মাল-লাটাগুড়ি-দোসোহনি-ময়নাগুড়ি- বানেশঘাট-বাকালি মেখলিগঞ্জ এই দুই পারের মাঝখানে তিস্তা মাইল-মাইল ছড়ানো-ছিটনো। যাকে তিস্তা বলা হয়, যে-জায়গাটিকে তিস্তা বলে সব সময় দেখা হয়, দেখানো হয় তার সবটা জুড়ে ত আর কখনো জল থাকে না। তিস্তা কোনো নদী নয়, এটা একটা ভূখণ্ড। শীতকালে এই ভূখণ্ডের মধ্যে পাথরের টিলা জেগে ওঠে, তাকে ঘিরে সুতোর মত সরু কিন্তু স্থায়ী জলরেখা সোনা রঙের বালিকে সব সময় ভিজিয়ে রাখে, আর ভেজা বালিতে সেই টিলার জীবন্ত ছায়া সকাল থেকে সন্ধ্যা ঘুরে যায়। এই ভূখণ্ডের কোনো অংশ জুড়ে নরম সবুজ কচি ঘাসের মাইল-মাইল বিস্তারে গরুমোষের বাখান ঘুরে-ঘুরে বেড়ায় আর আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রোমন্থন করে। এই ভূখণ্ডের কোনো অংশ জুড়ে নতুন কোনো অরণ্য জেগে ওঠে। কাশফুলের মাইল-মাইল বিস্তারকে দূর থেকে শরতের রোদে জল বলে বিভ্রম জাগে।
বর্ষায় এই সব আবার ধ্বংস হতে থাকে। তিস্তার কোন খাত দিয়ে কখন জল গড়াবে তা কেউই জানে না। কোনো বর্ষায় ডাইনে, পশ্চিম পাড় ভাঙে ত, তার পরের বর্ষায়, বায়ে পুব পাড় ভাঙে। এমন-কি একই বর্ষার মাঝখানেও খাত বদলে যায়। বর্ষা জুড়ে জলের তলায় সেই অদলবদলের পর আবার শরৎ থেকে ধীরে-ধীরে তিস্তার ভূখণ্ডের নতুন চেহারা দেখা যায়। যেখানে জল ছিল না, সেখানে স্থায়ী স্রোত ভেজা বালির মধ্যে দিয়ে বইছে। যেখানে অনেকদিনের নদী বইছিল, সেখানকার জল হঠাৎ সবুজ হয়ে যেতে শুরু করে, কোথায় মূল নদীর স্রোতের সংযোগ তার আটকে গেছে, সহসা আবার জেগে উঠেছে পাথুরে টিলা–মাথার ওপরে বনের একটা ছোট টুকরো নিয়ে, সেই টুকরোর ওপরে প্রায় পঞ্চবটী বনের মত যেন বাছাই গাছ, কোথায় মাটির চর জেগে উঠেছে–হালেবলদে কলা গাছে আর ছনের ঘরে সেখানে দেখতে-দেখতে একটি জনবসতি গড়ে ওঠে, তিস্তার বড় খাতটা থেকে অর্ধেক। জলই আরেক খাত দিয়ে বইতে শুরু করে দেয়, নৌকাগুলো চরে আটকে যায়, তারপর নদী বদল করে, নদীর ভেতরেই নদী বদল করে। তিস্তা ত একটা নদী নয়–একটা নদীর ভেতরেই অনেক নদী।
