নিতাই একটু চুপ করে থাকে, যেন কথাটার একটা জবাব খোঁজে। তারপর বলে, মুই কহি আছুি। আমিই কয়্যা দিছি পাটিক।
কী? কী কহিছিস?
কয়া দিছি, আমাগো চরখান যদি ভাইস্যা যাবার দ্যাখেন আমাগো জন্যে মিলিটারি পাঠাইবেন না ক্যাম্প বসাইবেন না, রিলিফ দিবারও নাগবে নাকয়্যা দিছি।
রাগিস ক্যান বোকা, চুপ যা, জগদীশ যেন গোপন পরামর্শ দেয়।
আরে আমি ত চুপই আছি, দ্যাহ না, মুখ চাইপ্যা ধইরলে সব পাছা দিয়া কথা কয়– নিতাই জবাবে বলে।
পাছার কথায় ত গন্ধ বাড়ায়, ঐ কথা শুননের কামডা কী? জগদীশ মাটির দিকে তাকিয়ে বেশ চেঁচিয়ে বলে, যাতে সবাই শুনতে পায়, তারপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সবার হাসি শোনার জন্যে। কিন্তু কেউ হাসে না, এমন কি নিতাইও না। জগদীশের নিজেরও হাসার সময় পেরিয়ে যায়। তা হলে এখন আবার বলে, আবার হাসতে হয়। শালা নিতাই, সকলের লাথথি খায় তাই ভাল, উয়্যার পক্ষে কথ কইলাম–শালা চুপ মাইর্যা থাইকল।
জগদীশ রেগে হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে থুতু ফেলে কারো গায়ে লাগলে সে খুশিই হয়। সে যে রাতে প্রায় কিছুই দেখে না তা সবাই জানে, আর তাই নিয়েই এতক্ষণ তাকে ঠাট্টা করছিল। এখন সেই সুযোগটা নিতে পারে–সে ত দেখতেই পায় না, কার গায়ে লাগল কী করে দেখবে?
কিন্তু তবু কেউ কোনো আওয়াজ করে না। জগদীশের ইচ্ছে হয় উঠে একটা লাথি মেরে দেখবে কেউ আছে কি না, বেশ টানা একটা লাথি।
জগদীশের মাথায় এই ইচ্ছেটা জাগার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ সকলে হো হো করে হেসে ওঠে। নিতাই হাসতে-হাসতে চিৎকার করে, এই নরেশ, খোঁচা মারিস কেন তর হাতুড়ি দিয়্যা।
নরেশও হাসতে-হাসতে চিৎকার করে, আমারে গজেন ধাক্কাইছে, কিন্তু হাসির ধাক্কায় আর বলতে পারে না। বলার যেন দরকারও ছিল না, তার সঙ্গে সঙ্গেই গজেন চেঁচায়, আমারে আষাঢ় ধাক্কাইছে। গজেনের কথা শেষ হওয়ার আগেই আর-কেউ যেন বলে ওঠে, আরে, বঁড়খান গরম হইছে,.ফোঁ ফোঁস করিবার ধইরছে, থুতু ছিটাবার ধইরছে।
অনেকে মিলে চেঁচায়, গাই আন, গাই আন।
আর, জগদীশ উঠে দাঁড়ায়, শালারা আসিস এর বাদে, কোন তালই তগ খাওয়ায় দেখি বলে সে ভিড় থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায়। বেরিয়ে গিয়েও পঁড়ায় না, হনহন করে হাঁটতে থাকে। বাতাসের বেগে সে ধাক্কা খায়, একটু পেছিয়ে আসে, কিন্তু পা ফেলে এগিয়ে যায়। তার পা ফেলার নিশ্চয়তার চাইতেও প্রধান হয়ে ওঠে বাতাস, এই বাতাসের ঠেলা সামলে তার এগিয়ে যাওয়া। সবাই মাটির ওপর উবু হয়ে, মাথা বুকের ওপর ঝুলিয়ে-ঘাড় আর পিঠটা বাতাস আর জলের ঝাঁপটের জন্যে খুলে এম বসে ছিল যেন পাথরের চাই। তা থেকে জগদীশের ছিটকে যাওয়াটায় এখন দেখায় যেন এই পাথরে চাই পড়ে আছে আর সেটা বেয়ে একা একজন মানুষ মেনে যাচ্ছে তিস্তার স্রোতের চাইতেও প্রবলতায় তিস্তার স্রোতের ধাক্কা একই রকম, সেই ধাক্কা ঠেলতে-ঠেলতে এগতে হয়, যেন মাথার ওপর বিশমণি পাথর, মাথার ওপর নিলে নিয়ে যেতেই হবে অথবা ঐ পাথরের চাপে বসে পড়তে হবে। আর এই বাতাস যেন শিলাবৃষ্টি-কোথায় যে লাগবে তার আন্দাজ করাও যায় না।
রাবণ এই দঙ্গলের ভেতর থেকে উঠে দাঁড়ায়, তারপর জগদীশের দিকে হাঁটতে শুরু করে। সে একবার চেঁচায়ও, হে-এ জগদীশ কিন্তু তার ডাকটা উল্টো দিকে উড়ে যায়। রাবণ আর ডাকে না কিন্তু একটু তাড়াতাড়ি হেঁটে জগদীশকে ধরতে চায়। বাতাসের ধাক্কায় তারা পরস্পর থেকে একই দূরত্বে থেকে যায়। জগদীশকে ডাকার জন্যেই বোধহয় রাবণ একবার হাত তোলে। বাতাসের ধাক্কায় তার হাতটা যেন ভেঙে নেমে আসে। এখন যেরকম বাতাস আর বাতাসে জলের কণা, তাতে জগদীশ আর রাবণকে দেখতে পাওয়ার কথা নয়, তাদের এই জলকুয়াশার আড়ালে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখনো যে তাদের দেখা যাচ্ছে, যেন দুটো গাছের মত দাঁড়িয়ে আছে আর বাতাস তাদের উপড়ে ফেলতে চাইছে, তাতেই বোঝা যায় তারা বেশি দূর এগতে পারে নি আর দু-জনের মাঝখানের দূরত্ব বাতাসে অপরিবর্তিত থাকছে। রাবণ আবারও হাত তোলে, যেন বাতাসই এক ধাক্কায় তার হাতটাকে পেছন থেকে মুচড়ে ওপরে তুলে সঙ্গে-সঙ্গে আবার মুচড়ে নীচে নামিয়ে দেয়। রাবণ হাত তোলে, কিন্তু চিৎকার করে না। তার চিৎকার বাতাসে উল্টো দিকে চলে যাবে, কিন্তু হাত তোলে কেন? জগদীশ ত তাকে দেখতে পাচ্ছে না। বোধ হয় জলে ডুবে গেলে মানুষ যেমন হাত তুলে বাঁচতে চায়, তেমনি, এই বাতাস থেকে বাঁচতে হাত তুলে ফেলছে মাঝে-মাঝে রাবণ।
এখানে কেউ জিজ্ঞাসা করে, কী, খাড়ি আছে, না যাছে?
যাবার দে, যাবার দে, তখন কইল্যাম, তোমার আর এই রাত্তির বেলা পাক খাওয়ার কাম কী, বসি থাকো, রেডিওটা শুনো কুনো খবর বলে কি না, তা না, কয়, ক্যান, আমিও যাব, চল, এখন দেইখব্যারও পায় না কিছু, কিন্তু সব জাইনব্যার লাগবে। যাবার দে, যাবার দে।
রাবণ কাহা আবার পাছ ধইরছে ক্যান?
রাবণ কাহা চলি যাবে, না, জগদীশকাহাক বুঝসুঝ করি আইনবে?
আনিবার দ্যাও, আনিবার দ্যাও, বাতাস খারাপ, সগায় একসঙ্গে থাকাই মনত লাগে।
বৃষ্টি এখন জোরেই বইছে, বেশ জোরে, বাতাস না থাকলে সারা শরীর-মাথা ভিজে যেত। কিন্তু এখন বাতাসের বেগে বৃষ্টি সোজা নেই, বেঁকে গেছে। সেই জ্বলের তীর এই দঙ্গলটার পিঠেঘাড়ে।
