জগদীশ রে-রে করে দাঁড়িয়ে পড়ে–এই এই, বৃষ্টির জলত ব্যাটারি ডাউনহয়্যা যাবে, ডাউন হয়্যা যাবে, একখান রেডিওই এখন ভরসা, কানকাটু মাস্টারেরটা ত আগেই গিছে, রেডিও আনবা না, রেডিও আনবা না।
জগদীশ তারপরে দুই হাত সামনে দুলিয়ে বলে, কই? কেউ যাও নাই ত? অ্য, কথা কয় না কে কেউ?
নিতাই চিৎকার করে ওঠে, কথা আবার কী কবে নে? তোমার সব তাতেই পুতুপুতু। ব্রিজের উপর এত রাত্তিরে আলো জ্বলে, তা হালি কি এক্কেরে লাল সিগন্যাল দিল নাকি, রেডিওতে শুইনতে হবে না? নাকি কাকির সঙ্গে সিনেমার গান শুইনব্যা নে?
চুপ যা হারামজাদা, জগদীশও চিৎকার করে ওঠে, শুইনব্যার হয় ত বাড়িত গিয়্যা শুইন্যা আয়, তা আবার এইখানে রেডিও আননের কী আছে, এহন কি পতিঘাতিনী সতী পালা হব নাকি? যত্ত সব
জগদীশ দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সে প্রায় কিছুই দেখতে পায় না বলে দাঁড়িয়ে একটা দিকে মুখ রেখে চেঁচায়। তার ঘাড় ফেরানোর ভঙ্গিতে একটু অনিশ্চয়তা ছিল যে যার উদ্দেশে বলছে, সে তার সামনেই আছে, কি না। কথার শেষে জগদীশ হাত মুঠো করে একটা খুব জোরে টান দেয়, কিন্তু বুঝতে পারে আগুন নিভে গেছে। সে হাতটা ঝাঁকিয়ে বিড়িটা ফেলে দেয়। বিড়িটা পড়ে না, তার হাতেই লেগে থাকে। জগদীশ মাথায় হাত দিলে বিড়িটা তার মাথার চুলে গেঁথে যায়।তো যা না নকু, রেডিওটা শুনি আয়, বানার সিগন্যালটা শুনিই চলি আসবি জগদীশ বলে।
নকু বলে, এইঠে খাড়ি-খাড়ি গাব না পাকি চলো কেনে সগায় যাই, এ্যালায় ত সিগন্যাল দিবারই নাগিসে, মুই আসার বাদে যদি আবার দেয়?
ত্যামন হলি ত তর জেঠি নোক পাঠাইবে, কাথা আছে, যা বাবা, আমরা এইখানে খাড়াইয়্যা-খাড়াইয়্যা ব্রিজের আলোর বৃত্তান্তটা দেখি, জগদীশ বলে।
অয়, অয়, জগদীশের আঁখতৎ ত ফোকাচিং লাইট, রাবণ আস্তে করে বলে। নকু চলে যায়। জগদীশ তার ধুতির খুঁট থেকে দুটো বিড়ি আর দেশলাই বের করে। একটা বিড়ি বাড়িয়ে ধরে বলে, কায় খাবে? নে।
রাবণ বিড়িটা নিয়ে বলে, বাপের তালই বসি আছে, দেখিবার পাস না?
জগদীশ দেশলাইটা জ্বালাতে যায়, পারে না। তারপর, আবার সে সেই ভিড়ের মধ্যে বসে পড়ে। এবার আঁজলার মধ্যে আগুনটাকে বাঁচিয়ে বিড়িটাকে ধরাতে পারে। রাবণও উটকো হয়ে বসে তার হাতের স্পর্শ দিয়ে বোঝায় সে আগুন চাইছে। জগদীশ আগুনটা এগিয়ে দেয় না, কিন্তু আজলার ওপর থেকে তার মুখটা সরিয়ে রাবণকে জায়গা করে দেয়। দেশলাই কাঠির আগুন থেকে জগদীশের কোঁচকানো চোখ, নাকের দুপাশ আর গলাটাতেও আলো পড়ে। সেটা মুছে রাবণ তার মুখ এগিয়ে দেয়।
.
০৮৭.
জগদীশের রাগ
ওরা বিড়ি খাচ্ছিল বিড়িটাকে হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে। এর মধ্যে আরো দু-একজন জগদীশ আর রাবণের আশোপাশে বসেও পড়ে। তাদের মধ্যে দু-একজন বিড়ি ধরায়। যতক্ষণ এরা সবাই দাঁড়িয়ে ছিল তিস্তা ব্রিজের আলোর-দিকে তাকিয়ে ততক্ষণ বাতাস ও জলের ছাটের কথা যেন ওদের খেয়াল হয় নি। কিন্তু মাটিতে উবু হয়ে বসার পর বাতাস ও জল থেকে শরীর বাঁচাতে মাথাটা বুকের ওপর ঝুলিয়ে দেয়। যেন, ঘাড় ও পিঠটা তাদের শরীরের অংশ নয়। যেন, ঘাড়ে ও পিঠে বোঝা বইতে বইতে, সেখানে একটা প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বতই জন্মে আছে।
নরেশের টর্চের আলোতে পায়ের স্থাপত্য দেখা গিয়েছিল। তিস্তা ব্রিজের দিকে তাদের সমবেত তাকানোতে, পটভূমির সঙ্গে মিশে যাওয়া এই বর্ণভঙ্গতে, গায়ে-গালাগান তাদের দেখা গিয়েছিল। এখন তাদের দেখায় যেন মূর্তির ধ্বংসস্তূপের মত সেখানে বাতাসের জোর এতই যে মূর্তির ভঙ্গি বদলে যায়। নকু যখন জগদীশের বাড়িতে রেডিওর খবর শুনতে গেছে, তখন ওদের অপেক্ষা করতেই হবে। রাত দশটার পরও তিস্তা ব্রিজের বাতি জ্বলা দেখে একবার রেডিও না শুনে থাকে কী করে। রেডিও বন্ধ হওয়ার পরও সারাটা রাত থাকে বটে কিন্তু শিলিগুড়ি থেকে শেষ খবরেও নতুন কিছু না বললে, কেমন একটা আশ্বাস জোটে, বোধহয় নতুন কোনো বিপদ হবে না। কিন্তু নতুন বিপদের দরকারই বা কী? পুরনো বিপদই যদি আর-একটু এগিয়ে আসে তাহলেই সেটা এদের পক্ষে চরমতম ও নতুনতম বিপদ হয়ে উঠতে কতক্ষণ।
হে নিতাই, তোমরালার পার্টিত কী কহিল বানার কথা, আসিবেক, না, না আসিবেক? নিতাই তার পার্টি থেকে এই চরের গ্রামসভার সদস্য। এই চরকে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে ওদিকে দোমোহনির গ্রামসভার সঙ্গে। একটা গ্রাম এই চর, আর-গুলো আছে ডাঙাতেই। পঞ্চায়েতের অফিসও সেখানেই।
কহিল যে কমোরেড, বানা আসিলে কিন্তু আসিবেন না, না আসিলে কিন্তু কুনোভাবেই আসিবেন না, গজেন আস্তে বলে। এখানে এত আস্তে বলা কথা শোনা যাচ্ছিল না। কিন্তু ওরা সবাই মাথা নিচু করে বসেছিল বলেই বোধহয় শোনা যায়। যেন, যদি ওরা মাথাটা বুকের ওপর হেলিয়ে ওরকম চুপচাপ কথা বলে যায়, তাহলে পরস্পর ভালই শুনতে পাবে। গজেনের কথার জবাব না দিয়ে নিতাই বলে, পার্টি আবার কবে কী, অ্য, পার্টি কবে কী? বৃষ্টি হবার ধরছে পন্দর দিন ধইর্যা, আর সঙ্গে বাতাস পাহাড়ঠে বানা নামিছে, তা পার্টির এইঠে কী কহার আছে, কহেন দেখি–
এইডা একটা কথা হইল রে নিতাই। এত বড় একখান পার্টি তর, তক না পুছি পাহাড়ঠে বানা আমি ঠেলা মারিবে বানার এ্যানং সাহস? বদলি করি দে বানাক, ট্যানেসফার করি দে।
