নরেশের টর্চের ইঙ্গিতে এরা সবাই তিস্তা ব্রিজের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। ঘুরে দাঁড়ানোর দরকার ছিল না, শুধু ঘাড়টা ফেরালেই দেখা যেত, আর দেখার জন্যে ঘাড় ফেরানোরও কোনো বাধ্যতা ছিল না, একেবারে উল্টো দিকে তাকিয়েও ত বোঝা যায় পেছনে তিস্তা ব্রিজে আলো জ্বলছে। কিন্তু, এখন, নরেশের কথায়, আবার খানিকটা যেন রিভলভারের মত উদ্যত নরেশের টর্চের নেবানো নির্দেশেই, ওরা ঘুরে দাঁড়ায় এবং দেখে, তিস্তা ব্রিজের আলো নেবে নি। ঘড়ি দেখার জন্যে নরেশের টর্চের আলো একটু আগে ভেজা মাটিতে গোটা-গোটা এত পা মাটি থেকেই খুঁড়ে তুলেছিল আর সেই পাগুলোর লম্বা, কোনাচে, খাটো ছায়াগুলো পরস্পরকে কাটাকুটি করে মাটিতে এমন জট পাকিয়ে-পাকিয়ে গিয়েছিল বা গা বেয়ে উঠে শরীরের ওপরের অন্ধকারে এমন মিশে গিয়েছিল, যেন, তখন, নরেশের টর্চের চৌহদ্দিতে, মানুষের বন যদি নাও হয়, অন্তত দিগন্ত-আকাশে, মানুষের ভিড়। কিন্তু এখন, এই নদী থেকে আকাশজোড়া কুয়াশার মত আচ্ছন্নতার নীচে, দেখা যায় এরা মাত্র গুটিকয়েক মানুষ, যেন আকাশ-মাটি বিস্তৃত এই কুয়াশায় পথ হারিয়ে ফেলেছে, যেন, যেখানে তারা দাঁড়িয়ে সেটা কোনো মাটি নয়, চর নয়, বরং একটি নৌকো, মোহানায় পথহারানো নৌকো। তেমন একটি নৌকোয় যাত্রীরা, মাঝিরা, যেমন ওরকম একটা ছোট কাঠের টুকরোর ওপরে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে থেকে চোখ দিয়ে তীর খোঁজে, শুধু চোখ দুটো দিয়ে, আর সেই জলপ্রান্তরে তাদের ভেসে থাকাটাকেই সবচেয়ে অপ্রাসঙ্গিক ঠেকে, এরা, এই চরের এই গুটিকয়েক মানুষ তেমনি সামনে তিস্তাব্রিজের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে–চরটা ভাসতে-ভাসতে ঐ ব্রিজে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যাবে এমনই এক আতঙ্কে। তখনো, ওদের এই চরের উত্তর পাড়ে তিস্তার জল এসে ধাক্কা খেয়ে, ডাইনে ঘুরে, শহরের দিকের পাড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু এখন আর ওদের কানে সেই আওয়াজটা আসছে না–জলের সেই লোহা-গুড়ানো আওয়াজ, কারণ গত তিনদিনে এই আওয়াজটা ওদের অভ্যাসে ঢুকে গেছে। এখন তাদের গলা তুলে কথা বলতে হয়, নইলে শোনা যায় না। বাতাস ত উড়িয়ে নিয়ে যায়ই, জলের সেই আওয়াজেও চাপা পড়ে যায়। কথা বলার সময় নিজেদের স্বরগ্রাম তুলে ওরা নদীর বন্যার আওয়াজকে চাপা দিতে চাইছে, এই ক দিন।
কেউ একজন বলে–ভুলি গেইসে।
ভুলে ত রুজ সন্ধ্যায়, আইজ একিবারে মাঝরাত্তির পর্যন্ত ভুইল্যা থাইকল?
সিনেমা দেখিবার গেইসে, ফিরে নাই–ভঙ্গিতে রাবণকে চেনা যায়।
শ্বশুর বাড়ি গিছে, শালা, তিন রাত্রির ধইর্যা বিচি কপালে উইঠছে, কয় সিনিমায় গিছে?–জগদীশ বারুই খেপে উঠে বলে। একটা সামান্য হাসির আঁচ পাওয়া যায়। রাবণ জগদীশকে খেপানোর জন্যেই বলেছিল। জগদীশও খেপে উঠেছে। চুখ ভাল কইর্যা মেইল্যা দ্যাখ, ব্রিজের উপর গাড়িটাড়ি আছে, নি নাই? নরেশ বলে আর ডান পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে সোজা হলেই চোখের দৃষ্টি বেড়ে যাবে, এমন ভাবে সে ব্রিজের দিকে তাকায়।
আওয়াজ পাও নি? ট্রাকের? জগদীশ এবার মাটির ওপর উবু হয়ে বসে বিড়ি ধরায়। তার চোখে ছানি পড়েছে, দিনের বেলাতেই এখান থেকে অত বড় ব্রিজটাকে মনে হয় ওপারের গাছগাছালি। দেখতেই যখন পারছে না, মিছিমিছি খাড়া দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী? বরং, এই ভিড়ের মধ্যে বসে পড়লে, যেন তিস্তা ব্রিজের আলোজ্বলা বিপদ কিছুটা কাটবে।
সেই ভিড়ের তলা থেকে জগদীশের চিৎকার, কী? দেখা যায় কিছু? নড়াচড়া? একটু সময় কাটে, যেন জগদীশের নির্দেশমত ওরা ভাল করে দেখছে, সত্যিই কিছু দেখা যায় কি না। তারপর চীৎকার করেই বলে, অয়, অয়, দেখা যায়, দেখা যায়। আরো একটু সময় কাটে, তর্জনী আর মধ্যমার মাঝখানে বিড়ি আঙুলের গোড়ার দিকে। মুঠো পাকিয়ে রেখেও জগদীশ টানে না, উত্তেজনায়। তারপর রেগে ওঠে, হালা শুয়ারের বাচ্চা, দেখা যায় ত কওয়া যায় না?
সকলে আবারও হেসে ওঠে। কথাটা জগদীশকে খেপানোর জন্যে গজেন বলেছে, আর জগদীশও খেপেছে।
এ জগদীশ, তুই আয় কেনে এইঠে, দেখ ত, নজর করি দেখ, ব্রিজটা আছে কি নাই, মোর মনত খায় কি ব্রিজটা নাইরো, জগদীশের প্রায় সমবয়সী রাবণের গলা আবার শোনা যায়। কিন্তু জগদীশের ছানি নিয়ে এই ঠাট্টাতেও সে চটে না, মনে-মনে চটে উঠলেও মুখে কিছু বলে না। একটু সময় কেটে গেলে নরেশ তার টর্চটা মাথার ওপর তুলে, ব্রিজের দিকে ফেলে, জ্বালায়, যেন, সে এতক্ষণ ধরে এই হিশেবই কষছে যে টর্চটা জ্বালালে কত দূর যাবে।
নরেশের সন্দেহ হয়, টর্চটা বোধ হয় জ্বলে নি। সে সুইচটা অফ করে আবার জ্বালায়। কিন্তু আবারও তাকে অফ করতে হয়। এবার নীচে নাবিয়ে একটা ঝাঁকি দিয়ে টর্চটা নিজের মুখের দিকে ঘুরিয়ে অন করে আর সঙ্গে-সঙ্গে চোখ বোজে–আলোতে তার চোখ ঝলসে যায়।
আরে নরেশুয়াক দেখি উমরার টর্চখানও নাজ্জা পাইসে হে রাবণের এ কথায় সকলেই হেসে ওঠে। ভিড়ের মাঝখানে জগদীশ বারুই যে হঠাৎ মাটির কাছাকাছি থেকে কেশে ওঠে তার কারণ, এক হতে পারে, সে-ও হেসে ফেলেছিল, তারপর বিড়ির ধোয়ায় কেশে ফেলেছে, আর, নয় ত, এত হাসির মাঝখানে সে একটু কেশে জানান দেয়, সে-ও আছে, কিন্তু বসে।
নরেশ আবার মাথার ওপর তুলে ব্রিজ লক্ষ করে টর্চটা জ্বালে। এবার বোঝা যায়, তার টর্চের আলো জ্বলছে কি না টের পাওয়াই যায় না কুয়াশা আর হাওয়া এতই জমাট। যেন, বাতাস সেই টর্চের আলোটাকেও মুহূর্তে মুছে ফেলছে। তার টর্চের আলো যে এই ঝড়-জল ভেদ করে একটুও যেতে পারে না, এতে যেন নরেশের একটু অপমান ঘটে, নিজের কাজে নিজের অপমান। খানিকটা আশঙ্কাও বটে। কারণ, এই টর্চটাই ত গত কদিন ধরে তাকে একটা মর্যাদা দিচ্ছিল, অন্তত রাতটুকুতে তাকে ছাড়া চলছিল না। কিন্তু এখন চোখের সামনে তিস্তা ব্রিজের লাইন বাধা আলো সত্ত্বেও, এখানে সে যে তার টর্চ দিয়ে একটু বিধতেও পারল না চারপাশের জল মেশানো বাতাস, তাতে ত তার ওপর সকলের সেই আগেকার নির্ভরতা একটু কমে যেতে পারে। নিতাই চিৎকার করে ওঠে, এই কায় আছিস, যা ত চট করি দেউনিয়ার রেডিও ধরি নিয়া আয়।
