পাখিটা আর সাড়া দেয় না। এ্যালায় চুপ করি গেইসে। চুপ করি বসি থাকিবে। বাঘারু আরো একবার ডেকে ওঠে, চাপা, তার ক্লান্ত শ্বাসটায় সেই চাপা খাদের স্বরটা কেঁপে-কেঁপে ওঠে। গলা দিয়ে নয়, বাঘারু শরীর দিয়েই ডাকছে, শরীরের স্বেদ আর শ্বাস দিয়ে। পাখিটা এবার চুপ করে যাবে।
বাঘারু প্রথমে শুনতে পায় না, কিন্তু তার পরই শোনে, চার দিকে গ্রহণের সেই আওয়াজের ভেতর। পাখিটার আরো নরম জবাবি ডাক উঠেছে–ক-অ-অ-অক, ক-অ-অক্। এখন যেন আর পুরোটাও ডাকতে পারে না। ডাকটা তুলতেই গলাটা খাদে নেমে যাচ্ছে। বাঘারু যেন দেখতে পায়, পাখিটা সেই ডালের ওপর দুই পায়ের ভেতর শরীরটা ডুবিয়ে আর ঘাড়ের ভেতর গলাটা টেনে নিয়ে তার দোসরের জন্যে, অপেক্ষায়। কোথায় সে আছে তার সঙ্কেতটুকু জানতে গলা দিয়ে শুধু আওয়াজটা বের করে যাচ্ছে। একবার সে সঙ্কেত জেনে এই অন্ধকারে উড়ে চলে আসবে।
বাঘারুর দুই হাত মুখের কাছে এনে চাপা স্বরে, খাদে, আবার সেই আওয়াজটা তোলে, বুদ্বুদ তোলার মত। বাঘারু আবার ডেকে ওঠে। বাঘারু আবারও ডেকে ওঠে।
দুই হাত মুখের কাছে ধরে ডাকতে-ডাকতে বাঘারু একটু এগিয়ে যায় ডায়নার দিকে। গ্রহণের অন্ধকারে ডায়নার ফেনা পাথর থেকে ছিটকে ছিটকে উঠছে বাঘারু জলে পা দিয়ে ডাকতে-ডাকতে একটু এগয়।
যে বাঁকে নদী ফরেস্টের অন্ধকারের ভেতরে সেঁদিয়ে গেছে-~-উজানে, সেইখানে, বাঘারু দাঁড়ায়। ডায়নার জলের সঙ্গে মিশে, ডায়নার ওপর দিয়ে সেই পাখির কুহর চলে আসতে থাকে। পাখির পুরো শরীরটাই যেন ডাকছে এমন গহন সেই কুহর। বাঘারু তার শুকনো রক্ত-লাগা দুই হাত ঠোঁটের কাছে এনে ডেকে ওঠে গভীর খাদে। সেই ডাকের ভেতর হাপ এসে যায়। বাঘারুও যেন, পাখিটার মতই, পুরো ডাকটা ডেকে উঠতে পারে না। পাখি আর বাঘারুর ডাকাডাকি ঘিরে গ্রহণের অকাল-আঁধার বনজঙ্গলের আওয়াজে ভরে-ভরে ওঠে। এখনই গ্রহণ শেষ হয়ে আবার সূর্যোদয় ঘটবে।
.
০৮৫.
বনপর্বের শেষ অধ্যায়
সেই সকালে বাঘারু তার বাথান নিয়ে পাহাড়ে উঠেছিল পশ্চিমের চড়াই দিয়ে। এখন বিকেল, বা সন্ধ্যায়, পুবের ঢাল দিয়ে নেমে এল। সূর্যে হঠাৎ গ্রহণ লেগে যাওয়ায় বিকেল বা সন্ধ্যেটা একটু দুবার ঘটে যাচ্ছে, এই যা। নদীর বুক থেকে বাথান নিয়ে বেরিয়ে বাঘারু আবার নদীর বুকেই ফিরে আসে–মাঝখানে তার বাথানে মোষ বাড়ে একটা। এই মিলে বেশ একটা সম্পূর্ণতার ভাব আসে।
এমন কোনো ঘটনাও ত বাঘারুর নেই, যা একটা কোথাও আরম্ভ হয়ে একটা কোথাও শেষ হয়। প্রাকৃতিক কোনো কিছুই ত তেমন হয় না।
বাঘারুর সব ঘটনাই তার আগে থাকতে ঘটে আসছে, আর তার পরেও ঘটে যেতে থাকে। মানবিক সব ঘটনা ত এমুনই ব্যক্তিনিরপেক্ষ।
বাঘারুর সব দিনই ত হুবহু এক। সে ত আর দিন কাটায় না যে একটার পর একটা দিন মিলে তার জীবন তৈরি হবে। বাঘারু জীবন কাটায়, পুরো আস্ত একটা জীবন। একটা দিন ত সে জীবনের অতি তুচ্ছ একটা মাপ মাত্র।
বাঘারুর প্রতিটি দিনই এক-একটা পুরো জীবন। প্রতিটি ভঙ্গিই ত বীরত্বের ভঙ্গি–সে নদী সঁতরানোই হোক আর পাথরে শুয়ে থাকাই হোক, ভোখার সঙ্গে খেলাই হোক আর বুড়িয়ালের পিঠে দাঁড়ানোই হোক। সে মোষের বাচ্চা বের করাই হোক, আর পাখির ডাক ডাকাই হোক।
ভাষা মানেই ত অর্থ। বাঘারুর ত কোনো অর্থ নেই। বাঘারু ত শুধু বাঁচা আর বাঁচা, সে ত শুধু জীবন আর জীবন।
ভাষা মানেই ত কিছু-না-কিছু অলঙ্কার। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত বাঘারুর সারা গায়ে, মাঝখানে একটা নেংটি ছাড়া, সামান্যতম ঢাকা নেই। বাঘারুর তুল্য এমন নগ্ন ভাষা পাওয়া যাবে কোথায়?
ভাষা মানেই ত নাম। বাঘারুর ত কোনো নাম নেই। সে ত শুধু কাজে কাজে বদলে বদলে যায়কুনিয়া, বাঘারু, পাথরিয়া, মইষাল, তার এই হয়ে ওঠার ত আর শেষ নেই।
৩.১ চরপর্ব – নিতাইদের বাস্তুত্যাগ ও সীমান্তবাহিনীর সীমান্তত্যাগ
ব্রিজে আলো কেন?
নরেশ ওর লাল টর্চটা জ্বেলে হাতের ঘড়ি দেখে। টর্চের আলো ভেজা এটেল মাটিতে গোল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সেই আলোর বৃত্তে শুধু পা-মাথাছাড়া, ধড়ছাড়া পা; হাঁটু পর্যন্ত, কুচকি পর্যন্ত খালি পা; জলেকাদায় বেশির ভাগ পায়েরই হাঁটু পর্যন্ত লেপ্টানো।
নরেশ টর্চ নিবিয়ে দেয়। তাতে মাটির ওপরটা অন্ধকার হয়ে যায় কিন্তু সেখানে টর্চের আলো পড়ে নি। সেই আবছা কুয়াশার মত উজ্জ্বলতার ভেতর দিয়ে নরেশ তিস্তা ব্রিজের দিকে তার নেবানো টর্চটা তুলে দেখায়, নেবানো টর্চটা সহ হাতটা টানটান তুলে দেখায়, যেন ওটা টর্চ নয়-বন্দুক, বা অন্তত রিভলভার, হিন্দি ছবিতে ভিলেইনের হাতে একমাত্র দেখা রিভলভার। রিভলভারের কথা একবার মনে এলে তখন নরেশের টর্চটাকে সত্যি-সত্যি রিভলভারের মতই দেখতে লাগে যেন; সিনেমায় দেখা রিভলভারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা মনে-মনে একবার শুরু হলে তখন আবার মনে হয় নরেশের টর্চটা বরং উল্টনো রিভলভারের মত দেখতে–নলটা নরেশেরই বুকে, টর্চের হ্যান্ডেল আর ঘোড়াটা হচ্ছে কাঁচে ঢাকা বান্ধ। কিন্তু সেই উল্টনো টর্চ থেকে এখন অন্ধকারই ছোঁড়া হয় তিস্তা ব্রিজের দিকে।
নরেশ বলে–রাত্তির বাজে দশটা, এখনো তিস্তা ব্রিজের আলো নিবায় না?
সবাই তখন তিস্তা ব্রিজের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।
