বাঘারু প্রায় যেন পৌঁছে যায়। সোজা নেমে গেলে ত আর কয়েক পা। তার পর নদীর ভেতর দিয়ে হেঁটে সেই তাদের বাথানের জায়গাটায় পৌঁছতে পারে। কিন্তু বাঘারুদের আর নদীর মাঝখানে এখন সেই খোপ (ঘন ঘাসের জঙ্গল), এ্যালায় তাড়াহুড়ায়, বাথান নিয়া নামা না যায়, হয়ত ভেতরে কোথাও কোনো পাথর আলগা হয়ে আছে, পা দিলেই পিছলে যাবে, বা, ঘাসে ঢাকা গর্তে পা আটকে যাবে। তার চাইতে সোজা যাওয়া ভাল, কে বাঁক ঘুরে। টর–অ-অ-অ, টর–অ-অ-অ।
আলোতে কতটা গ্রহণ লাগল মাপতে বাঘারু ছুটতে-ছুটতে তাকায়। অকাল-গোধূলিতে পশ্চিম পাহাড়ের এক অচেনা ছায়া ডায়না নদীর চরটাকে কোনাকুনি অন্ধকার করছে। সেই দুধের গাড়ি আসে দক্ষিণ-পচ্চিম পাকের যে-জঙ্গল দিয়া, এই একটু উঁচু থেকে দেখা যায়, সেই জঙ্গলের মাথাখান জুড়ি হে-ই মাইল-মাইল ছায়া ছড়ি যাছে হে, ছড়ি যাছে। আলোত কালি নাগি গেইসে, নাগি গেইসে, আন্ধার, আন্ধার, গিরহন, গিরহন–
বাঘারু শেষ বাক নেয়।
পাশে বুড়িয়াল! বাঘারুর কোলে নতুন বাছুর–জলে রক্তে-শ্লেষ্ময় জড়ানো। একবার ঘাসটাস দিয়ে বাঘারু মুছিয়েছিল বলে ঘাস-লতা-পাতা শরীরে সেঁটে আছে, যেন সে-সব জন্মচিহ্ন, ছিটোয়াল মহিষ। বুড়িয়ালের পিঠে খাড়া বসে ভোখা টানা ঘেউ-ঘেউ ডেকে যাচ্ছে। বুড়িয়ালের ধায়ে সেই বিয়ানি-মইষানি–যার বাছুর। বুড়িয়ালের একটু পেছনে, গা ঘেঁষে ছুটতে ছুটতে চলেছে, তার গলাটা লম্বা বাড়িয়ে বাছুরটাকে যতটুকু পারে চাটছে। মইষানির পেছন, পেছনের দুই পায়ের ভেতর দিক, রক্তেজলে থকথক করছে। বুড়িয়ালের ডাইনে বাঘারু। ছুটতে-ছুটতে কখনোও বুড়িয়ালের গায়ে, ধাক্কা লাগে। বুড়িয়াল যেন নতুন বাছুরসহ বাঘারুকে চলমান ঢাকা দিয়ে রেখেছে। ওপর থেকে কিছু, পা থেকে কিছু নতুন বাছুরের ওপর চাপ পড়ে। বাঘারুর থুতনি গলা-বুক-পেট, আর বগল থেকে আঙু পর্যন্ত দুই হাত রক্তেজলে ল্যাদল্যাদ করছে। এই রকম করে ছুটতে ছুটতে ওরা নদীর পাথুরে বুকে ঢুবে যায়।
.
০৮৪.
পাখোয়াল পর্ব : আর-এক বৃত্তান্তের শুরু
সূর্যের আলো ধীরে ধীরে কমে আসে। জঙ্গল, পাহাড়, পাথরের ছায়াগুলি বদলে যেতে থাকে। আলোতে নরম রঙ লাগে। ডায়নার বুকে অসংখ্য নুড়ি-পাথরের অজস্র রঙের ছায়া লম্বা থেকে লম্বা ছড়িয়ে যায়। কোনো সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তে রঙের এমন কৌণিক প্রপাত ঘটে না। ডায়নার বুকে নুড়ি-পাথরের এইসব রঙিন ছায়ার ওপর বিরাট ছায়াবান পাথরের কালো ছায়া পড়ে।
বাথান এখন বাথানের জায়গায়। কিন্তু কোনো মোষই বসে নি। গায়ে গা লাগিয়ে, গলায় গলা বাড়িয়ে সবগুলো মোষই থমথমে দাঁড়িয়ে যেন নিশ্চিন্ত নয়, তারা ফিরেছে কি না। যেন, তখনই তাদের আবার এখান থেকে সরে যেতে হতে পারে।
বাছুরটা ঐ বাথানের মধ্যে নড়বড়ে পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে আর পা ভেঙে ভেঙে পড়ে যাচ্ছে।
আলো আরো কমে, প্রায় অন্ধকার হয়ে এল। বড় বড় গাছের পাতা কোনাচে। আবছায়া গাছগুলো হঠাৎ লম্বা হয়ে যেতে থাকে। সূর্যের আলোর অভাবে বাঘারুর ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করে। সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেখে, প্রায় পুরো সূর্যটাই অন্ধকার হয়ে আছে, সুতোর মত এক ফালি বাকি। গিরহন, গিরহন।
পূর্ণ গ্রহণের মুখে মোষগুলো গলা তুলে আঁ আঁ আঁ ডাকতে শুরু করে। লেজ-মাথা দুইই মাটির দিকে নামিয়ে লোখা কান্নার টানা সুর তোলে।
শুধু সেই নতুন বিষয়ানি মইষানি তার বাছুরের গা চেটেই যায়। আর বাছুরটা ঘাড় নড়বড় করতে করতে উঠে দাঁড়ায়। তারপর পা ঘাড় দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে পড়ে। আবার সোজা হতে শুরু করে। এই, এখনই ঘাড় তুলে কয়েক পা ছুটে যেতে না-পারলে যেন ওর জন্ম সম্পূর্ণ হয় না।
বনের ভেতরে ডাল থেকে পাখিদের ওড়ার পাখসাট। ঘাসবনে এক সার জোনাকি জ্বলে জলের মত ঘুরপাক খেয়ে যায়। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হরিণের মত কিছু একপাল ছুটে যায়। গ্রহণের আকাশের অন্ধকার থেকে ঝুপঝুপ নেমে আসে বাদুড়, উড়ে চলে যায়। শেয়াল আর বনমোরগ একসঙ্গে প্রহর ঘোষণা করে দেয়। তাতে, ভোখা মাটির দিকে মুখ নামিয়ে আবার কান্না শুরু করে। আওয়াজটা যেন মাটি খুঁড়ে ভেতরে চলে যাবে। গিরহন, গিরহন, গিরহন পুরা হয়্যা গেইল, পুরা হয়্যা গেইল–তারই পাথরের নীচে, বাথানের মাঝখানে বাঘারু তাকিয়ে আছে, দ্বিতীয় সূর্যোদয় শুরু হয় কখন তার অপেক্ষায়।
প্রথম বার বাঘারু খেয়াল করে না। দ্বিতীয় বারও, অত আওয়াজে যেন পরিষ্কার হয় না। কিন্তু তার পরের বার একেবারে স্পষ্ট, যেন বাঘারুর শোনার জন্যেই, তীক্ষ্ণও। সারাটা শরীর দিয়ে পাখিটা ডাকে, ক-অ-অক, ক-অ-অক। শেষেরটুকু শোনাই যায় না। গলা বুজে আসে। পাখোয়ালখান জঙ্গলের অনেক ভিতরত আছি। এ্যালায় গিরহনের আন্ধার দেখি ছুটি-ছুটি আসিবার ধইচছে। গাওখান ধোকপোকাছেবাঘারু তার না-দেখা পাখির শরীরের সেই বেপথু দেখতে পায়। পাখিটা আবার গাঢ় ও স্পন্দিত স্বরে কুহর দিয়ে ওঠে, ক-অ-অক।
বাঘারুর শ্বাস তখনো স্বাভাবিক হয় নি, ঘাম তখনো মরে নি। হাতপায়ের রক্তক্লেদ তার বোয়া হয় নি। দুটো রক্তমাখা হাত মুখের কাছে তুলে বাঘারু খুব চাপা স্বরে, গলা না তুলে পাখিটার ডাকে সাড়া দেয়। একবার।
