আড়িয়া (ওঁড়ে) বাছুর হলে এই সামনের পা আর কাঁধের জায়গাটাই সব চেয়ে চওড়া আর গাই বাছুর হলে পেছনের পা আর কোমর। বাঘারু বাছুরের মাথাটা ছেড়ে বা হাতটাও ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়, কিন্তু বেশি ভেতরে না, একটু ঢোকাতেই সে ঘাড়টা পেয়ে যায়। বাছুরের মাথাটা বাইরে ঝুল ঝুল করে। আর বাঘারু ডান হাতে মইষানির পেটের ভেতরে সামনের পা দুটো-লেগে-থাকা বুক আর বাইরে বা হাতে, ঘাড় ধরে, মাটিতে দুই গোড়ালির ঠেকনো দিয়ে, ঝুলে পড়ে। মইষানির গলা দিয়ে কেমন একটা গো গো আওয়াজ বেরয়। বাঘারুর বা হাতের আঙুলের গিঠটা মইষানির ফাঁকটাতে ঠেকে যেতেই সে প্রায় একই সঙ্গে বা হাতটা ঘাড় থেকে খুলে আঙুলগুলো সোজা করে টেনে বের করে আনে আর ডান হাতে পুরো টান দেয়। সড়াৎ করে ঘাড়টা বেরিয়ে আসে আর বাছুরের মাথাটা আরো ঝুলে যায়। সড়সড় করে বাছুরের ঘাড়বুক-পা নেমে আসতে থাকে, প্রায় মইষানির হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে পড়ে। কিন্তু সামনের পা দুটো সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসার আগেই বাঘারু বা হাতে ঘাড়টা ধরে আটকে দেয়–যেভাবে গড়িয়ে নামছে, পেছনের পা যদি আটকে যায়। বাঘারু ডান হাতটা আবার ভেতরে ঢোকায়। তখন বাছুরের শরীরটাই নীচে নামার টান পেয়ে গিয়েছে। হড়-হড় করে নীচে নেমে যাচ্ছে। বা হাতে সেটাকে একটু ঠেকিয়ে বাঘারুর ডান হাতে বাছুরের পেছনের পা দুটো একবারেই মুঠো করে ধরতে পারে। তার পর সেই দুই পা ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামাতে থাকে। কোমরের হাড়টায় ঠেকে যায়। কিন্তু ততক্ষণে পেছনের পা দুটোর পাতা বেরিয়ে গেছে। একটা ঝাঁকি দিতেই বাছুরের পুরো পেছনটা বেরিয়ে সেই থলির মধ্যে ঝুলতে ঝুলতে নীচে ঘাসের ওপর। বাঘারু হাত দিয়ে বাছুরটাকে শুইয়ে দেয়। মইষানির পেটের ভেতর থেকে ঝিল্লির থলি, জল, রক্ত বেরিয়ে আসতে থাকে।
.
০৮৩.
বাথানে আরো একজন
মইষানি তখন থরথর করে কাঁপছে আর বারবার মুখটা পেছনে নিয়ে আসতে চায়। কিন্তু কেন যেন আনে না। বাঘারু এবার সামনের দিকে তাকায়–রোদে কি ছায়া লেগেছে? বাঘারু পশ্চিম পাহাড়ের দিকে তাকায়। পাহাড়ের ছায়াটা কেমন অদ্ভুত ঠেকে, যেমন বাঘারু কখনো দেখে নি। বাথানও তেমনি কিছু বুঝে ফেলে কি না, কে জানে। হঠাৎ অনেকগুলো মোষ একসঙ্গে ডেকে ওঠে। মাটিতে পা ঠোকার আওয়াজ তোলে। ভোখা এতক্ষণ পরে আকাশে মাথা তুলে একটা লম্বা টানা ডাক শুরু করে, বুড়িয়াল তার বিরাট কান দুটো দিয়ে একবার ডান, আর-একবার বা পিঠ ঝাড়ে। গিরহন নাগি গেইল রে, মোর বাথানঠে গিরহন নাগি গেইল।
বাঘারু আর মুহূর্ত দেরি করে না। সে দুই হাতে মইষানির পেটের ভেতর থেকে ঐ রক্ত জলময় লম্বা থলির বাকি অংশ টেনে বের করে। ফুল পড়িল? না, না পড়িল? তার পর নাড়ীটা ছিঁড়ে একটা গিট দিয়ে বাঘারু বাছুরটাকে আলাদা করে ফেলে। ততক্ষণে বাছুর তার পা চারটে মেলে ঘাড়টা তুলছে আর ফেলছে। বাঘারু টাকরায় টর, টর-অ দিয়ে দেয়। সামনের মোষগুলো চলতে শুরু করে দেয়। কিন্তু ওদের শিংগুলো তোলা, লেজটা শক্ত। ডর খাছে? ডর? মোর বাথানত গিরহন আসি গেইল রে, আসি গেইল। বাঘারু টাকরায় আবার আওয়াজ তোলে, টরররর-অ, টরররর-অ, মুখে আওয়াজ দেয়, ঝট কর, ঝট কর, হেঁট হেঁট, টর–অ।
এইসব করতে করতে বাঘারু বুড়িয়ালের গলাটা শুধু একবার ছুঁয়ে দিতে পেরেছে। তাতেই বুড়িয়াল বোঝে তার কিছু করণীয় আছে। সে কয়েক পা এগিয়ে আসে। বিয়ানি মইষানি বাছুর দেখতে না পেয়ে। আঁ আঁ আঁ করে কেঁদে ওঠে।র কেনে। কান্দিবার ধরিস বাদে। বাঘারু দুই হাতে কিছু ঘাসপাতা ছিঁড়ে এনে বাছুরের শরীর থেকে ক্লেদটা মুছে দেয়, মাত্র একবারে যতটা পারে। তার বাথান রওনা দিয়ে দিয়েছে। বাঘারু দুই হাতে বাছুরটাকে কোলে তুলে নেয়। তখনো ত বাছুরটা গর্ভের ভেতরে যেমন ছিল, সেই ভঙ্গিতেই চার পা এক করে ঘাড় নুইয়ে গোল পাকিয়ে আছে। সবে দু-একবার ঘাড়টা তুলেছে মাত্র। এখন বাঘারুর দুই হাতে বাঘারুর বুকের ভেতরে সে সেভাবেই থাকে। যেন বাঘারুর বুক তার দ্বিতীয় গর্ভ। বাঘারু কোলে করে, বুকে করে, দুই হাতে উঁচু করে, বাছুরটাকে তুলে নেয়। নিয়েই বুড়িয়ালকে পায়ের ধাক্কায়, টর-অ দেয়। বুড়িয়াল চলতে শুরু করে। বাঘারু বাছুরটাকে বুকে করে বুড়িয়ালের পাশে-পাশে ছুটতে শুরু করে। ততক্ষণে বিয়ানি মইষানিটাকে ছাড়িয়ে বুড়িয়াল এগিয়ে গেছে। আর বিয়ানি মইষানি বুড়িয়ালের পাশে-পাশে পিছে-পিছে ছুটতে-ছুটতে জিভ বের করে বাঘারুর কোলে বাছুরটার গায়ের যেটুকু পাচ্ছে সেটুকুই চাটছে। তাতে বাঘারুর হাতের অনেকটা চাটা হয়ে যায়।
টর-অ, টররর-অ করে বাঘারু বুড়িয়ালের ডান পাশ দিয়ে ছুটতে থাকে। পুরা বাথান নামি যাছে এ্যালায়, চল, চল, গিরহন নাগিছে, গিরহন নাগি গিসে। চি-ই-রো চি-ই-রো আওয়াজে এক ঝাক পাখি বনের ভেতর থেকে উড়ে এসে, সামনে কোনো অনির্দিষ্ট আশ্রয়ের দিকে ছুটে যেতে গিয়ে, এই দলটাকে দেখে, আচমকা পাক খেয়ে বাঘারুর কোলে সেই নতুন বাছুরের দিকে নেমে, আবার উঠে, বুড়িয়ালের ওপরে একটু নিচু হয়ে, নদীর ওপরে চলে যায়।
গিরহন, গিরহন, পাখিরা বাহির হয়্যা যাছে। ঠুকরিবার পারে, বাছুরক ভোখা, ভোখা। ভোখা পেছন থেকে বাঘারুর ছুটন্ত দুই পায়ের ভেতর মুখ ঢুকিয়ে দেয়। বাঘারু ছুটতে-ছুটতে বুড়িয়ালের পিঠের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ভোখাকে বলে, উঠ, উঠ। বলতে বলতে একটু নিচু হয়, হাঁটুটা ভাজ করে। ছুটতে-ছুটতেই ভোখা বাঘারুর নোয়ানো পিঠের ওপর সামনের দুই পায়ের ভর দিয়ে ওঠে, আর বাঘারু সোজা হতে-হতে লোখা টক করে বুড়িয়ালের পিঠের ওপর উঠে যায়। নিজের পেছনের পা দুটোর ওপর টান-টান বসে পড়ে আকাশে মুখ তুলে ঘেউ-ঘেউ করে পাখি তাড়াতে শুরু করে দেয়। ট র-অ-অ-অ, টর–অ-অ-অ বাথানের একেবারে শেষে বাঘারু, গিরহন নাগি গেইসে, গিরহন নাগি গেইসে, নামি চলল, নামি চললা, ট–অ-অ-অ, ট র-অ-অ-অ।
