ততক্ষণে মইষানির দুই পা বেয়ে রক্ত, জল, আর শ্লেষ্ম গলে-গলে পড়ছে। বাঘারুর দুই হাতের কব্জি থেকে সেই তরল পদার্থ হাত গলে কনুই পর্যন্ত গিয়ে টপ টপ মাটিতে পড়ছে। বাঘারু তার দুই হাতের জোর রাখার জন্যে নিজের দুই পা ফাঁক করে মাটিতে দাঁড়ায় আর সামনে তাকিয়ে দেখে, নদী ও ফরেস্টের ওপর এখনো ছড়ানো আলোতে ছায়া লেগে গেল কি না। চকিতে একবার ভেবে নেয় বাঘারু, বাথানটাকে ঠেলেঠুলে নীচে পাঠিয়ে দেবে কি না, দেখাই ত যাচ্ছে এখান থেকে, সঙ্গে ভোখা যাক, কায়কায় ত চলিও গেইছে। দুই হাতে মইষানির পেছনটা ফাঁক করে ধরে রেখে বাঘারু দুই পাশে তাকায়–তোখা পর্যন্ত চুপচাপ লেজ নাড়ায়, বুড়িয়াল পর্যন্ত খাড়া, সারাটা বাথান সিধা গলা খাড়া করি আছে, ঘাসেও মুখ দেয় না, হকারও তোলে না। এ্যালায় ত বাথানখান বাথান হওয়া ধরিছে। একটা পোয়াতি মইষানি বাছুর দিবা ধইচছে। এইখান ত একোটা কেনা বাথান। গয়ানাথ কিনিছে। এই হাট ঐ হাট ঘুরিঘুরি কিনিছে। বুড়িয়ালখান কেনা। বুড়া বঁড় কেনা। ওয়ালিখান কেনা। তার বাদে ত বাথানও বাছুর হওয়া ধরি। বাছুর হওয়া ধরিলে বাথান বাড়িবে। বাথান চালু থাকিবে। বাছুর হবা ধরিছে। বাছুর। বাথানত বাছুর।
ততক্ষণে মইষানির পেছনের ফাঁকটা বাছুরের মাথায় সম্পূর্ণ ভরে গেছে। এখন বাঘারু ছেড়ে দিলেও, মাথাটা আর ভেতরে ঢুকে যেতে পারবে না। বাঘারু তার বা পা দিয়ে মইষানির তলপেটে একটা ছোট্ট গুলো দেয়, কোথন দে, কোঁথন দে, দে।
সেই গুঁতোতে মইষানি আঁ-আঁ-আঁ-আঁ আর্তনাদ করে ওঠে। সামনের পা দুটো দাপায়। এই মইষানিটা যত চেঁচায় তার গলাটা তত লম্বা হতে থাকে। অন্য মোষগুলো চেঁচায় না, কিন্তু তাদের গলাও ক্রমেই লম্বা হয়। এখন এই জঙ্গলের ভেতর বাঘারুর বা দিকে বুড়িয়ালের বিরাট লম্বা বাড়ানো গলা আর ডাইনে সারি দেয়া মোষের দলের বাড়ানো গলার সারি, আর সামনে তলার সেই নদীর বুক–বাঘারুর মনে হয়, এ্যালায় নাগি যাবে গিরহন, এ্যালায় নাগি যাবে। গেলে যাবে, সেটা আর তত বিপদের নয়। কারণ ফরেস্টের ভেতর থেকে ত সে বেরিয়ে আসতে পেরেছে–কিন্তু এমন জায়গায় মোষের পালটা যদি এলোমেলো হয়ে যায়।
বাছুরের মাথা আরো খানিকটা ঠেলে এসেছে, কিন্তু এখনো বাঘারু দুই হাতে মাথাটা ধরতে পারবে না। বাঘারু তার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে মইষনির ফাঁকের চামড়াটা একটু টেনে দেখে। তারপর দুই হাতের তর্জনী আর মধ্যমা মইষানির ফাঁকের ভেতর ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করে। চামড়ার তলার দিকটা দিয়ে আঙুলগুলো ঢুকিয়ে চাপে বেঁকিয়ে দিতে হয়। মইষানির চামড়া ছিঁড়ে যেতে পারে। গেলে যাবে। এখন সেসব টের পাবে না। দুই হাতের চারটে আঙুল একবার ভেতরে ঢুকে গেলে বাইরের দুই বুড়ো আঙুল বাছুরের মাথায় লাগিয়ে বাঘারু মাথাটা সাড়াশির মত চেপে ধরে।
চেপে ধরেই থাকে। টানে না। একবার পিছলে আঙুল বেরিয়ে এলে আবার ঢোকানো মুশকিল। সেই আন্দাজ বাঘারুকে ধীরেসুস্থে নিতে হয়, ধরা ঠিক হয়েছে কি না, পিছলে যাবে কি না।
নিশ্চিন্ত হয়ে বাঘারু এবার ধীরে-ধীরে টানতে শুরু করে। ধীরে ধীরে টানের জোর বাড়ায়। ধীরে-ধীরে। এখন বাঘারু হাতের দুই তালুর ভেতর মাথাটাকে পেয়ে যায়। তাই তাকে আবার ঠাহর করতে হয় হাত পিছলে যাবে কি না। এখন হাত একবার পিছলে গেলে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে হবে–যখন বেরবার বাছুরই বেরবে। বাঘারু যখন নিশ্চিন্ত হয় যে তার দুই হাতের মুঠোর ভেতর বাছুরের ঐ একটুখানি মাথা পুরো সেঁটে আছে সে তখন ধীরে ধীরে শরীরের সবুটুকু জোর দিয়ে বাছুরটাকে টানে। বাঘারুর যেন হিশেব আছে, কখন, কত ধীরে, আর কখন, কত তাড়াতাড়ি, টানলে, পেটের ভেতরের আস্ত একখান বাছুর জলেরক্তে ভিজি বাহির হয়্যা আসি দুই ঠ্যাঙত খাড়া হবার পারে। সেই মুহূর্তে আকাশে, লক্ষ-লক্ষ গ্রহনক্ষত্রের অসংখ্য আকর্ষণ-বিকর্ষণে তৈরি অগণন কক্ষপথের সাপেক্ষতায় সূর্যের যে আঁধারপাত ঘটে যাচ্ছিল সেকেন্ডেরও ভগ্নাংশের নির্ভুল মাপে, বাঘারুর হাতের মাপ ছিল তার চাইতেও নির্ভুল।
মাথার অনেকখানিই বেরিয়েই এসেছিল। বাঘারু এখন কপাল পেয়ে যেতে পারে দুই হাতের মুঠোয়। বাছুরের শরীরের আর এই মইষানির পেটের প্রত্যেকটা খুঁজ বাঘারুর এমনই জানা যে সে বা হাতটাতে বাছুরের ঘাড়টা ধরে একটু কোনাচে করে নেয় আর ডান হাত দিয়ে মাথাটাকে একটু বায়ে ঘোরাতেই কপাল পেয়ে যায়। মাথা মানেই ত ঘাড় আর কপাল। বাঘারু বা হাতে ঘাড়টা চেপে রেখে, ডান হাতে কপালটা ধরে একবার তলার দিকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে, পরের ঝাঁকুনিতেই ওপরে ঠেললে কপালের হাড়টা.আরো খানিকটা বেরিয়ে আসে। বাঘারুর ঝাঁকুনিতে মইষানি পেছনের একটা পা হড়কে যেতে চায়। কিন্তু সে গেলে যাক, বাঘারু ত এখন তার মুঠো আলগা করবে না। সে মাটির ওপর দুই গোড়ালির চাপ দিয়ে তার শরীরটার ঝোঁক পেছনে ফেলে দুই হাতে ঘাড় আর কপাল ধরে বাছুরের মাথাটা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে চোখের ওপরের হাড়, চোখের পাশের হাড়টা বের করে আনতেই–এটাই মুখের শেষ বাধা-সড়াৎ করে বাকি সরু মুখটা গলা পর্যন্ত বেরিয়ে আসে আর মইষানির পেছনে বাছুরের মাথা ঝুলে থাকে। মইষানি একটু হাল্কা বোধ করে ফেলে হয়ত, সে তার পেছনের একটা পা সরাতে যায়–আর ফাঁক করে থাকতে পারে না। বাঘারু মুহূর্তের সময়ও দেয় না। বা হাতে বাছুরের মাথাটা ধরে রেখে ডান হাতটা তার গলার ফাঁক দিয়ে মইষানির ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। আঙুল নেড়ে দেখে নেয়, মইষানির ভেতরে বাছুরের সামনের পায়ের ভাঁজ ঠিক আছে কি না। তার পর ডান হাতটা দিয়ে পা দুটোকে ভেতরে চেপে দুই হাতে আবার সেই টান দেয়, ধীরে-ধীরে, কিন্তু নিশ্চিত, বাঘারু পুরো শরীরের ওজন ঝুলিয়ে যেন বাছুরটাকে টেনে বের করে আনবে।
