সবগুলো মোষ পেরিয়ে গেছে। সেই বাকের গর্তের সামনে শুধু বুড়িয়াল আর বাঘারু। বুড়িয়াল তার এতদিনের অভিজ্ঞতায় বুঝে যায়–পেছনে একটা কোনো বিপদের তাড়া আছে। বাঘারুর মনে একটা হিশেব খেলে যায়–বুড়িয়ালের ত বাথানে এমনি কোনো কাজ নেই। আর সে একা এখানে থাকলে বাথানের কোনো ক্ষতি নেই। কাল সকালে এসে বুড়িয়ালকে খুঁজে নিলেই হবে। বাঘারু বুড়িয়ালের পিঠে এমন ঠাণ্ডা হাত রাখে যেন সে হিশেব জানা হয়ে যায়। বুড়িয়াল আকাশে মুখ তুলে–আ-আ-আঁক রবে তার সেই ডাক ছাড়ে। বুড়িয়াল আকাশে মুখ তুললে মনে হয়, আকাশই ভেঙে পড়বে।
এদিকে বাথান নীচে নেমে যাচ্ছে। বাঘারু আকাশের দিকে তাকায়, গ্রহণ কি শুরু হয়ে গেল। সে লাফিয়ে ওপরে উঠে ছোটে-মোটা ডাল কয়েকটা পাওয়া যায় কি না। বুড়িয়াল অস্থির পায়ে আকাশে মুখ তুলে বাঘারুর দিকে ঘোরে।
বাঘারু হাতের নাগালে যেকটা ডাল পায়, নিয়ে দৌড়ে এসে গর্তটার ওপর ছড়িয়ে দিয়ে প্রায় শুয়ে পড়ে, দুই হাতে সেই ডালগুলোকে চেপে ধরে ক্যালভার্টের মত করে টাকায় আওয়াজ তোলে, টর–অ, টর–অ।
বুড়িয়াল তার সামনের ডান পাটা আগে দেয়। দিয়ে একটু অপেক্ষা করে। তার পর ডান পাটাকে আরো একটু এগিয়ে নেয়। নিয়ে আবার একটু অপেক্ষা করে। তার পেছনের ডান পাটা তখন গর্তের কাছাকাছি, আর সামনের বা পা মাটিতে শক্ত, পেছনের বা পা, শূন্যে, আর একটু আগে। বুড়িয়াল যেন বাঘারুকে আর-একটু সময় দেয়। ডালগুলোকে আরো জোরে সেঁটে রেখে বাঘারু এবার তার শেষ সঙ্কেত দেয়, টররর-অ, টররর-অ। সঙ্কেত শেষ হতে না-হতেই বুড়িয়ালের সামনে ডান পা-টা যেন পিছলে পেরিয়ে যায় আর পেছনের ডান পাটা ডালগুলোকে ছুঁয়ে কি না ছুঁয়ে চলে যায়।
বাঘারু লাফিয়ে উঠে আসে। বুড়িয়াল দাঁড়িয়েছিল। তার পিঠের ওপর দুই হাত দিয়ে বাঘারু শরীরটাকে ঝোলাতেই সে চলতে শুরু করে দেয়। বাঘারু তার পর বসতে পারে। বুড়িয়াল যতটা সম্ভব ছুটতে শুরু করে। বাথানের বেশি দূর যাওয়ার কথা নয়। বাঘারু একবার তারস্বরে চিৎকার করে ওঠে, হে-এ-এ লোখা। তার চিৎকার শেষ হওয়ার আগেই বুড়িয়াল তার গলা আকাশে তুলে হকার দেয়-আ-আ-আঁক। জবাবে ভোতার ডাক শোনা যায়, কাছেই, বোধহয় বাক দুই নীচে। এখন ত জঙ্গলে নেমে গেছে। ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে নদীর বুকটাও মাঝে-মধ্যে দেখা যাচ্ছে। বাঘারু আকাশে তাকিয়ে দেখে, তার সামনে পশ্চিমের পাহাড়ের ওপরে সূর্যটা আর গোল নেই, চাঁদের নাখান খাওয়া গিরহন নাগি গেইল, গিরহন নাগি গেইল, টর বর-অ, টর বর-অ, বুড়িয়াল তার গতি বাড়ায়, যতটা সম্ভব।
সূর্যের দিকে তাকানোর ফলে বাঘারু চোখে অন্ধকার দেখে, কিছু দেখতে পায় না। চোখ বন্ধ করে ফেলে, আন্দাজে বুড়িয়ালের শিং দুটো খোঁজে, ধরতে। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই মনে হয় এই সময় শিং ধরলে বুড়িয়ালের নামার অসুবিধে হবে। বুড়িয়াল কানের ঝাঁপট মেরে বাঘারুকে আশ্বাস দিতে থাকে, আর তার দুলুনি বাড়ে।
চোখ বন্ধ রেখেই বাঘারু আ-আ-আঁ– ডাক শুনতে পায়। সে চোখ খুলে ফেলে। একটু অস্পষ্ট, কিন্তু দেখা যাচ্ছে। একটা মোষ ডাকছে। একটা? নাকি পর পর? লোখা? ভোখার ডাক নেই। তা হলে কি ওরাও সূর্যের গ্রহণ দেখে ফেলেছে? বাঘারু জানে সেটা অসম্ভব। আবার সেই আ-আ-আ ডাক। একার। ঐকিয়া (একা) কুন মহিষ ডাকিবার ধইচছে এ্যালায়? পড়ি গেইসে? বাঘারু সামনে দেখতে পায় তোখা দাঁড়িয়ে, গলা উঁচু করে খাড়া, কিন্তু লেজ নাড়ছে। ভয় পায় নি। কিন্তু, কিছু একটা ঘটিছে, ভোখা বোবা বনি গেইছে, তয়? তয়? হঠাৎ বাঘারুর সন্দেহ জায়ে, পোয়াতিটার বাচ্চা হওয়া ধরিল, নাকি? এ্যালায়?
.
০৮২.
বাথানে জন্ম
বকটা ঘুরেই বাঘারু দেখে যা ভেবেছে, তাই। সেই ভর-পোয়াতি মইষানি পেছনের দুই পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে আর তাকে মাঝখানে রেখে দুই পাশে অন্য মোষগুলো সারি দিয়ে। কয়েকটা মোষ হয়ত আগে নেমে গেছে। এখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে নদীর বুক, ব্রিজ, বাঘারুর সেই পাথর। আর দু-একটা বাক নামলেই তারা নদীতে নেমে যেতে পারত।
বুড়িয়ালের পিঠ থেকে লাফিয়ে নামতে-নামতে বাঘারু একবার দেখে নেয় বাইরে আলোর রঙ মরে এল কিনা। সূর্যে যে গ্রহণ লাগতে শুরু করেছে তা বাঘারু দেখেইছে। আলো মরে আসবে আরো পরে। ছায়া লম্বা হতে-হতে একেবারে কোথায় মিশে যাবে। কিন্তু এখনও শেয়াল বা মোরগ ডেকে ওঠে নি। কোনো রকমে কি ওটাকে আর-দুটো বাক ঠেলেঠুলে নেয়া যায় না? অন্তত নদী পর্যন্ত?
বাঘারু দৌড়ে মইষানিটার কাছে ছুটে যায়। সেটা ঘাড় ঘুরিয়ে আবার সেই একা-ডাক ডাকে। বাঘারু ওর গায়ে, গলায়, মুখে হাত বুলিয়ে পেছনে এসে দেখে, আ-আ-আ, খাইসে, খাইসে, বাছুরের মাথাখান দেখা যাছে, চাদিখান দেখা যাছে। বাঘারু দৌড়ে গিয়ে কিছু গাছগাছড়া ছিঁড়ে এনে তলায় ছড়িয়ে দেয়। বুড়িয়াল এগিয়ে এসে উঁচু থেকে তার সেই মস্ত গলাটা পশ্চিমের পাহাড়ের মাথার দিকে বাড়িয়ে থাকে–যেন পাথরের তৈরি। তার নীচে সেই মইষানি মাটিতে পেছনের পা দুটো ঠুকে আ-আ-আঁ করে আকাশজোড়া ডাক তোলে। বাঘারু তার সেই দুই হাতে মইষানির পা দুটো আরো ফাঁক করে দিয়ে, তার পেছনটা দুই হাতে দুই দিকে ঠেলে ধরে। সেই ফাঁকটা সম্পূর্ণ জুড়ে যায় বাছুরের ছোট গোল মাথায়। মইষানি আবার একটা ডাক দেয়; আঁ-আঁ-আঁ, আর তার সামনের পা দুটোতে ভর দিলে ঘুরে যেতে চায়। বাঘারুর জন্যে পারে না। ফাঁকটাকে আরো একটু বড় করে দিয়ে বাছুরের মাথাটা আরো একটু বেরোয়। কিন্তু এখন বাঘারু ছেড়ে দিলে মাথাটা আবার ভেতরে চলে যাবে। বাঘারু তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিলে বাছুরের বেরুবার পথটা আরো একটু ফাঁক করে দিতে চায়, যাতে, বাছুরের মাথাটা অন্তত এইটুকু বেরিয়ে আসে যে সে দুই হাতে সেটা ধরতে পারে। একবার ধরতে পারলে বাঘারু টেনে বের করে আনবে।
