বাঘারু সেই ওয়ালি পাড়া-টাকে এনেছে, বুড়া বলদ মোষ দুটোকে এনেছে আর তাগড়া মইষানি এনেছে একটা। বাঘারু দড়িটার একটা দিক শোয়ানো গাছের মাথায় বেশ খাজ বুঝে বাধে। আর-একটা দিক বেঁধে দেয়, দুটো মোষের বুকের নীচে, পায়ের ওপরে। বেশি দূর ত আর টানতে হবে না। একটু দূরেই লম্বা নালীর মধ্যে ফেলতে হবে। ওর পাশে নিয়ে ফেললেই লোকজন ঠেলে গড়িয়ে দেবে। এখানে ত আর জোয়াল নেই। বুকের ওখানে বেধে দিলেই, যেন গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এমন ভাবে টেনে নিয়ে যেতে পারবে। দুটো মোষের মাঝখানে গাছটাকে একটু উঁচু করে দিতে হয়, মাটি থেকে।
বাঘারু সেই পাড়াটার সঙ্গে একটা বুড়ার, আর মইষানিটার সঙ্গে আর-একটা বুড়ার জোড় করে দেয়। দুটো জোড়ের গলায় গাছটা বেঁধে দিয়ে সে টররর দিয়ে পেছনে দাঁড়ায়। ফরেস্টের জমির ওপর দিয়ে কোনো কিছু টেনে নেয়া অসুবিধে। উঁচু-নিচু, কাটাগাছের গোড়া, গর্ত, এই সবে আটকে যায়। বাঘারু এদের পেছনে-পেছনে থেকে একবার একটার বাধা সরিয়ে দেয়, আরেকবার আরেকটা আটকে গেলে ছাড়িয়ে দেয়।
এমন ঠেকে-ঠেকে গেলেও, দড়ির ফাঁসে ঝুলিয়ে যে-গাছ নিতে জনা ছ-আট মানুষের আধ ঘণ্টা-পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেগে যায়, বাঘারু তার জোড়ামোষে তা নিয়ে যায় অর্ধেক সময়ে, তাও আবার একসঙ্গে দুটো। ফলে, দুবারে চারটি গাছ সরানোর পরেই সমস্ত ঘটনাটা যেন বাঘারুর নেতৃত্বে ঘটছে এমনই দেখায়।
এতক্ষণ বাঘারু আর তার মোষ ছাড়া এই কাঠ-সরানো চলছিল কী করে?
২.৫ বাথানের প্রত্যাবর্তন
বাঘারু এখন তার পুরো বাথান নিয়ে ফরেস্টের চড়াই ছেড়ে নদীর বুকে নেমে আসছে অতি দ্রুত। বুড়িয়ালের পিঠে সে বাথানের প্রায় শেষে। হাঁটু মুড়ে বসে সে একবার ডাইনে, একবার বায়ে, আর-একবার সামনে; শুধু জিভ আর টাকরায় আওয়াজ করে যাচ্ছে–টররর-অ, টররর-অ, টর বর-অ। আর সেই আওয়াজের সঙ্গতিতে সমস্ত বাথান যেন একটা সৈন্যদলের মত সোজা চলে যাচ্ছে বনবাদাড় গাছগাছড়া ভেঙে, ঢাল বেয়ে। ওরা উঠেছিল পাহাড়ের ডান দিক বেয়ে। নামছে পাহাড়ের বা ঢাল দিয়ে। বুড়িয়াল বুঝে যায়, বাথানকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যেতে হবে। সে মাঝে-মাঝে গলাটা সোজা তুলে আকাশে আওয়াজ ছাড়ে-আঁ আঁ আঁ ক, আঁ আঁ আঁ ক! ভোখা, বুড়িয়ালের পাশে পাশে দুলে-দুলে ছুটে-ছুটে চলেছে। বাছুর চারটে মাঝে-মাঝে পেছিয়ে পড়ছে। প্রায় সব সময়ই আছে বাঘারু আর বুড়িয়ালের সামনে। আর, বাঘারু দুই হাত দুই দিকে তুলে বুড়িয়ালের পিঠের ওপর থেকে পুরো বাথানকে তাড়া দিচ্ছে, টররর-অ, টরর-অ।
ঝটত করি চল, ঝটত করি, গিরহন আসিছে, গিরহন, আকাশখান অন্ধকার হয়া যাবে, পাখির দল সঝা হইবার আগত ঘরত ফিরিবেন। বাঘা, হাতি, গণ্ডার আতির (রাত্রির) আগত বাহির হইবার ধরিবে, দিন ফুরিবার আগত বনত আতি নামি আসিবে, টররর-অ, টররর-অ।
বুড়িয়াল এগতে পারে না। সামনের মোষগুলো দাঁড়িয়ে গেছে। গলা উঁচু করে বুড়িয়াল দেখে, কী ব্যাপার। তার শিং ধরে বাঘারু উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়াতে হল বলে ভোখা ঘেউ-ঘেউ করে ডেকে ওঠে। কিন্তু তার পরই আবার পায়ে-পায়ে চলা শুরু হয়। গতিটা কমে যায়। বাঘারু বুড়িয়ালের পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে বাথানের মুখের দিকে দৌড়ায়। ভোখা সঙ্গে সঙ্গে তার পিছে ছোটে। বাথান একজোট হয়ে যাওয়ায় ভেতর দিয়ে চলার পথ বন্ধ। বাঘারুকে পাশ দিয়ে ছুটতে হয়।
বাথানের মুখ গিয়ে দেখে ঢালের যে-পাকটা দিয়ে বাথান ডাইনে ঘুরে এই ফরেস্ট আর তলায় নদীর বুকের মাঝখানের জঙ্গলটাতে ঢুকবে, সেখানে একটা বড় গর্ত হয়ে আছে। কিন্তু তাতে কোনো মোষ থেমে নেই। তারা পাশের সরু জায়গাটা দিয়ে সাবধানে পা ফেলে বায়ের মাটি পাথরের দেয়ালে গা ঘষে পেরিয়ে যাচ্ছে। সেই জন্যেই, যত জোরে নামছিল, তত জোরে আর নামতে পারে না। অনেকগুলো মোষ পার হয়ে গেছে। বাঘারু পেছন ফিরে একবার দেখে নেয় কতগুলো বাকি। কিন্তু যেগুলো পার হয়ে গেছে, সেগুলো যদি আলগা হয়ে যায়। আর এর মধ্যে গ্রহণের অন্ধকার শুরু হয়ে গেলে ওগুলো, ভয়ের চোটে এদিক-ওদিক হয়ে যাবে। গিরহনের ভয়, বড় ভয়। বাঘারু লোখাকে সামনের রাস্তাটায় আঙুল দেখিয়ে চেঁচায়, সিও সিও। ভোখা লাফিয়ে সেই গর্ত পেরিয়ে সামনে চলে যায়। ভোখাকে দেখিলে জানিবে বাঘারু আছে। বাঘারু গর্তটার দুদিকে পা দিয়ে দাঁড়ায়। তার পর যে মোষ পার হচ্ছে তার গা-টা একটু ঠেলে রাখে। তাতেই মোষগুলোর ভয় কেটে যায়–হয় বাঘারুর স্পর্শেই, আর নয়ত, ঐ গর্তের পাশে সামান্যতম সাহায্যেই ওদের পেরনোটা সহজ হয়ে যায়। ফলে, তাড়াতাড়িই পার হতে শুরু করে দেয়। পেছনে বুড়িয়ালের হকার শোনা যায়, আঁ আঁ আঁ ক। বাঘারু ঘাড় ঘুরিয়ে আওয়াজ দেয়, এই রো, অ-অ।
সেই পাড়া-টাকে বাঘারু আটকে দেয়। বাথানের মধ্যে থেকে এখন যদি কোনো গোলমাল পাকায়, সরু রাস্তায়? বরং ওটাকে তার সামনা-সামনি রাখা ভাল।
কিন্তু সেই পাড়া আর তার পরে বুড়িয়ালকে পার করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। পাড়াটা তাও যদিবা হেঁচড়ে চলে যেতে পারে–বাঘারু তাকে অন্য দিকের চড়াইটার সঙ্গে ঠেলে ধরে রাখলে, বুড়িয়াল পারে না। তার পেটটা দুদিকেই এত বড় যে ঐ গর্তের পাশ-ঘেঁষা তার পক্ষে অসম্ভব। বাঘারু একবার চেষ্টা করে দুই হাতে সে বুড়িয়ালের একটা দিক তুলে দিতে পারে কি না। কিন্তু বুড়িয়ালের ওজন পাহাড়ের চাইতেও বেশি।
