তাকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে ফরেস্ট গার্ডটাও আর দৌড়য় না। হাটে। কিছুটা হেঁটে এসে, সম্ভবত যখন সে বাঘারুকে সম্পূর্ণটা দেখতে পায়, তখন, আর হাটেও না। ওখানেই দাঁড়িয়ে হাত তুলে বাঘারুকে ডাকে।
যেখানে কাঠকাটা চলছিল সেখানকার লোকজন তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে। বাঘারু ফরেস্ট গার্ডের দিকে এগিয়ে যায়। ডায়নার এই জঙ্গলে আসার পর এমন একা-একা বাঘারুকে প্রায় কোনো সময়েই এত অচেনা মানুষের সামনে বিদেশীয়ার মত দাঁড়াতে হয় না। সঙ্গে ত তার বাথান থাকেই। সবাই ত তাকে দেখেই মইষ্যাল বলে চিনতে পারে। বাঘারুর নিজের অবাক লাগে যে এরা তাকে চিনতে পারছে না। মাত্র এই কটা দিনেই এই পরিচয় তার নিজের কাছে এত পরিচিত ঠেকে! বাঘারুর কাজের পরিচয়টাতেই সে নিজে এত অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে সেই পরিচয় ছাড়া এই একজনের সম্মুখীন হতেও তার সঙ্কোচ হয়?
বাঘারু যতই তার কাছে আসে, ফরেস্ট গার্ড ততই বাঘারুকে সম্পূর্ণ করে দেখে। আর, বাঘারু তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে, দেখার আর-কিছু বাকি থাকে না। ফরেস্ট গার্ড তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে, একটু পরে জিগগেস করে তুমি, এইঠে কোটত আসিলেন?
মোর বাথান আছে, ঐঠে।
বাথান! কার বাথান?
গয়ানাথ জোতদারের।
অ। কোটে এ্যালায় তোমার বাথান?
হু পাকে, বাঘারু হাত তুলে একটা নির্দেশ দেয়।
এইঠে কী করিছেন?
কিছু না।
বাথান ওইঠে। আপনি এইঠে। কিছু না?
না। ঐ পাকে শুনিলাম গাছ কাটিবার আওয়াজ তাই
তাই কী?
দেখিবার আইচছি, কায় কাটে, কী কাটে।
রাতিত কোটত থাকেন? এইঠে?
ডাইনাং নদীর চরত—
অয়। ঠিক আছে। গার্ডটি যেন আশ্বস্ত হয়, আজ তাড়াতাড়ি চলে যাবেন এইঠে।
চলি যাম? এ্যালায়?
ফরেস্ট গার্ডটি আকাশের দিকে তাকায়, তাড়াতাড়ি যাবেন, গিরহন (গ্রহণ) নাগিবে।
গিরহন? আজি? এ্যালায়?
হ্যাঁ। ধরো কেনে দুই দুপরের বাদে।
দুপুর ত হয়্যা গেইল না?
ফরেস্ট গার্ডটি আবার আকাশের দিকে তাকায়, না, এ্যালায়ও বাকি আছে।
না, মুই এ্যালায়ই যাছি। মোর নামিবার টাইম নাগিবে। গিরহন নাগিবে?
আজি?
ফরেস্ট গার্ডটির সঙ্গে বাঘারুর কথাবার্তা যখন চলছে তখন কাঠকাটার লোকজনের ভেতরে একজন এগিয়ে আসে। তার পোশাকআশাকে বোঝা যায় কাঠকাটার লোক সে নয়, তার লোকরাই কাঠ কাটছে–কনট্রাক্টার। সে কথাবার্তা শুনে গার্ডকে বলে, এর কাছে ত মোষ আছে।
হ্যাঁ। মোষের বাথান।
আমাদের গাছগুলো টেনে দিক না। পয়সা যা লাগে দেব। তা হলে, কাজটা তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। গার্ডটা এই কথা শুনে বাঘারুকে জিজ্ঞেস করে, কী? করিবু?
কী?
তোর মহিষ দুই-চারিখান নিগি আয়। এই গাছগিলান ঐঠে টানি দিবেন।
পাইসা পাবেন। পাইসা।
আপনি যে কহিলেন গিরহন নাগিবে। মোর ত বাথান নিগি নামি যাবার নাগিবে, ডাইনাং-এর চরত। নীচে।
আরে স্যালায় ত ইমরার এ্যানং তাড়াতাড়ি। ই মানষিলা গিরহনের আগত–বন ছাড়ি চলি যাবার চাহে। কাটা-গাছ গিলাকি ফেলি যাবে? এইঠে? কাঠচোরলা চুরি করি নি যাবে না? তুই কাঠচোর?
মুই কাঠচোর না হই। ত নিগি আসিম? মহিষ?
গার্ডটি এবার কনট্রাক্টারকে জিজ্ঞাসা করে, কী? আনিবে? কনট্রাক্টার বাঘারুকে জিজ্ঞাসা করে, কতদূরে তোমার মোষ?
ঐ ত হু পাকে, হু পাকে।
আনিবার পারিবু? ঝট করি?
এ্যালায়, যাম। নিগি আসিম। কটা নাগে বাবু আপনার?
আরে দু-চারটে আনলেই হবে। আমাদের আর বেশি গাছ ত বাকি নেই। টেনে ঐ দিকের নালীটাতে ফেলে দেবে, তার পর আমরা ঢাকাটাকা দিয়ে চলে যাব। কাল সকালেই ত আবার আসব। আজকের রাতটার জন্যেই একটু সাবধান হওয়া।
ও। এইঠে টানি ঐঠে ফেলিবার নাগিবে? ট্রাকত তুলিবার নাগিবে না? মুই আসিছু এইঠে, খাড়ান, বাঘারু যাবার উদ্যোগ করতেই ফরেস্ট গার্ডটি বলে, তুই থাকি যা না আজিকার রাতটা, এইঠে, বাথান নিয়ে, কাঠ পাহারা দিবু। পাইসা পাবু।
বাঘারুকে একটু চিন্তা করতে হয়। না, বাবু, মুই না পারো।
কেনে? পাইসা পাবু।
না বাবু। গিরহন নাগিবে। বনত মোর মোষগুলোর কী হয়, না-হয়।
কী আর হবে? থাকি যা, থাকি যা।
বাঘারুকে যেন প্রায় রাজিই হয়ে যেতে হয়। তখনই তার মনে পড়ে যায় সকালেই দুধের গাড়ি আসবে।
না বাবু। মুই থাকিবার না পারি। সকালত দুধের গাড়ি আসিবে। দুধ দুহি দিবার নাগিবে। মুই মোর মহিষ আনিছু। টানি দিম আপনার গাছ। খাড়ন। আনিছু। বাঘারু আর দাঁড়ায় না। ঘুরে তাড়াতাড়ি ছোটে তার বাথানের দিকে। এরা বাঘারুকে দেখতেই পায়, কেমন ছুটে সে প্রথমে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেটাও পেরিয়ে গিয়ে, আরো একটা জঙ্গলের পেছনে আড়াল হয়ে যায়। তার পরই ওরা বাঘারুর গলা শুনতে পায়–এই, ট র-এ টর-এ।
এই আওয়াজগুলো বারকয়েক নানা রকম হয়ে ওঠে, নামে, আবার ওঠে, আবার নামে। তার পর আর ওঠেই না। কিন্তু একটু পরেই দেখা যায় বাঘারু একটা মোষের ওপর বসে, আর তার পেছনে আরো তিনটি মোষ! বাঘারু একবার এসেছে ও একবার গেছে যে রাস্তা বানিয়ে, সেটা যেন তার কতই চেনা হয়ে গেছে। চার মোষ নিয়ে বাঘারু সেই চেনা রাস্তায় সব দলে চলে আসে। চলে আসে একেবারে কাঠকাটাইয়ের দলের মাঝখানে।
কাঠকাটাইয়ের দলের লোকসংখ্যা কম নয়। একদল কাটা গাছের ডালপালা সাফ করে। আর একদল সেই সাফ করা গাছ টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু চার-চারটি মোসহ বাঘারু এখানে এসে গেলে মনে হয় বাঘারুই যেন জায়গাটিকে ভরে ফেলল–এতক্ষণের লোকজনকে তুচ্ছ করে। বাবু, দড়ি নেন, দড়িবাঘারু মোষের পিঠ থেকে নেমে বলে। আর সবাই কাজ থামিয়ে বাঘারুর কাজ দেখতে শুরু করে।
