এত দূর থেকে ছুটে আসার ফলে তার অত বড় শরীরে যে-গতিবেগ তৈরি হয়ে যায়, তা একটুও শ্লথ হতে না দিয়ে বুড়িয়াল বাঘারুকে পিঠে নিয়ে সেই পাড়া আর মইষানির মাঝখানে ঢুকে যায়। বাঘারু চিৎকার করে চলে,তার পক্ষে যতটা জোরে সম্ভব, হে-ই, হে-এ-ই, হে-এ, হেট হেট, হৈ-ই। বাঘারু আর বুড়িয়াল পৌঁছে গেছে দেখে ভোখাও জোর পেয়ে প্রায় পাড়ার গলার তলা পর্যন্ত চলে যায়–ঘেউ-ঘেউ করতে করতে। একসঙ্গে এত দিক আক্রমণে পাড়াটা ওর শিং বাতাসে তুলে ঘাড়টা ঘুরিয়ে নেয়–মইষানিকে ছেড়ে দিয়ে।
বুড়িয়াল যে এই রকম দুই মোষের মাঝখানে ঢুকে যাবে, বাঘারু তা ভাকে নি। সে ভেবেছিল, গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বুড়িয়াল তাকে নামিয়ে দেবে। কিন্তু কাছাকাছি এসেই বুড়িয়াল যখন তার গতিবেগ বাড়িয়ে দেয়, বাঘারু আর তার পিঠ থেকে নামে না। বাঘারুও বোঝে, বুড়িয়াল এই চেহারায়, আর শিঙে, তার গায়ের জোরে ছুটে দুটোর মাঝখানে যদি পড়ে, তা হলে ঐ পাড়াটাকে প্রথমে পেছুতেই হবে। একবার পেছুলে আর এগনো যায় না। এত কিছু ভাবা সত্ত্বেও বুড়িয়ালের পিঠের ওপরে বাঘারু কিন্তু ডান শিং ধরে ডান দিকেই ঝুঁকে থাকে, যাতে, যদি ঐ পাড়া বুড়িয়ালকে আক্রমণই করে, বাঘারু ডাইনে লাফিয়ে পড়তে পারে।
পাড়াটা শিং উঁচিয়ে ঘাড় ঘোরাতেই ও বুড়িয়াল ওদের দু জনের মাঝখান দিয়ে পেরিয়ে যেতেই বাঘারু লাফিয়ে নীচে নামে। মাটিতে হাত বাড়িয়ে যে-ডালটা পায়, সেটাই কুড়িয়ে দুই হাতে তুলে, শালো বলে, সরাসরি সেই পাড়ার বা চোয়াল মারে। ডাল ভেঙে যায়। নিজের হাতের টুকরোটা ফেলে দিয়ে বাঘারু ছুটে আর-একটা ডাল তোলে। বাঘারুর ঐ হাতের পুরো একটা মার ঐ পাড়ার পক্ষেও সহ্য করা সম্ভব নয়। সে তার মুখটা আরো বায়েই ঘোরায়। ততক্ষণে বাঘারুর হাতের ডাল পুরো জোরে আছড়ে পড়ে কিন্তু চোয়ালটা তোলা ছিল বলে এবার একেবারে মুখের ওপরে। পাড়া দু পা পেছিয়ে গিয়েছিল, সামনের পা দুটো একটু উঁচু করে, গলা তুলে, মুখ বাঁচাতে। দ্বিতীয় মারটা খাওয়ার পর মুখ না নামিয়েই যেটুকু ঘুরতে পারে ঘুরে সে ছুট লাগায়। বাঘারু তার পেছন-পেছন কয়েক পা ছোটে, তার পর, শালো, যা কেনে, অরনার (বুনো মোষ) গুতা খাওয়ার তানে যা, বলে দাঁড়িয়ে পড়ে। তোখা সেই পাড়ার পেছনে-পেছনে ছুটতেই থাকে।
বাঘারু এইবার সেই মইষানিটার কাছে আসে। মইষানিটা এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। কোথাও জখম হয়েছে কিনা দেখতে বাঘারু শিং ধরে-ধরে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মুখটা দেখে, চোখ দুটো দেখে। তার পা ডাইনে বায়ে ঘুরিয়ে চোয়াল আর গলার সংযোগস্থলের নরম মাংসের জায়গাটা দেখে নেয়। মোষের শরীরের অন্য কোথাও লাগলে কিছু যায়-আসে না।
বাঘারুর হাতের ছোঁয়া পেয়েই মইষানিটার যেন আত্মাদ হয়ে যায়। সে তার গলাটা ক্রমেই উঁচুতে তুলতে থাকে, আস্তে-আস্তে। ছোট মইষানি। গলা অতটা বাড়ালে বাঘারুর মাথা ঘেঁয়। বাঘারু তার গলকম্বলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে, হয়, হয়।
কাছেপিঠের মোষগুলো বুঝে নেয় ব্যাপার মিটে গেছে। ততক্ষণে তারা কেউ-কেউ বসে পড়েছে, যেন এখানে অনেকক্ষণ থাকা যাবে। কেউ-কেউ দাঁড়িয়ে থাকে, চুপচাপ। কেউ-কেউ মাটিতে গন্ধ শোকে আর ঘাসে মুখ দেয়।
বাথান আবার বাথানের মত হয়ে গেছে।
বাঘারু একটু হেঁটে দেখার জন্য এগিয়ে যায়।
.
০৮০.
বাথান দিয়ে সমাজসেবা
আওয়াজ শুনে বাঘারু বুঝতে পারে, কোথাও খুব কাটাকুটি চলছে। ফরেস্টে আওয়াজ শুনে দিক ঠিক করা অসম্ভব। কিন্তু বাঘারু জানে, কাঠ কাটতে হলে বা দিকের বনটাতেই হবে। ঐখানে একটা রাস্তা আছে, ফরেস্টের তেভরের রাস্তা যেমন হয়, পাথর বেছানো, কিন্তু তার ওপর পাতা পড়ে-পড়ে নরম হয়ে আছে। ঐ রাস্তা দিয়ে ট্রাকগাড়ি ভেতর পর্যন্ত আসতে পারে। বাঘারু সেদিকেই একটু এগয়, দেখতে।
ফরেস্টের যেসব জায়গায় অনেক গাছ অনেক দিন ধরে কাটা হয়, সেখানে তলার জঙ্গল কেটে সাফ করে নেয় আগে। এই সব জায়গা বেশ অনেক দূর থেকে দেখা যায়। বাঘারু তেমনি দেখতে পায়, তার সামনের অনেকখানি জঙ্গল পেরিয়ে, অনেকগুলো তোক মিলে গাছ কাটছে। গাছ কাটছে না, কাটা-গাছের ডালপালা ছাঁটছে। হই-হাই আওয়াজ, কুড়ল চালানোর, এখান থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। বাঘারু ওখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই দেখে।
দাঁড়িয়ে থাকে বলেই দেখে, শুধু ডালপালা ছাঁটা হচ্ছে না, হাঁটার পর ঐরকম আস্ত গাছের গায়ে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাঘারু একটা গাছ একটুখানি টানতে দেখে। কী ভাবে টেনে নিয়ে যায়, সে আর বাঘারু নতুন করে কী দেখবে। ওদিকে কোথাও হয়ত ট্রাকগাড়িটা আছে।
কিন্তু অত জন লোক মিলে বাঘারুকে দেখছে। প্রথমে যে-যার মত দেখে নিয়ে, এখন বারেবারে ঘুরেফিরে দেখছে। দেখারই ত কথা। এমন বনে বাঘারুর মত একা মানুষ! বাঘারুর কোনো মোষ ত তার আশেপাশে নেই। থাকলে, ওরাও অত দূর থেকেই বুঝত, বাঘারু কে।
শেষ পর্যন্ত ওরা এত বেশি দেখতে থাকে বাঘারুকে যে বাঘারু আর দাঁড়ায় না। কিন্তু ফিরে আসার জন্যে ঘুরতেই ঐ-জায়গা থেকে হাঁকাহাঁকি শুরু হয়ে যায়, হে-এ-ই, এই, শুনো, এই, শুনো। ডাকটার মধ্যে এমন একটা তাড়া ছিল যে বাঘারুর মনে হয় দাঁড়িয়ে পড়াটা ঠিক নয়। বাঘারু একটু তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করতেই শোনে তার পেছনে কেউ ছুটে আসছে। বাঘারুও দৌড়বার আগে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ফেলে, খাকি পোশাকে, ফরেস্ট গার্ড। সে দাঁড়িয়ে পড়ে।
