এটা একবার মনে হওয়ার পর হাসি আর যেন থামতে চায় না বাঘারুর। শেয়াল ডাকার মত খ্যাক-খ্যাক করে হেসেই যায়। বাঘারু ত এমন কিছু বলতে পারে না, যা দেখতে পাচ্ছে না। বাঘারু ত এমন কিছু ভাবতে পারে না, যা সে দেখতে পাচ্ছে না। বাঘারু ত এমন কিছু ভাবতে পারে না যা সে তার শরীর দিয়ে করতে পারে না। তাই বাঘারুর এমন হাসি, এমন থামতে না-চাওয়া হাসি। কারণ, তখন ত সে দেখতে পাচ্ছে গয়া-দেউনিয়াকে, হুই ডাইনাং ব্রিজের উপর, এদিক চাহে, জঙ্গল, ঐ পাখে চাহে, নদী, হু-ই পাখে চাহে পাথর, হেই পাখে চাহে বালুবাড়ি। গয়া-জোতদার জানে এইঠে তার বাথান থাকে। কিন্তু ব্রিজঠে নামিবার পথ পায় না। ত খুঁজ কেনে, খুঁজ। ব্রিজের উপর, আস্তার উপর তোর বাথানখান খুঁজ।
এই দৃশ্যে বাঘারুর হাসি আর থামতে চায় না যে বাথানের সঙ্গে বাঘারু কেমন ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর গয়ানাথ তার নিজের জঙ্গলবাড়ি আর বাথানবাড়ি আর বাঘারু মাইষ্যালক খুঁজি পায় না, খুঁজি পায় না।
খুঁজু কেনে, খুঁজ, খুঁজি-খুঁজি দেখ, কোটত গেইল তোর মাইষ্যাল আর বাথান, বাঘারু দেখে তারা তখন চালতা বনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, আরে রে রে, রররররর আওয়াজ তুলতে-তুলতে বাঘারু উঠে বসে। বুড়িয়ালের পিঠে পা দু-দিকে ঝুলিয়ে বসা যায় না, পেটটা এত চওড়া। বাঘারু মোষের উল্টোদিকে মুখ করে, তাই তাকে বা পা তুলে নিতে হয়। ততক্ষণে বুড়িয়াল থেমে গেছে। বাঘারু বুড়িয়ালের ওপর উঠে দাঁড়ায়। আর পাকা চালতা খোঁজে। ওপরের ডাল ধরে, টর ররর আওয়াজ দিতেই বুড়িয়াল খুব ধীরে হাঁটে। বাঘারু তিন-চারটি চালতা পেড়ে, বুড়িয়ালের পিঠে এবার মুখ সোজা করে বসে, টর দিতেই বুড়িয়াল আবার চলতে শুরু করে। হাত বাড়িয়ে বুড়িয়ালের অন শিংটার আগায় মেরে বাঘারু চালতাটা ফুটো করে নেয়, তার পর হাত দিয়ে ছেলে। পাকা চালতার গন্ধে তার জিভ জলে ভিজে যায়। ডান পা মুড়ে রাখায় মোষের পিঠে যে ফাঁকাটা তৈরি হয় তার ভেতরে বাকি চালতাগুলো রেখে বাঘারু দুই হাতে পাকা চালতা তার মুখগহ্বরে ঠেসে ধরে আর সেই রসে মুখ ভরে যায়। সেই স্বাদে ও গন্ধে হঠাৎই বাঘারুর মনে পড়ে যায় পাকা চালতা বনে হাতির পাল আসে। সে। একবার চোখ তুলে তাকায় এদিক-ওদিক।
.
০৭৯.
বাথানে গৃহযুদ্ধ
বাঘারু তার গলাটা সোজা করে সেই পাখির ডাকটা ওঠে আচমকা-অ-অ-অ-অক, ক-অ-অক। ডাকটার সবই হয়, কিন্তু বাঘারুর নিজেরই মনে হয়, কেউ.একজন নকল করে ডাকছে। হয়ত বাঘারু নিজেই অমন ডাকছে বলে তার তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু বাঘারু কি আর ঐ পাখিটার মত কাপিকাঁপ উঠিছে, শরীরের গরমত? তবে বাঘারুর ডাকে শরীরের সেই কাঁপন আসবে কোত্থেকে। বাঘারু আরো একবার সেই পাখিটার ডাক ডাকে–ক-অ-অ-অক, ক-অ-অক। শেষের কৃ-টা যেন শোনাই যায় না, এমনই গভীর খাদে নেমে যায়। ঐখানটাতেই মনে হয়, পাখিটার শরীর কাপি কাঁপ উঠিছে। কিন্তু বাঘারু একবার দেখতে পাবে না, পাখিটাকে, একবার দেখতে পাবে না?
হে-এ-ই, হে-ই, হে, হে, হে-ই, বলতে বলতে বাঘারু সোজা হয়ে বসে আর বুড়িয়ালের পেটে গোড়ালি দিয়ে খোঁচা মারে। বুড়িয়াল হনহন করে চলতে শুরু করে আর বাঘারু দুলে-দুলে ওঠে। হে-এই, হে-ই, হে-হে, বাঘারু বুড়িয়ালের পেটে গোড়ালি দিয়ে আরো এক খোঁচা মারে, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, সেই ওয়ালি পাড়া (ফাঁড়) সেই ভর-পোয়াতি মইষানিকে ঐ দিকের জঙ্গলটাতে এমন ছুঁসাচ্ছে যে মইষানিটা পড়ে যাবে, এখুনি, আর, পড়ি গেলে ত ঐটা আরো খতম করিবে। হে-ই ভোখা, ভোখা, বাঘারু ততক্ষণে বুড়িয়ালের দুই শিং ধরে উঠে দাঁড়িয়েছে। বুড়িয়ালের পিঠে খাড়া বাঘারুর মাথায় নিচু ডালপালা দুটো-একটা লাগছে। বাঘারু একবার ডান হাতে, একবার বা হাতে সেগুলো, সরিয়ে-সরিয়ে দিচ্ছে। কখনো শিংটা ধরছে। কখনো ধরছে না। ভোখা বহু সামনে কোথাও ছিল। বাঘারুর ডাক শুনে ছুটে এদিকে আসতে-আসতেই তার নজরে পড়ে যায় সেই পোয়াতি মইষানিকে ওয়ালি পাড়াটা জঙ্গলের ভেতর এমন উঁসিয়ে তাড়া করছে যে মইষানিটা মাটিতে পড়ে গেল আর-কি। বাঘারু দূর থেকেই ভোখাকে চিৎকার করে বলে, সিও, সিও। ভোখা ঐ দৌড়ের মধ্যে মুহূর্তে থেমে যায়। আর তার পরই তার বয়ে বেঁকে, ঘুরে, একটু পেছনে, সেই ওয়ালি পাড়াটার দিকে ধেয়ে যায়। জায়গাটায় পৌঁছে লোখা প্রথমে একই বেগে ওয়ালি আর মইষানির মাঝখানে ঢুকে যায় চিৎকার করতেকরতে। কিন্তু ওয়ালি তার শিং নাড়া দিতেই মইষানির পেটের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে উল্টো দিকে গিয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ার মত ভঙ্গি করে ও চিৎকার করে পাড়াটাকে ঠেকাতে চায়। পাড়াটাকে যে, ভোখার দিকে দুবার শিং নামাতে হয় তাতেই মইনি নিজের পায়ে সোজা হয়ে একটু সরে যাওয়ার সময় পায়।
ততক্ষণে পিঠে বাঘারুকে নিয়ে বুড়িয়ালও অনেকখানি এগিয়ে এসে পড়েছে। বনের ভেতর কোনো-একটা পথ দিয়ে ত আর পুরো বাথানটা যাচ্ছিল না। একটা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এদিক-ওদিক ঘুরছিল, খাচ্ছিল। তাই বাঘারুর চোখে যখন পড়ে ঐ পাড়াখান ঐ মইষানিকে নিয়ে কী শুরু করেছে তখন সেদিকে ছুটে যেতে ও একটা জায়গায় পৌঁছতেও ত তার সময় লাগে।
বাঘারুর চিৎকার, ভোখার ছোটাছুটি ও চিৎকার, আর শেষে বাঘারুকে নিয়ে বুড়িয়ালের ঐ ছোটায়, কাছাকাছির সব মোষই ঘাড় তুলে তাকায়। যে-মোষগুলো দূরে বা আড়ালে চলে গেছে, দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু শুনতে পেয়েছে, সেগুলোও দূর থেকে আ-আ-আঁক আ-আ-আক ডাকতে শুরু করে দিয়েছে। ফলে বুড়িয়ালের পিঠে বাঘারু সেখানে পৌঁছুবার আগেই ঐ জায়গাটাতে একটা চেঁচামেচি হৈ-হল্লা শুরু হয়ে যায়। বুড়িয়াল তার কর্তব্য অনেক আগেই বুঝে যায়। আর সে কর্তব্য শুধু তার এতদিনের অভিজ্ঞতা আর শক্তির জোরেই ঠিক করে তা নয়। তার চওড়া পিঠে যেসওয়ার দুই শিঙের মাঝখানে শালগাছের মত খাড়া, তার সাহস, শরীর ও শক্তির জোরেও সাব্যস্ত হয়। বুড়িয়ালের এত চওড়া পিঠ, এমন খাড়া শিং আর এই চিতনো বুক এমন সওয়ার তার যৌবনে পায় নি। তার চারপাশের দুনিয়ায় এই সাহস, শরীর ও শক্তি মেপে মেপেই ত পশুকে তার জন্ম থেকে স্বেচ্ছামৃত্যুর বার্ধক্যে পৌঁছুতে হয়।
