এই ওয়ালি পাড়া এই কুমারী পাড়া এই অরনা, এই দোমাচা, সব গয়ানাথের। যে-মোষ এই, বাথানে, যে-মোষ ঐ হাটে, যে-মোষ গোয়ালে, সব গয়ানাথের।
যায়লার জন্ম হইছে, যায়লার জন্ম হয় নাই, যায়লা জম্মিবে, যায়লা মরিবে, সব গয়ানাথের।
.
০৭৮.
বাঘারুবাড়ি
–সগায় গয়ানাথের। এই ডায়নার জঙ্গলখান গয়ানাথের। হু-ই আপলাদের জঙ্গলখান গয়ানাথের। এই ডায়না নদীখান গয়ানাথের। হু-ই তিস্তা নদীখান গয়ানাথের। ঐঠে জমিগিলান গয়ানাথের। এইঠে জঙ্গলখান গয়ানাথের। এই বুড়িয়াল গয়ানাথের, দুধিয়াল গয়ানাথের, পোয়াতিখান গয়ানাথের। এই বাঘারু মইষ্যালখান গয়ানাথের
বাঘারু আকাশময় ফরেস্টের দিকে তাকিয়ে ভাবে। বুড়িয়ালের পিঠের ওপরে চিৎপাত শুয়ে থাকে–দুটো পা বুড়িয়ালের পেট দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে নীচে দোলে আর এই ফরেস্টের পাতাগুলোর, মাথাগুলোর নানা নকশা চোখের সামনে সামনে বদলে বদলে যায়, পাতাগুলোর ভেতর দিয়ে বহুবহু। ওপরে ছিটিয়াল আকাশ দেখা যায় বাঘারু গাছের পাতার দিকে তাকিয়ে বুঝে যায়, তারা সেই পোরালি বাড়ির (পোড়া বন) দক্ষিণ দিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি বাঘারু ডাইনে তাকায়, সেই পোড়া গাছগুলোর লাইন দেখতে পাবে। তার ওদিকে ডাইনাং কি বাইনাং-এর ছড়া (শুকনো নদীখাত)।
কুনোবার বানায় জল উঠি আসি ঐঠে গাছগিলানক পুড়ি দিছে হয়ত। জলত ক্ষার আছিল। সেই জলত তামান বনখান মাটিখোলা হয়্যা গেইসে। তার বাদে ফরেস্টের মানষিলা অগুন লাগি পুড়ি দিছে। কেনে? না, ঐঠে আর নতুন মাটি না-পড়িলে নতুন জঙ্গল গজাবে না। তা পুড়ি দাও। যেইলা বন মাটির আগুন পুড়ি যায়, উমরাক আগুন লাগি পুড়ি দাও। তাই ঐঠে পোরালি বাড়ি
কিন্তু এই জায়গাটা ত ভরভরন্ত বন, এই জায়গাটা, যেখানে মোষের পিঠে চিৎপাত হয়ে বাঘারু আকাশের বন দেখে মাটির বনের হদিশ পায়।
গয়ানাথ মোক এইঠে পাঠাছে। বাথান করিবার। মুই আধি চাহ নাই। মোক বাথান দিছে। এইঠে মোক কায়ও খুঁজি পাবেন না। মুইও কাক পাম না। মুই এইঠে আগত আসি নাই রো। মুই এইঠেকার বন চিনি নাই রো। গয়ানাথ মোক এইঠে পাঠাছে। মোর অচিনা জায়গাটাত্ পাঠাছে। মোক উদাস করিবার তানে পাঠাছে–।
বুড়িয়াল বা দিকে একটা নালীর মধ্যে সামনের বা পা দিয়ে ফেলায় বেঁকে যায়। বাঘারু নড়ে ওঠে, কিন্তু উঠে বসে না। সে জানে, হেঁটে গেলেও এমন হেঁচট সে খেতে পারত। বুড়িয়াল জানে, বাঘারু তার পিঠে উঠে বাথানে ঘোরে, এটাই বুড়িয়ালের সব চেয়ে বড় কথা। তাই বুড়িয়াল ঠিক সামলে নেবে।
একটু দাঁড়িয়ে পড়ে বুড়িয়াল। পেছনে বোধহয় একটা ছোেট মোষ ছিল। সেটা যখন পাশ দিয়ে যায় বাঘারুর পায়ে ঘষা লাগে। বাঘারু বা হাতটা বাড়িয়ে মোষটাকে ছুঁতে চায়। কিন্তু পারে না।
ততক্ষণে বুড়িয়াল পেছনের পা দুটো সরিয়ে এনে, সামনের বা পাটাকে তুলে এনে আবার সমান হয়েছে। আকাশজোড়া বনের দিকে তাকিয়ে বাঘারুর নিজেকে নিয়ে এমন কিছু একটা কথা মনে আসে, যার ভাষা তার জানা নেই। তবু তাকে এরকম ভাবতে হয়, এই বুড়িয়ালটা গয়ানাথের। এই বাঘারুখান গয়ানাথের! এই জঙ্গলখান গয়ানাথের। বুড়িয়ালের পিঠত বাঘারু শুই থাকে। গাছ দেখে। আকাশ দেখে। আর দোলা খায়। দোলা। বুড়িয়ালের নাখান এ্যানং চওড়াকিয়া পিঠ আর কার আছে? কায়রো না। কায়রো না। বাঘারু আকাশের দিকে তাকিয়ে বনের গাছগুলো দেখে আর চেনে, এই ঠে কোশল-বাড়ি (হরিতকি গাছের জঙ্গল) শুরু হয়্যা গেইল। তামান বনত এইঠে শুধু, ধর কেনে পঁচিশ-তিরিশখান কোশল গাছ আছে। আর কোটত নাই। কোনামারা পাতাখান, আর গুলটিমারা উঁটখান। পাতা আর ভঁটা সেইঠে মিলে এইঠে একখান ছোট গোল নাখান গুলটি–
বাঘারু ত নীচ থেকে পাতাগুলো দেখছে, পাতার তলাগুলো, ক্যানং লোম-লোম হয়্যা আছে।
বাঘারু জানে সে যদি নীচে নেমে খোঁজে এত কোশল পাবে যে রাখার জায়গা খুঁজে পাবে না। শহরে নিয়ে গেলে কবরেজের দোকানে বিক্রি হয়। হাটে নিয়ে বসলেও বিক্রি হয়-খয়েরি রঙ বানাতে। কিন্তু বাঘারুর ত তার দরকার নেই। বাঘারু এই জায়গাটার নাম দিয়েছে কোশলবাড়ি।
হেঃ গয়ানাথ, মোক এইঠে পাঠাছে অচিনা দেশত্। আর মুই এইঠে একখান বাড়ি বানি নিছু। বাঘারুবাড়ি। কোটত যাছেন? না, কোশলবাড়ি। কুন কোশলবাড়ি? না, ঐ পোরালিবাড়িখানের দক্ষিণে আর হুই যে বড় গর্জালি বাড়ি (বর্ষার ঘাসজঙ্গল), ঐটার পচ্চিম পাখত–নদীর নাম ডাইনাং. থানার নাম নাগরাকাটা, গ্রামের নাম, বাঘারুবাড়ি।
বাঘারু আপনমনে খিক খিক করে হাসে। আর হাসির ফুর্তিতে ডান গোড়ালি দিয়ে বুড়িয়ালের পেটে মারে খোঁচা। আর বুড়িয়াল তার জবাবে ওর লেজ দিয়ে সেই পায়েই মারে ঝাঁপট।
শালো গয়ানাথক গিয়া কহিবু, হে দেউনিয়া, তোমার বাথানখান আছে, ধরো কেনে–ডাইনাং নদীর ডাইনের যে-ঘাসবন, তার পচ্চিম পাশের পাহাড়ের গা দিয়া উঠি, ডাইনে ঘুরত যাবেন। তার বাদে দেখিবেন কনেক-আধেক পাতলা-পাতলা জঙ্গল, তার বাদে বাঘারুবাড়ির পাহাড়। তার মধ্যে কোশলবাড়ি, তার বাদে।
বাঘারু এবার হেসে উঠে বুড়িয়ালের ওপর পিঠ নাচিয়ে ফেলে প্রায়। গয়ানাথের মুখটা তার চোখের সামনে ভাসে। এই ফরেস্টটা গয়ানাথের, বাথানটা গয়ানাথের, বাঘারু গয়ানাথের। কিন্তু গয়ানাথ যদি এখন এই ফরেস্টে, এই বাথানে, এই বাঘারুকে খুঁজে নিতে চায়? খ্যাক খ্যাক করে কোমর নাচিয়ে এমন হাসতে হয় বাঘারুকে! শালো, কোটত খুঁজিবে মোর দেউনিয়া, মোক? আর এই বাথানক?
