-কুনো মইষানির প্যাটত ও বাচ্চা দিবার পারে না, তবু বাথানে থাকে। এমন বাতিল ও বুড়ো মোষ দেখলে মনে হয় বাথানটা যেন এই ফরেস্টের গাছগুলোর মতই পুরনো। ফরেস্টের ভেতরে যেমন বুড়ো জন্তুও থাকে, চ্যাংড়া জন্তুও থাকে, বাথানেও তেমনি। এটাও ত কিনতেই হয়েছে দেউনিয়াকে। এই সব মোষের দাম কম। কিন্তু বা খানে রাখতে হয়। কোনো-কোনো সময় ত কাজেও লাগে। যদি ফরেস্টের মধ্যেই কোনো বড় শালগাছ পড়ে থাকে–দড়ি বেঁধে এই সব মোষের গলায় বেঁধে দিলে সেটা টেনে রাস্তার কাছে নিয়ে যায়। আর, একটা শালগাছ যদি বেচে দেয়া যায়, তা হলে বাথানের দুধবেচার আর দরকার নেই। এখানে, এই ডায়না ফরেস্টে তার সুবিধে নেই। পহাড়ি জায়গায় গাছ টেনে নেয়া মুশকিল। টেনে নিয়ে গেলেও রাস্তার ধারে কোন ট্রাকে তুলবে? এখানে আর সারা দিনে কটা ট্রাক যায়? সে-সব সুবিধে লাটাগুড়ি-ওদলাবাড়ির দিকে। কিন্তু গয়ানাথের এই বাথান যে আগামী বছরেও এখানেই থাকবে, তা কে বলতে পারে? বা, তেমন হলে ত এই বুড়ো মোষটাকেই গয়ানাথ লাটাগুড়ি ওদলাবাড়ির কাছে নিয়ে যেতে পারে। সেখানে একটা চোরাই শালগাছ রাস্তার পাশে ফেলে রাখলে বেচতে আর কতক্ষণ লাগে? তাই বাথানে এই দু-দুটো বুড়ো মোষকায়ও উমরার বাচ্চা না-হয়, উমরায় সগার বুড়া বাপ।
বাছুর চারটে ত আছেই–নইলে বাট চেটে দুধ আসবে কোত্থেকে। এ চারটে বাছুরের কোনোটাই হয়ত এ বাথানের নয়। হয়ত বাছুরও দেউনিয়া কিনে এনেছে। বা, হয়ত বাড়িতে তার যে-মোষগুলো আছে তাদেরই বাছুর এই কটি। এখন বাথানে পাঠিয়েছে। বাথানে মোষ তাড়াতাড়ি বাড়ে। বাথানে বাচ্চা হলে দেউনিয়া নিয়ে যায়। বেশি বাছুর রাখার চাইতে বেচে দেওয়ায় লাভ বেশি। শুধু নিজের বাথানটা যাতে ভরে ওঠে, ভরা থাকে, তার জন্যে যতগুলো বাছুর রাখার, রেখে, বাকিগুলো বেচে দেয়। –এই বাছুর গিলান কায়ও বাথানের বাছুর না-হয়, কিন্তু সবগুলা মইষানির এই চারিটাই বাছুর, এই চারিটাই।
দুধিয়াল মইষানিগিলাই ত বাথানের আসল জিনিশ। পুরা বাথানখানই ত উমরার তানে আছে। বাঘারুও ত উমরার তানে আছে। যত খিলায়, দুধ হয় তত ভাল। কিন্তু দুধ হওয়ার ভেতরেও ত একটা নিয়ম তৈরি করতে হয়। সবগুলো মইষানি যদি একসঙ্গে দুধ দেয়, তা হলে দুধ বন্ধও ত হবে একসঙ্গে। তাই সবার একসঙ্গে বাচ্চা হওয়া চলে না। কিন্তু যেগুলো দুধ দিচ্ছে, তাদের চালু রাখাটাই বাথানের প্রধান কাজ। তেমন-তেমনি বিপদ হলে ত সব মোষ ছেড়ে ঐ কটি মোষকেই প্রথম বাঁচাতে হবে বাঘারুকে। বাথানের সব মোষই দুধিয়াল না, কিন্তু দুধিয়ালরাই বাথানের সব।
আজি না-হয় দুধিয়ালক দিয়া চালাছ, কালি কী হবে? কী হবা পারে? কাল কী হবে? বাথান ত বছরের পর বছর থাকবে, বছরের পর বছর দুধ দেবে। তোমার ত শুধু এখনকার, এই মাসের, বা এই বছরের হিশেব করলে চলবে না। দুধটা ত কোনো দুধিয়ালের একার না। দুধটা ত পুরা বাথানের। তাই যতগুলো দুধিয়াল আছে, ততগুলো, বা তার বেশিই আছে, এমন মাদিমোষ, যাদের প্রথম বাছুর এখনো হয় নি। সেই ডবকানি মোষগুলো বাথানে আছেই বাথান চালু রাখার একমাত্র উপায় হিশেবে। এ সংখ্যা ত প্রায় সব সময়ই হিশেবে থাকে কটা মোষ গাভিন হল, কটা আরো হবে, তাদের বাছুর হবার দিন কবে, কবে থেকে দুধ দেবে, তার ভেতর কটার দুধ বন্ধ হবে, পরের বছর আবার কটা গাভিন হবে।
এই মোষগুলোকে গাভিন করবার জন্যে সঙ্গে আছে একটা ওয়ালি পাড়া। –সে শালোর ত আরকুনো কাম নাই, ঘাস খায় আর ঝিমায়, ঝিমায় আর ঘাস খায়। চলিবার বলিলে, ঘুমি-ঘুমি চলে। আর য্যালায় জাগিল অমনি উমরা গিয়া একখান মইষানির পাছত দুইখান পাও তুলি দিল। শালোর ঐ তিনখানই কাম-খাওয়া, ঘুম আর–। আর বাঘারুকে সাবধান থাকতে হয় ঐ একটি ব্যাপারেই। সে জানে, এই বাথান কী ভাবে বাড়তে পারে–সংখ্যায় আর দুধে। আর সেই অনুযায়ী ওয়ালি পাড়াকে চালাতে হয়, কখন কার পেটে বাচ্চা বানাবে।
কিন্তু সাবধানতার আর-একটি প্রধান কারণও আছে। বাথানে ওয়ালি পাড়া একটার বেশি রাখা যায় না। কিন্তু এই ফরেস্টের কাছাকাছি কোথাও অন্য কোনো বাথান থাকতে পারে। তাদের ওয়ালি পাড়া এই দলে এসে ভিড়তে পারে। তার পর একটা-দুটো মাদি-মোষকে ভাগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। বা, কাছাকাছি কোথাও যদি কোনো একোই (একা) খুটা অরনা (বুনো) থাকে, সে ত এই বাথানের মইষানিদের ভাগিয়ে নিয়ে নিজের দল বানাতে পারে। বাথানে মোষ-মইষানি একসঙ্গে থাকে–একা থাকতে ভয় পায় বলে। কিন্তু সেই সাহসটা যদি অন্য কোনো মোষ তাকে জোগায় তা হলে তার সঙ্গেও চলে যেতে পারে। মহিষ যদি বাথান ছাড়ি পালবার চাহে, কুনো বাথানদারের কুনো খ্যামতা নাই উমরাক ঠেকাবার পারে। সেই জন্যেই সতর্ক নজর রাখতে হয় কোনো মইষানির শরীর যদি গরম খায়, সে গরম যেন নষ্ট না হয়।
আবার তার সঙ্গে-সঙ্গে একটা লোভও ত থাকে। তেমন গরমের সময় কোনো মইষানি যদি কোনো অরনার (বুনো মোষ) সঙ্গে ভাব করে, তা হলে তার পেটে দোমাচা বাচ্চা হয়–তার গায়ের জোর বেশি, দুধ বেশি। বাথানের মইষানি বাথানেই বাধা থাক, কিন্তু অরনার বাচ্চা পেটে ধরুক।
এই ত বাথান–কায়ও কারো না। সগায় সুগার। যার একোটাও বাচ্চা নাই, সেইলা সগার মাও। যে-বাছুর গিলার একোটার মা নাই, সেইলা সগার বাছুর। যে-মইষানির এ্যালায়ও বাছুর নাই, স্যায়। বুনাক ধরিবে কিন্তু বাথানও রাখিবে। আর এ-সব কিছুই গয়ানাথের।
