দুধ নিয়ে ট্রাকটা সোজা চলে যায়। ড্রাইভার আর সেই লোকটা হাত বাড়িয়ে বাঘারুকে বিদায় জানায়। ট্রাকের পেছনে ডালার ওপরে সেই ক্লিনার ছেলেটা বসে। তার দিকে তাকিয়ে ঘাড় উঁচু করে ঘেউ-ঘেউ করতে করতে ভোখা ভুকতে-ভুকতে যায়। ছেলেটির লাল রুমাল এখন তার দাতে চেপে ধরা। সে ভোখার ডাক শুনতেই পায় না যেন, কেমন উদাসীন মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তোখা, ডায়না ব্রিজ, এই মোষের পাল, বাঘারু ফরেস্ট ও পাহাড় থেকে সোজা, যেদিকে ট্রাক চলেছে, সেই দিকে। এই সকালের আলোয় তার চোখে এখন মধ্যরাত্রির গোপন হত্যা লেগে গেল?
ট্রাকটার চলে যাওয়া বাঘারু আর মোষগুলো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখে। বেশ অনেকক্ষণ দেখা যায়, এরোপ্লেনের মত ছোট হয়ে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত। তার পরেও আওয়াজটা শোনা যায়। এদিকে পাহাড়, বন, নদী, চাবাগান। সুতরাং এই ছোট ট্রাকের এত আওয়াজ এই সব নানা জায়গার ওপর দিয়ে, ধাক্কা খেয়ে-খেয়ে গড়িয়ে, প্রতিধ্বনিত হয়, চার পাশের আরো নানা আওয়াজের সঙ্গে মিশে-মিশে যায়।
সারা দিনের মধ্যে এই কাজটা সব চেয়ে দরকারি। আর সারাদিনের ভেতর এই একবারই ত এতগুলো লোকের মুখ দেখতে পায় বাঘারু। বাঘারু ছাড়া অন্য লোকের মুখ দেখতে পায় এই এতগুলো মোষ। তাই, তারা চলে গেলে কিছুক্ষণের জন্যে এমন একটা ভাব আসে যে আবার আগামীকাল সকালে এই কাজটা করতে হবে। কিন্তু সে ভাবটা এতই কম সময়ের জন্যে আসে যে আওয়াজটা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মিলিয়ে যায়।
বাঘারু ব্রিজটার রেলিঙের পাশে বাধানো উঁচু জায়গাটায় বসে। সে ত এই কাল কুচকুচে বাঁধানো রাস্তা আর শাদা ফটফটে বাধানো ব্রিজে দিনে একবারই আসে। তাই তার মনে হয়, যেন অনেক দূরে এসেছে।
এই যে বা থেকে ডাইনে রাস্তাটা এত পরিষ্কার চলে গেছে বনটাকে দুই ভাগ করে, তাতেই কেমন গোলমাল লাগে। যেন কোনো একটা দিক আটকা পড়ে গিয়েছিল, এই রাস্তাটা সেই দিকটা খুলে দিয়েছে। যদিও এই রাস্তা দিয়ে তাকিয়েও দিগন্ত দেখা যায় না, তবু বাঘারু বোঝে এই রাস্তার দু পাশে দুটো দিগন্ত আছে।
বাঘারু যেখানে আছে ডায়নার সেই বনে দিক বা দিগন্ত নেই। এক আকাশ আছে, আর মাটি আছে। বাঘারু যে এসব খুব ভাল মত বোঝে তা নয়। কিন্তু এই ব্রিজেরই তলায়, বা সামনের ফরেস্টে, বা পেছনের চরে, চব্বিশ ঘণ্টা থাকা সত্ত্বেও সকালে এই কিছুক্ষণের জন্যে এই রাস্তায় আর ব্রিজে এসে বহু, দূরে কোথাও এসেছে বলে তার মনে হয়। যা কিছু আমাদের অভ্যাসের বাইরে তাই ত দূর!
.
০৭৭.
বাথান : কায়ও কারো না, সগায় সগার
বাঘারু এখন বাথান নিয়ে ডায়না ফরেস্টের ভেতর।
সেই বুড়িয়ালের ওপর বাঘারু শুয়ে। বুড়িয়াল দুলে-দুলে চলে। আর বুড়িয়ালের পিঠে বাঘারুও দোলে। দুলতে-দুলতে বাঘারু ফরেস্টটাকে উল্টো দিক থেকে দেখে–যেমনটা এমনিতে দেখা যায় না। যেন, এই গাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে যে আকাশটা ছিটিয়াল দেখা যায়, সেই আকাশটাতে গাছগুলোর পাতা-ডাল পোতা আর শেকড়কাণ্ড এই সব ওপর দিকে তলা। বাঘারু ত মাটির ওপরের জঙ্গলটা দেখতে পায় না। মাথার ওপরের গাছের পাতার গোল ছাউনি অনেক ওপরে। মাঝখানে নানা মাপের নানা গাছের পাতা ছড়ানো আছে বটে কিন্তু কোনো সময়েই তা মাটির জঙ্গলের মত ঘন নয়। বাথান নিয়ে বাঘারুর বেলা এমনই অলস কাটে এই ফরেস্টের ভেতর, যে সে ফরেস্টটাকেও সোজা দেখে না।
বুড়িয়াল একটা ছোট হাতি-সাইজের মোষ বুড়ি কাছার পাড়ি (বিরাট, বুনোটে, স্ত্রী মোয)। ওর আর বাচ্চা হবে না। দুধ দেয় না। এমনি কোনো কাজে আসে না। কিন্তু বাথানে এমন একটা পাড়ি না থাকলে, সে বাথান ত বাথানই নয়। টানা খাড়া শিং। ফরেস্টের ভেতর যখন চলে নিচু লতা-পাতা, ডালপালা সেই শিঙে লেগে যায়। শিং দুটো তুলে সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, ছোট সাইজের কোনো বাঘকে গুঁতিয়ে দুই শিঙে গেঁথে ঘুরিয়ে ফেলে দিতে পারে। গায়ের নোম লালচে। দুই চোখের মাঝখানে এতটাই জায়গা যেন ডায়না নদী বয়ে যেতে পারে। পুরোপুরি লম্বা হওয়ার আগেই মুখটা থেতলে গেছে। একবার হাঁ করে জিভ নাড়লে কাঠাখানেক জঙ্গল সাফ করে দেবে। কপালের দু পাশে চোখ দুটো নাক থেকে এত তফাতে যেন সব সময়ই একসঙ্গে দুটো জিনিশ দেখছে। একটা জিনিশই দুই চোখ দিয়ে দেখার জন্যে লাল চোখ দুটোর মণি ঘুরপাক খেয়ে নাকের পাশে চলে আসে। হাতির পাল, বা বাঘ, বা ওইকিয়া (একা) গুণ্ডা হাতি যদি এসে দাঁড়ায় তাহলে পুরো বাথানের মধ্যে এক এই বুড়িয়ালই খাড়া শিং আর পুরো বুক তুলে দাঁড়াতে পারে। বাঘারু দেখেছে, ঐ রকম করে যখন দাঁড়ায়, তখন তার গলার নীচে সামনের দুই পায়ের মাঝখানে এতটা জায়গা খুলে যায় যে পুরো বাথানটাই সেখানে ঢুকে গা বাঁচাতে পারে।
এই বাথান ত কিনি-কিনি বনাইছে দেউনিয়া। এই বাথানের কুনো মইষ কুনো মইষের কায়ও না। কিন্তুক দেখিলে মনত খায়, সগায় বুঝি বুড়িয়ালের বাচ্চা। কায়ও না। কিন্তু বুড়িয়াল যখন খাড়ি যায়, স্যালায় মনত খায় কি, তামান মইষ ঐ বুড়িয়ালের প্যাটতঠে বাহিরত আইচচে।
বাথানে যেমন বুড়িয়াল আছে–কায়ও ওর বাচ্চা না-হয়, ও সগারই মাও–তেমনি আবার দু-দুটো বুড়ো মোষ আছে, যেগুলো আগে বাপ-মহিষ ছিল, এখন বুড়ো ও বাতিল হয়ে আছে।
