সারা দিনের ভেতরে একমাত্র এই দুধ-দোয়ানোর সময়টাতেই ত পুরো বাথানকে একটা কাজ শুরু আর শেষ করতে হয়। তাই এই সময়টাতে বাথানের ভেতর এমন একটা ভাব আসে যা সারা দিনে অন্য কোনো সময় ঘটে না। এখন দুধিয়ালগুলো সব চেয়ে আগে, তারা জানে একটার পর একটা গিয়ে দুধ দিয়ে আসতে হবে। বাথানের বাছুরগুলোর খিদে কম। বা দুধের খিদে বিশেষ কিছু আর বাকি থাকে না। এতগুলো বাট। প্রত্যেক বাট একবার করে চুষলেই চারটি বাছুরের পেট ঢাক হয়ে যায়। ফলে মইষানিগুলোর বাট ফুলে বোধহয় ব্যথাও করে। পাম্প করে যে দুধটা টেনে নেয় তাতে নিশ্চয়ই শরীরে একটা আরাম ছড়িয়ে পড়ে। তাই মইষানিরা যখন বুঝে যায় যে এবার দোয়ানো হবে তখন তারা কাছাকাছিই থাকে, যেন চায়, দোয়ানোটা একটু আগে হোক।
আর বাছুরগুলো ত আর খিধেয় জ্বালায় চাটে না। বাট টানার নেশা ত দুই-চার বাট টানলেই মিটে যায়। তার পর ঐ চারটি বাছুর মিলে পুরো লাইনটাতে গোলমাল বাধায়। এই দুধিয়ালের পেছনে মাথা ঢোকায়, আর-এক মইষানির পেটের তলায় ধাক্কা দেয়। এমন ছুট লাগায় যেন সামনে কোনো বাধা নেই। তার পর কোনো কিছুতে লেগে পড়ে যায়। আবার গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে, ছোটে।
বাছুর আর দুধিয়াল ছাড়া এই সময় অন্য মোষদের ত কোনো কাজে থাকে না। তাদের কেউ-কেউ, বিশেষত বুড়িয়াল, বলদখান আর দু-একটি বুড়ি মইষানি তলাতেই থাকে। কিন্তু ছোকরাছুকরি মোষগুলো কিছুটা এই রাস্তার ওপর উঠে আসে, আর, কিছুটা ছড়িয়ে যায় আশেপাশে। পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে মোষগুলো চলতে গেলে পা ভেঙে যায়। সেই জন্যেই মোষগুলো দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার ওপর, কিন্তু হাটে রাস্তার পাশ দিয়ে।
বাঘারুর মাথা এখন মোষের পেটের তলে। আর এইখানে বসে বসে সে পেটের তলা দিয়ে-দিয়ে। অনেকখানি দেখতে পায়। পেচ্ছাব আর গোবরের গন্ধটা নাকে বেশি লাগার কথা, যদি বাঘারু ঐ গন্ধগুলোকে আলাদা করে চিনতে পারত। এখন, সেই গন্ধের মধ্যে এক বাটে পাইপ লাগিয়ে সে পরের বাটের দিকে হাত দেয়। হাত দিয়েই বোঝে বাছুরের চাট পড়েছে কি পড়ে নি, শক্ত না নরম, শুকনো না ভেজা। বাঘারু জিভের টাকরায় অন্যরকমের আওয়াজ তোলে। আর দু-একটা বাছুর চলে আসে। বাছুরের ঘাড়টা ধরে বাঘারু বাটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। বাছুর ব্যাট থেকে মুখটা সরিয়ে আনতে গেলে বাছুরের কানটা ধরে কাত করে। তারপর এক হাতে বাট আর-এক হাতে বাছুরের মাথা ধরে কাছাকাছি টেনে আনে। যার বাট নিয়ে টানাটানি সেই দুধিয়াল জিভটা বের করে একটু গা চাটতে চায়, পায় না। ডান থেকে বায়ে ঘাড় ঘোরায়। বাটে টান পায়। তৃপ্তি জানানোর আর-কোনো উপায় না পেয়ে দুধিয়াল একটা লম্বা আ-আ-আঁ ডাক ছাড়ে তার স্তন্যের সেই পায়ীর জন্যে যে-এখন তার স্তনলগ্ন। দুধিয়ালটার পেছনের পা দুটো একটু ফাঁক করা–যাতে ভাল ভাবে টানতে পারে। এর ভেতর আগের মোষটার দোয়ানো শেষ হয়ে গেলে বাঘারু বা হাতে সেই পাইপটা খুলে, ডান হাতে বাছুরটাকে ব্যাট থেকে সরিয়ে পাইপটা লাগিয়ে দিতে যায়। বাটে একবার অনিচ্ছুক মুখ লাগালেও বাছুর আর মুখ সরাতে চায় না। বাঘারু এক ধাক্কায় সেটাকে সরায় ও পাইপটা লাগায়। দুধিয়াল পেছনের পা দুটো ফাঁক করেই থাকে। আর পাইপের ভেতর দিয়ে আসা স্পন্দিত টান বাটে বোধ করতে করতে তার তৃপ্তি জানানোর জন্যে একটা লম্বা আ আ আ ডাক ছাড়ে তার স্তন্যের সেই পায়ীর জন্যে যখন সে আর তার স্তনলগ্ন হতে পারে না। দুধিয়ালের সব চেয়ে আরামের সময় এইটাই, যখন তার ব্যাটে টান পড়ে তার শরীরের ভার হালকা হয়ে যায়। বাঘারু তার দুই কর্কশ হাতে তার তল পেটটা হাতিয়ে দেয়, গলাটায় সুড়সুড়ি দেয়, পেটের ভেতরটা চুলকে দেয়। দুধিয়ালটার পেছনের পা বেয়ে শিহরণ খেলে যায়। তার পিঠের চামড়াও চমকে-চমকে ওঠে। একবার পেছনের বা পা মাটিতে ঠোকে। বাঘারু এতক্ষণে পরের দুধিয়ালের ব্যাটে হাত দিয়ে দেখে নেয় বাছুরের চাট পড়েছে কি না।
এরকম দুধ দুইতে আর কতক্ষণ লাগে। বাঘারু ট্রাকটার কাছে এসে দাঁড়ায়। সেই লোকটি একটা কাগজের পেছনে বাঘারুর টিপসই নেয়। টিপসই-এর স্ট্যাম্পপ্যাড তার পকেটেই আছে। সেই কাগজে কী হিশেব লেখা আছে আর বাঘারু তাতে কী টিপসই দিল–সে কোনো কিছুই ত বাঘারুর পক্ষে জানা সম্ভব নয়। সে এটা বোঝে কত দুধ দোয়ানো হল তারই একটা রশিদ ওটা কনট্রাক্টার জোতদারকে দেবে। মাসের শেষে ঐ কাগজ দিয়েই হিশেব হবে। এ ত আর দু-চার সের দুধের ব্যাপার না, যে, এক পোয়া আধ পোয়া হিশেবের গোলমাল হবে। প্রত্যেক দিনই একই সংখ্যক মোষের দুধ একটা পরিমাণেরই হওয়ার কথা। এর মধ্যে দিন তিনেক বাঘারুর একটা দুধিয়ালকে দোয়ায় নি। বাটে ঘা হয়েছিল। সেই কয়েক দিন বাঘারু ঐ রশিদের পেছনে একটা দাগ দিতে বলেছে। তার নীচে সে টিপসই দিয়েছে। সে মুখে বললে দেউনিয়া না-ও বিশ্বাস করতে পারে। কিন্তু অবিশ্বাসই বা করবে কেন? একটা মোষের দুধ না-দুইয়ে বাঘারু করবেটা কী?–খাবে? কত খাবে বাঘারু? বেচিবে? কাক বেচাবে? পাহাড়ক? তা ছাড়া কনট্রাক্টরের লোকটা ত রোজকার হিশেব বুঝে নেয়। সে দেখবে না যে কটা মোষ দোয়ানো হল, কটা বাদ গেল, কেন গেল। কিন্তু সেসব ত কাথার কথা। বাঘারু একখান দাগ দিয়া টিপসই দিছে যে একখান তারিখ দেয়া হয় নাই।
