আমার দাদা খুব শখ একটা অ্যালসেসিয়ানের। মালবাজারের বকুলদা বলেছে একটা দেবে।
কোত্থেকে?
তা জানি না। তবে বকুলদা ভাই লিডার লোক। ও ঠিক কোনো বাগান থেকে জোগাড় করে দেবে।
ঐ আশাতেই থাক। ব্যাটা, অ্যালসেসিয়ানের একটা বাচ্চার দাম জানিস?
হ্যাঁ হ্যাঁ জানি।
তোর চাইতে বেশি।
বেশি ত বেশি।
তেমন জিনিশ পেলে, বকুল মিত্তির তোকে দিতে যাবে কেন?
মাঝরাত্রিতে যখন গাড়ি নিয়ে বাগানে যেতে হয়, তখন তুমি যারে?
আমি যাব কেন? আমার অ্যালসেসিয়ানও দরকর নেই, যাওয়ারও দরকার নেই। তুই কি ঐ সব শুরু করেছিস নাকি?
কী?
বকুল মিত্তিরের সঙ্গে গাড়ি নিয়ে যাস? রাত্তিরে? গাড়ি পাস কোথায়?
গাড়ি ত বকুলদার নিজেরই আছে। অত রাত্তিরে চালানোর লোক পায় না। আমি একবারই, গিয়েছিলাম।
তুই ত গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাস নি, এখনো, তার মধ্যে গাড়ি নিয়ে রাত্তিরে? যাস না।
বকুলদা বলেছে আমাকে একটা অ্যালসেসিয়ানের বাচ্চা দেবে।
জেলে বসে অ্যালসেসিয়ান পুষিস?
কেন?
বকুল মিত্তির রাত্রিতে গাড়ি নিয়ে মার্ডার কেস পর্যন্ত করে তা জানিস?
কে বলল?
তোর তা দিয়ে দরকার কী? ওরকম রাতবেরাতে যাস না।
ছেলেটি একটু চুপ করে থাকে। একটা কুকুরের কথা থেকে যে এতটা এসে যাবে, সে ভাবে নি। তাই ভেবে নিতে তাকে একটু চুপ করেই যেতে হয়। বোঝা যায় না, অ্যালসেসিয়ান কুকুর না-পাওয়ার দুঃখ, আর বকুল মিত্তিরের সঙ্গে রাত্রিতে গাড়ি চালানোর বিপদ–এই দুটোর মধ্যে কোনটাতে সে বেশি চিন্তিত। ছেলেটা এই কথা থেকে সরে যেতেই যেন ব্রিজের মাথার দিকে হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু কয়েক-পা গিয়েই ফিরে আসে। ছেলেটির সঙ্গে কথা বললে বলতে ড্রাইভার রেলিঙে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেটি তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে-বকুলদা ত আমার থাকার জায়গাটা চিনে গেছে।
কী হয়েছে?
যদি পরে আবার আসে?
বলে দিবি, যাবি না।
বাঃ, আগের দিন গেলাম যে
বলিস, আমার লাইসেন্স নেই, রোজ-রোজ যাব না।
মারলে?
খাবি
বকুলদা তাকে অ্যালসেসিয়ান দেবে এই থেকে, বকুলদা তাকে মাঝরাত্রিতে ধরে মারবে, আর সে মার খাবে–এই সত্যটা মেনে নেয়ার ভেতর নিজেকে ও নিজের চার পাশকে উল্টে দেখতে হয়, মাত্র এই সময়টুকুরই ভেতর। এই ছেলেটির পক্ষে সেটা এতই কষ্টকর যে সে সেটা সহজতম করে নেয়। বকুলদা তাকে মারবেই, নিদেন একখানা চড়, এটা সে জানে। আর তাই এই মুহূর্ত থেকেই সেই চড়টা খেতে শুরু করে। পেছন থেকে ড্রাইভার আবার ডাকে, এ-ই।
ছেলেটি দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকায়।
শোন।
ছেলেটিকে আবার ফিরে যেতে হয়। ড্রাইভার রেলিঙের ভর ছেড়ে সোজা হয়ে বলে, শোন্। বকুলবাবু এর পরে কোনোদিন এলে বলবি তোকে থানার দারোগা খুব মেরেছে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাস বলে, আর জিগগেস করেছে বকুলবাবুর গাড়ি চালাস কিনা। শুধু এইটুকু বলবি। তা হলে দেখবি তোকে আর নেবে না।
দারোগার কথা বলব?
হ্যাঁ, ঐ বলবি, দারোগা তোকে বকুলবাবুর কথা জিগগেস করেছে।
এবার ছেলেটি দুধদোয়ানোর জায়গাটার দিকে যায়। তার হাতে লাল রুমালটা ছিলই। সেটা একবার লোফে। দেখেই তোখা লাফিয়ে তার সামনে চলে আসে। কিন্তু সে আর ভোখার সঙ্গে খেলে না।
.
০৭৬.
দুধ-দোয়ানো
প্রথম দিন পাইপ দিয়ে দুধ দোয়ানো শিখতে বাঘারুর তিন-চার মোষ লেগেছিল। পরে বোঝা গেল, শিখতে গিয়েই সে হাঙ্গামা বাধিয়েছে। আসলে শেখার কিছুই নেই, এমনই যন্ত্র যে লাগিয়ে দিলেই হয়ে যায়। হাতের মত একটা রবারের পাতা। তাতে হাতের পঁহ্যাঁচ আঙুলের বদলে একটু ফাঁকে-ফাঁকে চার আঙুল। আঙুলগুলোর মাথা খোলা। মোষগুলোর বাটের ভেতর একটু ফাঁক করে ঢুকিয়ে দিতে হয়, বেলুনের নাখান। তারপর, ঐ ট্রাক থেকে ত পাম্প হতেই থাকে। আর, দুধের মানষিটা ড্রাম ভরতে থাকে। পাইপটা, কাঁচের মত প্লাস্টিকের। ভেতরটাতে, দেখাই যায়, দুধ পাইপটা ভরে চলে যাচ্ছে। যেন দুধটা জলের মত জিনিশ না, গড়ায় না। যেন, দুধটা শক্ত জিনিশ। এই ব্যাট থেকে ঐ ড্রাম পর্যন্ত লেগে আছে। ঐ যে, ট্রাকের ওপর কী-একটা পাম্প করে, তাতে, বাটের ওপর লাগানো ঐ বেলুনের মত জিনিশটা একবার চিপে ধরে, আর-একবার ছেড়ে দেয়, ঠিক আঙুল দিয়ে দোয়ানোর মত।
প্রথম-প্রথম বাঘারু একটা মোষের বাটে পাইপ লাগিয়ে তার পরের মোষটার বাট একটু টানাটানি করত, দুধটা নিয়ে আসতে। এখন তাও করে না। বাছুরের চোষাতেই এসে যায়।
বাথানে বাছুর থাকে না। কারণ, টাড়িতে বাছুরের কাজ অনেক বেশি থাকে। কিন্তু বাছুর না-দেখলে, আর মাঝে-মাঝে বাছুর না-টানলে, আর মাঝে-মাঝে বাছুরের পিঠ না-চাটলে মোষের দুধ আসা বন্ধ হয়ে যায়। সে কাজ একটা বাছুরই করতে পারে। কিন্তু একটা বাছুর এতগুলো বঁট চুষলে তার চোয়াল আটকে যাবে। আর, এতগুলো মোষ মিলে একটা বাছুরকে চাটলে তার চামড়া উঠে যাবে। তাই চারটি বাছুর বাথানের সঙ্গে থাকে।
ব্রিজের মাথায় বাঘারু রাস্তার ওপরেই বসেছে। এতে কাজের একটু অসুবিধে হয়। ওদিক থেকে একটু চড়াই হয়ে মোষগুলোকে ওপরে উঠতে হয়। অনেক মোষ তা করতে চায় না। নীচেই দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো-কোনো মোষ আবার ঘুরে পেছনে চলে যায়। ওদিকে যদি কেউ থাকত, তা হলে এখানে বসে কাজ করাই সুবিধে–তলা থেকে পাঠিয়ে দিত, এখানে দুইয়ে নিয়ে, বাঘারু আবার তলায় পাঠিয়ে দিত। ভোখাকে দিয়ে বাঘারু খানিকটা করায় অবিশ্যি, মোষগুলোও ভেখার কথা শোনে। কিন্তু যদি কেউ গড়বড় করে তা হলে মোষ-ভোখা এই সব নিয়ে একটা হুলস্থুল কাণ্ড। সেই জন্যে বাঘারু ভোখাকেও বড় একটা ডাকে না। এই বড় রাস্তার ওপর বসে বাঘারু যেকটাকে হাতের কাছে পায়, দুইয়ে নেয়। তার পর, একবার উঠে গিয়ে বাকিগুলোকে তুলে নিয়ে আসে। মুশকিল হয়, তখন যদি কোনো মইষানিকে খুঁজে পাওয়া না যায়। এই জায়গাটার এটাই সুবিধে যে এদিক-ওদিক আলগা হওয়ার সুযোগ কম।
