আওয়াজটা বাঘারুর যত চেনা, ভোখার তার চাইতে কম ত নয়ই, একটু যেন বেশিই। তাই ভোখাই আগে শুনতে পেয়ে ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু মোষগুলোরও বোধহয় চেনা। সামনের মোষদুটো মাথাটা কেমন বাতাসে তুলেছে, যেন গন্ধ শুঁকছে, ওদের গলকম্বলটা টানটান হয়ে ওঠে।
বাঘারু তখনো দাঁড়ায় না। এখনো দেরি আছে। ট্রাকটা এখান থেকে মাইল কয়েক দূরে এই রাস্তার ওপর উঠে এই দিকে বেঁকবে। একটু আগে আওয়াজটা পাওয়া গিয়েছিল কারণ, ওদিকের রাস্তার একটা জায়গা এই কোনাকুনি–হৃদয়পুর বস্তি, একটা ছোট জলা ও ঐ দিকের পাতলা জঙ্গলটা পেরিয়ে–সোজা। আওয়াজ আসার পথে কোনো বাধা নেই। কিন্তু তার পরই আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেছে। এর পর আবার আওয়াজ শোনা যাবে, ট্রাকটা যখন এই রাস্তায় উঠবে। তখন অবিশ্যি আওয়াজটা ক্রমেই বাড়ে। প্রতিধ্বনিও হয় চার পাশ থেকে। যে-ভূগোল বাঘারুর দেখা নেই, আওয়াজ শুনেই সে সেটা ছকে নিতে পেরেছে।
সেই আওয়াজের পেছন-পেছন ট্রাকটা এসে প্রায় এই ব্রিজটার ওপর পৌঁছয়। ট্রাকটার থামা, দাঁড়ানো ইত্যাদি লোখা ও মোষগুলোর এত বেশি জানা যে ট্রাকটা অত জোরে আসছে দেখেও ওরা ব্রিজ থেকে নড়ে না। একটু সরে যায় মাত্র।
ভোখা বহু আগে থেকেই ট্রাকটার দিকে তাকিয়ে ডাকছিল। ট্রাকটা যত কাছে আসছিল, তত জোরে ডাকছিল। শেষে ট্রাকটা যখন থামল, তখন ভোখা ডাকতে-ডাকতে ট্রাকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রায়। ড্রাইভার ও দুধের লোক, সামনে থেকে একজন আর পেছন থেকে একজন, নেমে এলে তোখা চিৎকার থামায়। তাও ব্রিজটার রেলিঙের কাছে গিয়ে আচমকা ডেকে ওঠে।
মোষদুটো সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়াচ্ছিল। ট্রাকটা থেমে যাওয়ার পর ওরা ব্রিজের ওপর নেমে যায়, দুটোই প্রায় একসঙ্গে। তার পর, ঢালের দিকে চলে যায়, যেখানে অন্য দুধিয়াল মইষানিগুলোকে ঠিক করে রেখে এসেছে বাঘারু।
ট্রাকটা এসে দাঁড়াতেই সেই পাইপটা নিয়ে একজন এগিয়ে আসে। এখন ত বাঘারুই শিখে গেছে। তাকে দুধের লোকটি পাইপটা ধরিয়ে দিলেও কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে।
লেও, পেট্রল চালাও লোকটি হেসে বলে।
বাঘারু নানড়েই হেসে জবাব দেয়, মোর প্যাটরখান দ্যান আগত।
ওঃ জরুর, জরুর। লোকটি তার প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট দিতে দিতে বলে, আচ্ছা, তোমাকে আমি একটা প্যাকেটই দিয়ে যাব, ব্যস, তা হলে তোমার রোজ পেট্রল লাগবে না।
পাকিট? কিসের পাকিট?
এই। তোমার পেট্রলের।
ড্রাইভার দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে, যা বাবা, তাড়াতাড়ি কর। এ পুরো ট্রিপ ঘুরে আসতেই ত বেলা দশটা বাজবে। ড্রাইভার রেলিঙের ওপর থেকে ঝুঁকে নীচের ডায়না দেখে।
মোক পাকিট দিবেন? পুরা একখান? সিগরিটের?
হাঁ পুরা পেটরোল। বাঘারু একটা সিগারেট বের করে নিয়ে প্যাকেটা আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হাতের মুঠোয় সিগারেটটা দুমড়ে না ফেলে বাঘারু ঐ কাগজের প্যাকেটটা আটকাবে কী করে? ফলে, তার যেন একটু বিহ্বলতাই আসে, বা হাতে সিগারেট আর ডান হাতে প্যাকেটটা নিয়ে। লোকটি এগিয়ে এসে দেশলাই দিলে বাঘারু একটা সমাধান পায় বটে প্যাকেটটা ভোলা অবস্থাতেই তাকে ফেরত দেয়ার, কিন্তু সেখানেও, দেশলাইটা আগে নেবে, না, প্যাকেটটা আগে দেবে এই নিয়ে আর-এক বিহ্বলতা দেখা দেয়। লোকটি ততক্ষণে দেশলাই থেকে কাঠি বের করে নিজেই জ্বালায়। সে যে এরকম জ্বালাবে, তার জন্যেও বাঘারু তৈরি ছিল না। ফলে, সে তার সিগারেটটা অত তাড়াতাড়ি মুখে দিতে পারে না। কাঠি নিবে গেলে লোকটি আর-একটি কাঠি জ্বালায়। ততক্ষণে বাঘারু সিগারেট ঠোঁটে দিতে পারে। আগুনের শিখার ওপর নত হতে-হতে বাঘারু বোঝে বাতাসে কাঠিটা আবার নিভবে। তখন একসঙ্গে সে একটা জটিল প্রক্রিয়ায় সমাধান ঘটায়–পিঠ দিয়ে বাতাস ঠেকানো, হাত বাড়িয়ে খোলা প্যাকেটটাই ফেরত দেয়া আর শিখার ওপর নত হয়ে সিগারেট ধরানো।
সিগারেটটা ধরানোর জন্যে বাঘারু যে-টান দেয় তাতে, ধরাতে গিয়েই সিগারেটটা একেবারে, শেষ হয়ে যেতে পারে যেন। সিগারেট ধরে যাওয়া ও দেশলাই কাঠি নিবে যাওয়ার পরও তার টান চলতে থাকে। আর, তার পর, শ্বাস বন্ধ করে ধোয়াটা ভেতরে নিয়ে সে যখন ছাড়ে, তখন মনে হয়, তার মুখের ভেতরে ছোটখাট উনুন আছে। ধোয়া বেরনো শেষ হওয়ার আগেই বাঘারু আর-এক টান দেয়। ড্রাইভার হেসে বলে, তোর এই টান দেখে ত আমাদের দম বন্ধ হয়ে যায় বাবা।
বাঘারুর চোখ তখন সিগারেটের নেশায় বন্ধ।
.
০৭৫.
শহুরে কিছু প্রক্ষিপ্ত
ট্রাকটার ওদিকে ক্লিনারটা তখন ভোখার সঙ্গে খেলা জুড়েছে। লোখার নাকের সামনে কী একটা দোলাচ্ছে। ভোখা সেটা ধরতে গেলেই, সরিয়ে নিচ্ছে ভোখার পিঠের ওপরে। ভোখা নিজের মুখ নিজের পিঠের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে গোল হয়ে লাফাচ্ছে আর লাফাতে লাফাতে, গোল হতে-হতে মাটিতে শুয়ে পড়ছে। ছেলেটি তখন হো হো হেসে উঠছে। তার হাসিতে, ও ঐ লাল জিনিশটার দোলা বন্ধ হওয়ায়, ভোখা তার খেলা ছেড়ে কুকুরের সব চেয়ে চেনা ভঙ্গিতে সোজা হয়ে মাটিতে বসে। ক্লিনারটি ড্রাইভারকে বলে, শালা, ভাল কোয়ালিটির জিনিশ দাদা। কোথা থেকে পায় এই সব? বলব, একটা ধরে রাখতে?
ফরেস্ট থেকে নিবি ত একটা বাঘটাঘ নে। ফরেস্ট থেকে কেউ কুত্তা নেয়? বোকা, ড্রাইভার নদীর দিকে তাকিয়েই বলে।
