ইতিমধ্যে পরের দুটো মোষই উঠে দাঁড়িয়েছে। প্রথম মোষটার পেছন-পেছন সে দুটোও চলতে শুরু করে। বাঘারু তার ডাইনেয়ে এই মোষের লেজ মুড়িয়ে, ঐ মোষকে হাঁটু দিয়ে গুতিয়ে, আর-একটাকে পিঠে চড় মেরে, হেই, উঠ, উঠ, টরর-অ, টর-র-র-অ আওয়াজ দিতে-দিতে এগিয়ে যায়। একটা মোষ যখন উঠছে, তখন পুরো বাথানটাই এখন দাঁড়িয়ে পড়বে। আর পেছনের মোষটা যখন চলতে শুরু করেছে, সেই চলার ধাক্কাতেই সামনের মোষগুলোও চলবে। কিন্তু তার আগে বাঘারু আগে গিয়ে দাঁড়াবে। তার পর দুধিয়ালগুলোকে আগে ছাড়বে, প্রায় লাইন বেঁধে।
এগতে-এগতে বাঘারু বুড়িয়ালের কাছে এসে পড়ে। সামনে দাঁড়িয়ে তার দুই শিঙের মাঝখানে একটু চুলকে দেয়। এমনকি বাঘারুর অতবড় থাবাও মোষটার কপালে কেমন ছোট দেখায়। বাঘারুর স্পর্শ পেয়ে মোটা তার গলাটা বাড়িয়ে দেয়, বাঘারুর কাঁধের ওপর তার গলাটা রাখে। নিজের মাথার পাশে মোষের মাথাটা নিয়ে বাঘারু দুই হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে আর আস্তে-আস্তে কানের পাশে গলকম্বলের নীচে দুই হাত দিয়ে মোষটাকে আরাম দিতে থাকে। বাঘারু শুনতে পায় বুড়িয়ালের গলার ভেতর থেকে একটা গুর, গুরু গুর আওয়াজ উঠে আসছে, খাড়া কেনে, খাড়া, এ্যালায় ত সাকালখান হই। বাঘারু আবার তার কানের পিছে হাত লাগিয়ে সুড়সুড়ি দেয়।
পেছনের মোষরা বাঘারু আর বুড়িয়ালকে মাঝখানে রেখে দু-পাশ দিয়ে এগতে শুরু করেছে। বুড়িয়ালের গলায় সুড়সুড়ি দিতে-দিতেই বাঘারু দেখে, সেই ভর পোয়াতি মোষটাও দুলতে-দুলতে চলেছে–আজি হবে কি কালি হবে। বাথান প্রায় পুরোটাই জেগে উঠেছে। এবার চলতে শুরু করবে। বুড়িয়াল যাবে না। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে। বাঘারুকে এবার সামনে গিয়ে পঁড়াতে হয়। বাঘারু বুড়িয়ালের ঘাড়ে দুটো চড় মেরে, র কেনে র, আসিছু বলে খুব ধীরে চলমান মোষের দলের পেছন থেকে তাড়াতাড়ি সামনে এগিয়ে চলে।
কিন্তু এগিয়ে চলতে-চলতেই বাঘারু এক-একটা মোষকে গলা ধাক্কিয়ে সরিয়ে পেছনের কোনো মোষকে জায়গা করে দেয়। সেটা ফাঁকের ভেতর ঢুকে গেলে আগের মোষটাকে ছেড়ে দেয়। দুধিয়ালগুলোকে দরকার এখন। বাকিগুলো এখানেই থাক। মাঝখানে একটা বাছুর বড়বড় মোষের ভেতরে যেন পথ হারিয়ে ফেলেছে। বাঘারু সেটার লেজ তুলে এমন মলে দেয় যে, পেছনের দুই পা তুলে এক লাফ মেরে দৌড়তে শুরু করে। আর আগের দলটা যেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। বাঘারু হেসে উঠে তালি দিয়ে বলে, চল কেনে, টররর।
.
০৭৪.
দুধের ট্রাকের অপেক্ষায় গান
বাঘারু এখন ডায়না ব্রিজের ওপরে–রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। দুটো মোষও ব্রিজটার ওপরে উঠে এসেছে। ঠিক মাঝখানে, শিং উঁচু করে বাঘারুর মতই পুব দিকে সোজা তাকিয়ে। ওদিকে বিন্নাগুড়ি। ঐদিক থেকেই দুধের গাড়ি আসবে। আসার সময় প্রায় হয়ে এসেছে। সময়ের খুব একটা হেরফের হয় না।
এখন বাঘারুর কোনো কাজ নেই, গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া। সুতরাং তার গান আসতে পারে। বাঘারুর গানও পূর্বনির্ধারিত। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের মত ব্যস্ততাহীন নিয়মে বাধা তার কাজের ভেতরে এই গান যোগসূত্র হিশেবে তৈরিই থাকে। এক কাজ থেকে আর-এক কাজের ভেতর বাঘারুর এত বিচ্ছিন্নতা কখনোই ঘটে না যা গান দিয়ে জুড়ে দেয়া যায় না। যেমন বাঘারুর শরীর কাজ থেকে কাজে, নদী বা গাছের মতই চলে যায়, তেমনি সেই যাওয়ার ভেতরই গানটাও অবধারিত এসে যায়। কাজে কাজে অবিচ্ছিন্নতার সেই গানে এত বিরহ আসে কোথা থেকে?
বাথান বাথান করিসেন মইষাল রে-এ-এ
(অ তোর) বাথান করিলেন ঘর।
বাথান হইলেন আউলা ঝাউলা রে-এ-এ
(অ তোর) বাথান ভরা গোবর।
অ মোর মইষাল বন্ধু রে-এ-এ
বাঘারুর সুর টান করে রাখে। বাঘারু নিজেই মইষাল, নিজেই তার বিরহিণী নায়িকার গান গায়–এখন দুধের গাড়ির জন্যে ডায়না ব্রিজের ওপর অপেক্ষার সামান্য. সময়টুকুর সকালে। হাঁটা বা কথা শেখার মত করে এইসব, গান,জানা হয়ে গেছে–এমন সময়ে গাওয়ার জন্যে। মইষালনির এই বিরহ বাঘারুর, বাঘারুই মইষালনি। বিরহ তার, মইষাল বাঘারুর জন্যেই। বাথান বাঘারুর জানা, মোষও বাঘারুর জানা; মইষাল ত বাঘারু নিজেই। এতগুলো জানা দিয়ে আর মইষালনি-হওয়ার–জানাটুকু পেরতে কী লাগে। বাঘারু তখন নাবাজানো দোতারার ঝোঁকে-ঝোঁকে গাইছে
বাথানে বাবোশ মইষ
ও মোর মইষাল এ্যাকেলা ঘুরেন,
ঘর মোর এই যৈবনখান্
কাপড়ে বান্ধি রাখেন।
অ-মোর মইষাল বন্ধু রে-এ-এ
বাঘারু নিজেই নিজের বিরহিণী।
বাঘারুর গানের উত্তরে, নীচে, চর থেকে লোখা জোরে-জোরে ডেকে ওঠে। বাঘারু গান থামিয়ে হেসে ফেলে বলে ওঠে, শালো। বাঘারু চুপ করে গেলে তোখা আরো জোরে ডেকে নীচে থেকে ছুটে ওপরে উঠে এসে ব্রিজটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে সেই ট্রাকের রাস্তার দিকে তাকায়।
ভোখার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতেই সন্দেহ হয়েছিল। বাঘারু থেমে কান খাড়া করে-বহুদূর থেকে ট্রাকের শব্দটা পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম দিকে বাঘারু টের পেত না। কিন্তু এখন ত এই ফরেস্টের আওয়াজগুলো চেনা হয়ে গেছে। কোনটা ফরেস্টের ভেতরের আওয়াজ আর কোনটা বাইরের সেসব এখন একবারেই ধরতে পারে। তার বা-পাশে হৃদয়পুর বস্তি। তার ওপরের, ফরেস্টের ওপার থেকে ট্রাক আসার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আর-কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে।
