.
০৭৩.
বাথান জাগে
নদী ধরেই বাঘারু একটু ওপর দিকে ওঠে। তার পর নদী ছেড়ে উঠে যায়। সে এখন এক সীমা থেকে মোষগুলোকে একবার দেখে নেবে। শুধু দেখেই না। একটু সাজিয়ে নিতে হবে পুরো বাথানটাকে দুধিয়ালগুলোকে নিয়ে যেতে হবে বাঘারুর পাথরটার পশ্চিমে, রাস্তার দিকে অনেকখানি তুলে। দুধে গাড়ি এসে যাওয়ার পর, না হলে, না লাগে। মোষগুলোরও এটা অনেকখানি জানাই। তার এখানে বাঘারুর চেয়ে পুরনো। বাঘারুকেই নতুন করে জানতে হয়েছে। এখন একটু-আধটু ধাক্কা খেলেই মোষগুলো বোঝে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে। সারাদিন বনেজঙ্গলে চরার পর বিকেলের দিকে বাথান যখন ফেরে তখন যে যেখানে ইচ্ছে দাঁড়ায়, কিংবা বসে। এখন এই সকালে তাদের লাইনবাঁধা শুরু করতে হয়। একবার পাম্প লাগানো শুরু হয়ে গেলে আর খেজাপাতি করা যায় না। এই জায়গাটা খুব ছড়ানো নয় বলে গায়ে গা লাগিয়ে মোষগুলো এক জায়গাতেই থাকে, বাঘারুর পাথরটাকে তিন দিক থেকে ঘিরে। জায়গাটুকুতে জঙ্গল নেই, শুধুই বালি ও পাথর, আর রাস্তার দিকের খানিকটা ঘাস। মোষগুলো বেশি ছড়াতে পারে না।
কিন্তু, তারই ফলে গায়ে গা লাগিয়ে এমন ভাবে থাকে যে ভেতর দিয়ে ঢোকার রাস্তা পাওয়া যায় না। আর বসার এই এক অদ্ভুত অভ্যেস মোষদের যে দুটো মোষ দুদিকে মুখ করে এমন ভাবে এ ওর গায়ে ঢলে থাকে যেন মনে হয় ওদের একটাই শরীর। শুধু বিপরীত মুখেই যে তা হবে, তা নয়, এক দিকেই মুখ করে এমন কোনাকুনি শরীর আর গলা রাখে যে হয় ডিঙিয়ে পেরতে হয়, না হয় ঘুরে যেতে হয়।
সারা রাত ধরে মোষগুলো যে যার ভঙ্গিতে প্রায় স্থির হয়ে থাকে বলেই কি বাঘারু এই বাথানজোড়া মোষের মূর্তিগুলোই দেখতে পায়, যেন, এগুলো মোষ নয়-পাথর। নাকি, সকালের আলো এখনো ফোটে নি বলে মোষগুলোর শুধু ছায়া আছে এখন। পুরো শরীর নেই, শরীরের আভাসটা একেবারে খোদাই হয়ে আছে। তাই তাদের পুরো শরীরের বাইরের রেখা এমন প্রখর হয়ে থাকে।
বাথানের পেছন দিকটাতে পৌঁছতে বাঘারুকে জলের কিনারা দিয়ে, তার পর কিনারা ছেড়ে, ক্রমেই ওপরে উঠতে হয়। মোষগুলোকে একসঙ্গে দেখায় যেন একটা অসমতল পাথুরে ডাঙা। তাতে কোনো-কোনো জায়গায় দুটো-একটার শিং জেগে আছে মাত্র। মাঝখানে, একটা মোষ দাঁড়িয়ে, তার গলাটা আকাশে অনেকখানি বাড়িয়ে কোনো উঁচু গাছের ডালে মুখ দিতে চায় এমন ভঙ্গিতে। শিং দুটো পেছনে হেলে শরীরের সঙ্গে মিশে গেছে, শুধু জেগে আছে তার হাঁ মুখটা মনে হয়, পিঠটাই এগিয়ে হা হয়ে আসে। বাঘারু চেনে–বুড়িয়ালি। শালো বুড়ি হচ্ছে, ঘুম কমি গেইছে। বাঘারু চলতে-চলতে জিভ দিয়ে টাকরায় একটা আওয়াজ তোলে–টট টর রর, টট টর রর।
চলতে-চলতেই আওয়াজ তুলে চলতে-চলতেই তাকায় বলে বাঘারু বুঝতে পারে না, তার ডাকে বুড়িয়াল সাড়া দিল কি না। এখন আরো সরে এসে সে ত বুড়িয়ালের ঐ লম্বা গলার ও মুখের আর-একটা চেহারা পায়। বাঘারু বুড়িয়ালকে একটু ব্যস্ত করতেই যেন, আবার আওয়াজ তোলে, টট টর রর, টট ট র র টরর। তার পর লাফিয়ে একটা মোষের পিঠ টপকে, আর-একটা মোষের পিঠে হাতের ভর দিয়ে একটু পাক খেয়ে সে বাথানের শেষ মোষটার কাছে গিয়ে পৌঁছয়। এইবার বাঘারু পুরো বাথানটাকে জাগাবে। কিন্তু তার আগেই মাঝখান থেকে বুড়িয়াল তার গলাটা আরো বাড়াতে থাকে, যেন ডালটা তার মুখের নাগালে আসছে না। আর তার পরই আঁ-আঁ আঁ করে ওর পুরনো ঘষা গলায় এক হকার তোলে। বাঘারুকে, আওয়াজ শুনে, খুঁজছে। না পেয়ে ডাকছে।
বুড়িয়ালের হাঁক শুনেই ঐ পাথরের মত মোষের মাথাগুলো একটু-একটু ঘোরে, খাড়া হয়। আর তখনই বাঘারু হাঁক দেয়, হে-ই, উঠ, উঠ, উঠ, হেট, উঠ। বাঘারু শেষ মোষটার পেছনে হাঁটু দিয়ে একটা গুতো মারে, হেই, উঠ, উঠ, হেট, উঠ, তার পর মোষটার ঘাড়ে আর পিঠে জোরে-জোরে চড় মারে, হেট, উঠ। বুড়িয়াল সেই মাঝখান থেকে ততক্ষণে মুখ ঘুরিয়েছে বাঘারুর দিকে। গলাটা তার বাড়ানোই থাকে। বাঘারুর হাঁক শুনে নিয়ে আবার একটা ডাক দেয়, আ আঁ–আ-গ। এবারের ডাকটা আর তত লম্বা নয়। বুড়িয়ালি জেনে গেছে, বাঘারু কোথায়। বাঘারু চেঁচায়, খাড়া গে খাড়া, যাছি, খাড়া। তার পর আবার বসা মোষটাকে পেছনে একটা খোঁচা দেয়–হেঁট হেঁট, উঠ, উঠ, টররর-অ, টররর-অ! এতক্ষণে মোষটা তার পেছনের পা দুটো নাড়াতে শুরু করে। বাঘারু তার কানের পিছে জোরে-জোরে দুটো চড় মারে। মোষটা পেছনের পা দুটো সোজা করতেই কানের ঝাঁপটা মারে বাঘারুর হাতে, বুঝে নিতে যে বাঘারুই, বা সাড়া দিতে। তার পর লেজের ঝাঁপটা মারে পিঠে। মোষটার পেছনটা উঁচু হতে থাকে। পেছনের পা দুটো মাঝামাঝি উঠতেই সামনের পা দুটো ঝট করে তুলে মোষটা খাড়া হয়ে যায়। মোটা মাটি থেকে একটু উঠতেই তলা থেকে পেচ্ছাব আর গোবরের গন্ধ উঠে আসতে থাকে। কিছু যেন ধোয়াও। আর গা থেকে বালি আর নুড়ি-পাথর খসে পড়ে।
মোযটার মুখটা এখন বাঘারুর দিকে ফেরানো। বাঘারু তার গলাটা ধরে ঘোরাতে থাকে। একটু ঘোরাতেই মোযটা নিজেই ঘুরতে শুরু করে। এই মোষটার গায়ে গা লাগিয়ে যেটা ছিল, সেটাও, এর মধ্যে বসে থেকেই গলাটা সোজা করেছে। বাঘারু আগের মোষটার গলার তলা দিয়ে ঐ মোষটার কাছে এসে হাঁটু দিয়ে একটা অঁতো মারে, উঠ, উঠ, আর তার পরের মোষটার পিঠে একটা চড় মারে। সঙ্গে সঙ্গে ঐ মোষ দুটো উঠতে শুরু করে। এবার এই মোষটাই চলতে-চলতে অন্য মোষদের উঠিয়ে দেবে।
