কোথায় চলে গেল সেই অনন্তকুমার! যখন কালবৈশাখীর ঝড় উঠত-বাঁশঝাড়-গুলো ঝড়ের দোলায় নুয়ে পড়ত মাটির বুকে, তখন অনন্তকুমার আমাকে নিয়ে উঠতেন ওই উঁচু গাছের মগডালে। দেখতাম এলোকেশীর উন্মাদিনী মূর্তি। জীবনে যখন যা খাঁটি বুঝত তাই করত প্রাণ দিয়ে, জীবনের মূল সুরটি ছিল ভক্তির। সন্ধান করত তার–যে আড়ালে থাকে–ইশারায় ডাকে। লিখত সে চমৎকার, গানও গাইত অতিমধুর।
মনে পড়ে রসরঞ্জনকে। কুষ্ঠরোগীর সেবক নেই। পয়সা পাবে কোথায়-অনাহারে অনিদ্রায় পায়ে চলে নদী সাঁতরে শত শত মাইল চলল সে বৈদ্যনাথে রোগীসেবায়! এঁরা আজ কেউ নেই– কিন্তু আজও আছে ওই সুরেন। বেঁচে আছে সে আপন প্রভায়। শৈশবে ছিল সে কবি–ছবিও আঁকত চমৎকার। গৌরবর্ণ, মুখের কাঠামো মঙ্গোলিয়ান–দীর্ঘদেহ। জলের মোটা মোটা লম্বা জোঁকগুলো দেখলে আমাদের গা শিরশির করত। সুরেন ওগুলো ধরে এনে ট্যাঁকে করে ঘুরে বেড়াত–আমাদের ভয় দেখাত। সাপের ল্যাজ ধরে শূন্যে তুলে ও মজা দেখত! কল্পনা করত, কবিতা লিখত ভারত উদ্ধারের। ভারত উদ্ধারের কথা আমাদের মনে দাগ কাটত বেশি। দুর্জয়কে জয় করার আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠত আমাদের মনে। আমরা তখন কিশোর। দেহের পুষ্টির সঙ্গে এই বয়সে নেমে আসে শক্তিধারা–সে শক্তিকে অচঞ্চলভাবে ধারণ করতে পারে–এত শক্তি কার আছে? বাঁশ কেটে লাঠি বানাই–তরোয়াল, বন্দুক ধনুর্বাণ। কখনো কি মনে হয়েছে এই অস্ত্রে ইংরেজকে তাড়ানো যাবে না? তারপরে এল স্বদেশি আন্দোলন। আমাদের ভেতরে প্রেরণা জাগাল আনন্দমঠ, প্রেরণা জাগাল রামচন্দ্র দাসের কবিতা, মুকুন্দ দাসের সেই প্রাণমাতানো গান,
দশ হাজার প্রাণ যদি আমি পেতাম,
মাথায় পাগড়ি বেঁধে সাধক সেজে
দেশোদ্ধারে লেগে যেতাম।
আজ সেই দেশোদ্ধারী সুরেন, কবি সুরেন, চিত্রশিল্পী সুরেন পোশাক বদলেছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোধা ডক্টর সেন এখন অবসরপ্রাপ্ত। যখন কৈশোরে বয়সের অনুপযোগী ইতিহাসের মোটা মোটা বইগুলো রাত জেগে পড়ত তখন একটি লোক তাকে উসকে দিতেন–তিনি আমাদের বরিশালের অশ্বিনী দত্ত। মনে আছে একবার সুরেন অশ্বিনীবাবুকে কবিতায় চিঠি দিল,
যাট বছরের বুড়ো তারে সবাই কেন বলে,
বুড়ো হয়ে যায় না শুধুই বয়স বেশি হলে।
সাদা হাসি আছে তাঁহার সাদা গোঁফের তলে,
বিশ বছরের যুবার মতো বুক ফুলিয়ে চলে।
আমি যদি মেয়ে হতাম, হতাম স্বয়ংবরা,
ওই বুড়োর গলে দিতাম তবে আমার মালাছড়া।
অশ্বিনীকুমারও জবাব দিয়েছিলেন তেমনি রসালো কবিতায়, সে-কবিতা আজ আর মনে নেই। ডক্টর সুরেন, ভাইস-চ্যান্সেলার সুরেন আজও তেমনি কিশোর, কিন্তু আপন জন্মভূমিতে সে অনাদৃত।
আমাদের এই খেলাঘরে জুটল এসে মনোরঞ্জন গুপ্ত! ভিন গাঁয়ের তরুণ। আজ বয়স তার যাট পেরিয়েছে, কিন্তু আজও সে কিশোর–গাছের পাতাটি ছিঁড়ে নিতে ওর দুঃখ হত, কিন্তু যখন ডাক এল গেরিলা বিপ্লবের, তখন এই বাঁধনছেঁড়া সাধকের হৃদয়-যন্ত্রে বাজল শুধু একটি তারের একতারা। দেশের মুক্তিযজ্ঞে হৃৎপিন্ড ছিঁড়ে আহুতি দিল নিজের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ। সরকারের খাতায় ওর মাথায় মূল্য বেড়ে যায়, কিন্তু আইনকানুনে ওকে ধরা যায় না–রাজসাক্ষী দেয় না ওর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য। তবু ওকে শিকল পরতে হল। নিজের পায়ে শিকল না পরলে কি মায়ের পায়ের শৃঙ্খল খোলা যায়? কিন্তু সে-শৃঙ্খল ‘চরণ-বন্দনা করে, করে নমস্কার। আজ দেশ তো বিদেশির গ্রাস থেকে মুক্ত হয়েছে, কিন্তু মুক্ত হয়নি ভয়, মুক্ত হয়নি মানুষের মন। দেবতাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে মানুষ। এই দুর্যোগে কে দেখাবে আলো? তাই নিরন্ধ্র অন্ধকার পথে একক অভিযাত্রী ওই ষাট বছরের কিশোর। প্রতিকারের হাত নেই, আছে দরদ, আজ অস্ত্র তো অবান্তর, তাই চোখে আছে জল-’সাত সাগরের জল। এই গ্রাম মনোরঞ্জনের খেলাঘর। আজ আর খেলার মাঠে সাথিদের কোলাহল নেই, কুটিরে কুটিরে জ্বলে না দীপ। নেই বালকদের পাঠাভ্যাসের উচ্চরব। সন্ধ্যায় ঠাকুরঘরে আর শঙ্খ বাজে না, আর কেউ জোটে না নৈশ রাতে খোল-করতাল নিয়ে কীর্তনে। তবু যেন শুনি। সেই গান,
মন রে তোর পায়ে ধরি রে,
একবার আমায় নিয়ে–একবার আমায় নিয়ে–
ব্রজে চলো–দিন গেলো, দিন গেলো!
কীর্তনের কথায় মনে পড়ে প্রিয়নাথের কথা–তার ছেলে মন্মথের কথা। আজ দু-জনের কেউ বেঁচে নেই।
কী চমৎকার ওরা গাইত! প্রিয়নাথের ডাকনাম ছিল মুলাই। দু-দলে পাল্লা দিয়ে গান চলেছে। দোহার বালকদের সংযত করে মুলাই ট্যারা চোখ ঢেলা ঢেলা করে গান ধরে,
হল দেহ-তরি ডুবু ডুবু প্রায়
পড়ে অকূলে আজ অসময়
***
তরির নব ছিদ্রে বহিছে বারি-ই-ই,
তাহে পাপের বোঝা নয় রে সোজা
উপায় কী করি।
এখন একূল ওকূল দু-কূল যায়–
শেষটা বলে যখন হাত দুটো বাড়িয়ে দিয়ে ঘুরে ঘুরে সে গাইত-শ্রোতারা হরিধ্বনি দিয়ে উঠত তখন। মুলাইর ডাগর চোখ ভিজে উঠত জলে। পাশের গ্রাম যশুরকাটির ভজরাম সেন বড়ো গায়ক। সে ছিল ওর শ্বশুর। প্রায়ই গান হত তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। শ্বশুর বলে সে রেহাই পেত না। মুলাই বলত দোহারসহ,
শোন রে ভজা শোন,
আর আর পক্ষে যেমন তেমন
তোমার পক্ষে যম।
ভজরামও জবাব দিত যোগ্য ছন্দে।
ওদের গান আজও কানে বাজে। ভুলতে পারি না গোপাল ভদ্রের সেই আকুতি,
