.
মাহিলাড়া
বরিশাল থেকে মাদারিপুর ছত্রিশ মাইল দীর্ঘ যে প্রশস্ত সরকারি রাস্তাটা চলে গেছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে–তারই মাঝামাঝি জায়গায় আমাদের জন্মভূমি মাহিলাড়া গ্রাম। গ্রামটি রাস্তার পুব ধারে। এরই প্রায় একমাইল দক্ষিণে রাস্তা-সংলগ্ন গ্রাম বাটাজোড়, স্বর্গীয় অশ্বিনীকুমার দত্ত মহাশয়ের পৈতৃক বাসভূমি। সরকারি রাস্তার সঙ্গে সঙ্গে বয়ে চলেছে সরকারি কাটা খাল।
মায়ের কোলে যেমন শিশুর সুখের সীমা নেই, তেমনি সুখ ছিল আমাদের পল্লিমায়ের কোলে। সরকারি খাল থেকে আর একটা খাল পুব দিকে তিন ক্রোশ দূরে গিয়ে মিশেছে আড়িয়ালখাঁ নদীতে। এই খালের দুই তীরে ছবির মতো গ্রাম মাহিলাড়া। জোয়ার-ভাটায় খালের জল সদাই চঞ্চল, যেন পল্লিমায়ের বুকে দুলছে একছড়া কণ্ঠহার! ভোরে যখন সূর্য ওঠে, পূর্ণিমায় যখন নীল আকাশে চাঁদ ফোটে, তখন খালের জলে লক্ষ মানিক জ্বলে।
মাঝখানে একটা কাঠের পুল এক করে দিয়েছে এপার-ওপার। পুলের উত্তরে একটা বহুপ্রাচীন তালগাছ, আর দক্ষিণে একটা কদমগাছ। আষাঢ়ে সবুজ পাতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফোটে রাশি রাশি কদম ফুল। এরা সজল চোখে হাসি ফুটিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখে। খালের দু-ধারে আরও কত গাছ–হিজল, জারুল কাঁঠাল। জ্যৈষ্ঠ মাসে যখন প্রথম জোয়ারের জল ছুটে আসে কূল ছাপিয়ে, তখন তাতে ভাসে রাশি রাশি হিজল আর জারুল ফুল। হিজল ফুল লাল, আর জারুল ফুল বেগুনে। অজস্র ফুল পরস্পর মিলেমিশে রঙিন কার্পেটের মতো ভেসে আসে জোয়ারের জলে, আর পিছিয়ে যায় ভাটার টানে–নদীর দিকে।
গ্রামের উত্তরে খানিকটা দূরে শ্মশ্রুবহুল ঋষির মতো দুটো বটগাছ। বিশাল ছায়া ফেলেছে। পায়ে-চলা পথের ওপরে। কত বয়স তাদের হল কে তার হিসেব রাখে। পূর্বসীমায় গুপ্তদের দিঘির পাড়ে একটা বকুল গাছ। ফুল ঝরে পড়ে তার দিঘির জলে। দক্ষিণে সরকারের মঠ। তিন-চারশো বছরের পুরোনো দেউল। তার দেহে ঢেউ খেলানো কারুকাজ। আর একটু পশ্চিমে একটা অশ্বত্থাগাছ–বুঝি হাজার বছর বয়স হবে তার। এটি গোবিন্দ কীর্তনীয়ার গাছ বলে জনশ্রুতি। কী প্রকান্ড দশদিকে ছড়ানো এর ডালপালাগুলো। ওখানে নাকি কোনো দেবতার বাসা। কেউই চড়ে না ওই গাছে। আর একটা পুরোনো মন্দির গাঁয়ের ঠিক মাঝখানে–ওই সরকারের মঠের সমবয়সি। এরও সর্বদেহে খোদাই-করা পদ্মফুল, লতাপাতা! ওই মন্দিরে দুর্গাপুজো হয় প্রতি আশ্বিনে। গ্রামের পশ্চিম সীমায় সরকারি রাস্তায় একপ্রান্তে সুদীর্ঘ আর সুবিশাল শিমুল গাছ–শালপ্রাংশু মহাকাল। ফাগুনে আগুন-বরন ফুল ফুটিয়ে চেয়ে থাকে ও আকাশের দিকে। এই চতু:সীমার বাইরে ধানের খেত–সবুজ সতেজ। অঘ্রানে বাতাসে ঢেউ লাগে ওদের বুকে। আমরা চেয়ে থাকি অপলক। কী জাদু আর কী মায়া আছে ওই ঢেউ-খেলানো সবুজ খেতে ইচ্ছে হয় সর্বাঙ্গ ভাসিয়ে কেবল সাঁতার কাটি ওই মনভোলানো শ্যামসায়রে। অশ্বথগাছের শোভাই কি কম? ওর লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি পাতা সদাই মুখর, সদাই চঞ্চল প্রাণহিল্লোলে। চৈত্রে কিছুদিন ধরে পাতা ঝেড়ে ফেলে রোদের কিরণ আর হাওয়া টেনে নেয় ও সর্বদেহে। তারপরে আসে একটা চেতনা। একটু সবুজের ছোপ লাগে ডালপালায়। তারপরে ঈষৎ লোহিত। ক্রমে সবুজ রং বদলায় দিনে দিনে–গাঢ় থেকে গাঢ়তর সবুজে।
সরকারি রাস্তাটার একধারে গ্রামের উচ্চ ইংরেজি স্কুল–আর একদিকে বন্দরের মতো হাটখোলা। ওখানে কামারশালে ঢং ঢং করে শব্দ হয় রাতের বেলা। ডগডগে লাল লোহার কণা ছিটকে পড়ে হাতুড়ির ঘায়ে। চমৎকার লাগে দেখতে ওই সৃষ্টিশালা–ওরা শুধু গড়ে।
গ্রামের রাস্তাঘাট গড়েছিল প্রতাপ রায় সদলবলে মাটি কেটে, মাথায় ঝুড়ি বয়ে। তার আগে চলার পথে কোথাও ছিল এক-হাঁটু জল, কোথাও একগলা। তারপরে কতই হল। কত প্রতিষ্ঠান–ইংরেজি বিদ্যালয়, বালিকা স্কুল, ঔষধালয়, দরিদ্র ভান্ডার, লাইব্রেরি আরও কত কী! এসবও সেই প্রতাপ রায়ের গড়া। ভোরে ঘুম ভাঙিয়ে দিত প্রতাপ রায়ের ঘণ্টা তারপরে উষাকীর্তন। শীতকালে খালে জল থাকত না ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত। সদলবলে প্রতাপ রায় টেনে বার করে দিত বিপন্ন মাঝিদের নৌকোগুলো। একবার এই শুকনো খালে আটকে পড়া নৌকোয় ধুকছিল দুটি জ্বরবিকারের রোগী। না ছিল ওষুধ, না পথ্য। তাদের কাঁধে করে ধরে নিয়ে যাওয়া হল আমাদের কাছারি বাড়িতে। সেবা হল দিনরাত। একটি বেঁচে গেল, আর রজনীকে পোড়ানো হল ওই সরকারি রাস্তার ধারে। গ্রামে ওষুধ-পত্তরের অভাব। প্রতাপ রায়ের চেষ্টায় যৌথ তহবিলে হল ঔষধালয়। অশ্বিনীকুমারের আদর্শ রূপায়িত করেছিলেন প্রতাপ রায়–অক্লান্ত শ্রমে। তাই তো তিনি আশীর্বাদ জানাতে আসতেন প্রতি উৎসবে। খুঁজলে আজও পাওয়া যাবে তাঁর পদরেণু।
রামচন্দ্র দাস ছিলেন প্রেমিক, কবি! ফর্সা রং–স্থূলহ্রস্ব দেহ। দুটি বড়ো বড়ো চোখ– প্রীতিরসে ঢলঢল। শুধু ভালোবেসে মানুষ গড়া যায়, তার উদাহরণ জোগালেন রামচন্দ্রবাবু। তাঁর দেহে-প্রাণে-মনে জ্যোতির ঝলক নামত ঊধ্ব থেকে অন্তরের গবাক্ষপথে। তাঁর প্রেরণা আসত যুক্তির পথে নয়, হৃদয়ের অজানিত অন্তঃপুর থেকে–শাশ্বত সত্যের চিরভাস্বর জ্যোতির মতো।
আজ প্রতাপ আর রামচন্দ্রের চিতাভস্ম মিশে আছে ওই পল্লির পথের ধুলোয়। যাঁদের কাছে এই ধুলো ছিল স্বর্ণরেণু তাঁরা ছিটকে পড়েছেন কোন দূর-দূরান্তে। কোথায় সেই নরেন্দ্রনাথ, অমৃতলাল, হরেন গুপ্ত আর রমেশচন্দ্র? তাঁদের চোখে হয়তো ধরণীর আলো হয়ে এসেছে নিষ্প্রভ।
