ব্রজের পথে হায় রে নিতাই,
যদি মোর দেহ পতন হয়–
তবে কৃষ্ণ-নাম লিখো আমার গায়–
ওই তুলসী মৃত্তিকাতে কৃষ্ণ-নাম লিখো–-আমার গায়।
মনসার ভাসান রয়ানি গান হত একাদিক্রমে সাতদিন ধরে। বেহুলার দুঃখের অন্ত নেই কলার মাজুসে স্বামীর অস্থি নিয়ে গাঙের জলে ভেসে চলে বেহুলা সুন্দরী। সেই নদীতীরে গোদা বঁড়শিতে মাছ ধরে।
বুড়িয়া গোদা বঁড়শি বায় তলা বাঁশের ছিপ,
সুন্দরীরে দেইখ্যা গোদা ঘন মারে টিপ।
পেছনে সমবেত কণ্ঠে দোহাররা ধুয়া গায়, ‘বড়ো তা-আ-আপিত’।
ভিন দেশ থেকে আসত কালা বৈরাগী রামায়ণ গাইতে। বাঁকা ঠোঁট বাঁকা চোখ–গলাটা ছিল মিঠে আর ধারালো। সেই গানের কথা আজও দুঃখের দিনে সান্ত্বনা দেয়,
রাম নামের গুণে জলে ভাসে শিলে–এ-এ।
এদের কেউ আর বেঁচে নেই–ওদের গানের রেশ আজও বাজে ওই অশ্বথের পাতায় আর বাঁশবনের মর্মর শব্দে।
গ্রাম্য কবি হারাধন ছিল খোঁড়া। লাঠি হাতে একখানা পা একপাক ঘুরিয়ে স্থির হলে তবে চলত অন্য পা-খানা। কবি বাণীকণ্ঠও ছিল ট্যারা–রচনা ছিল গ্রামের ভাষায়। তারাও নেই, আর তাদের রসিক শ্রোতারাও পালিয়ে গেছে তেপান্তরের মাঠে। গ্রামের যুবকদের মধ্যে কত শত হয়েছে গ্র্যাজুয়েট, কত অধ্যাপক; পি. আর. এস. হয়েছে চারজনা, ক-জনা পি-এইচ. ডি; বিলেত থেকেও ডিগ্রি এনেছে কত সোনার ছেলে, কিন্তু পল্লিমায়ের অদৃষ্টে নেই তাদের মিলিত সেবা পাওয়া! কে. ভি. সেন এনেছিল হাফটোন ব্লকে যুগান্তর; জ্যোতি গড়েছিল আর্টস্কুল। তাঁদের শিষ্য-উপশিষ্যেরা ছড়িয়ে আছে ভারতময়। প্রত্যেক ব্লকের কারখানায় তারাই কর্ণধার। বিলেতে পাস দিয়ে অশ্বিনী সেন গড়লেন হুগলি কটন মিল, দেশের শিল্পে সুর দিলেন গোপাল সেন, দর্শনশাস্ত্রে রস জোগালেন নিবারণ দাশ, দেশবন্ধুর ভগিনী বিয়ে করলেন অনন্ত সেনকে তাঁর কৃতিত্বের আকর্ষণে। তাঁদের অর্থে সম্ভব হল দেশের শিক্ষাদীক্ষা। তারাপ্রসন্ন ব্যয় করলেন মুক্ত হাতে, কিন্তু আজ তাঁদের ঘরে আর দীপ জ্বলে না! রাস্তাঘাট আগাছায় আচ্ছন্ন!
তবু ভুলতে পারি না সেই পল্লিমাকে। বৈশাখে মেলা বসত বটতলায়, আর অশ্বতলায়। দেশি কাঠের পুতুল গড়ে আনত শিল্পী অধরচাঁদ। আর আসত মাটির পুতুল হাঁড়ি-কুড়ি। ফুটি তরমুজও মেলায় আসত রাশি রাশি। সন্ধ্যায় ঠাকুরঘরে ওই ফুটি, তরমুজ, ডাব, ফেনি বাতাসা, চিনির খেলনায় দেওয়া হত নারায়ণের ‘শীতল’। কী মজা ছিল প্রসাদ পেতে! ঘরে ঘরে জমা থাকত মুড়ি, চিঁড়ে, কলা, নারকেল, পাটালি। গাছে গাছে পাওয়া যেত আম, জাম, কাঁঠাল, গাব, ডউয়া, কামরাঙা, লিচু, জামরুল, আরও কত ফলমূল।
শ্রাবণে মনসা পুজো, ভাদ্রে বিশ্বকর্মা পুজোর বাচ, আশ্বিনে দশহরা। ভাদ্রসংক্রান্তি আর দশহরায় আসত লম্বা লম্বা ছিপ-নৌকা। সারি সারি জোয়ান বসত দু-ধারে। বাবরি দুলিয়ে মাঝি ধরত হালের বইঠা। হিন্দু-মুসলমান সমস্যা ছিল না এতটুকু। উৎসবে-পুজো-পার্বণে– ওরাই কর্মী, ওরাই লেঠেল–বাচ খেলে ওরাই। আমরা খালের কিনারে নৌকায় বসে বাচ দেখতাম। খালের জলে ঢেউ উঠত কূল ছাপিয়ে-দুলিয়ে দিত আমাদের নাও।
কার্তিকে রাসপূর্ণিমায় মেলা বসত বাটাজোড়ে। বাটাজোড় মেলার পরেই অঘ্রান মাসের নবান্ন। সোনার ধানে ভরে যেত গৃহস্থের আঙিনা। নবান্নে সবাইকে নেমন্তন্ন জানাতে হবে। মানুষ, পশুপাখিকেও ডাকতে হবে। মনে পড়ে বড়ো বড়ো গাছের কাছে গিয়ে উচ্চস্বরে বলতাম,
ও দাঁড়কাক, ও পাতিকাক
আমাদের বাড়ি শুভ-নবান্ন
তোমরা সবাই যাইয়ো,
চাল, কলা, গুড়, সন্দেশ
পেটটি ভরে খাইয়ো।
মনে পড়ে দেশপূজ্য অশ্বিনীকুমারের একখানা পুরোনো চিঠি পড়েছিলাম অনেকদিন আগে। চিঠিখানা লিখেছিলেন তিনি তাঁর স্ত্রীকে পাঞ্জাব থেকে প্রায় বছর সত্তর পূর্বে। গুরুগোবিন্দ, রণজিৎ সিং, দিলীপ সিং প্রভৃতির কীর্তিকলাপ, তাঁদের অস্ত্রাগার, সমাধিস্থল প্রভৃতি দেখে তাঁর মনে একাধারে যে আনন্দ ও বেদনার উদ্রেক হয়েছিল তাই প্রকাশ করেছিলেন তিনি ওই পত্রে। দীর্ঘ পত্রের একস্থানে তিনি লিখেছিলেন,
…ভারতলক্ষ্মী অবশেষে এই বিশাল ভারতভূমির উত্তর-পশ্চিমে পাঞ্জাবে আশ্রয় লইয়াছিলেন, আজ সেই স্থান হইতেও দূরীভূত হইলেন। ওই অস্ত্রাগারের সম্মুখে বসিয়া শুধু মনে হয় যদি সমস্ত ভারতবাসী পরস্পরের গলা ধরিয়া দুঃখের কাহিনি গাহিয়া ক্রন্দনের রোল তুলিয়া কাঁদিতে পারিত তবে বুঝি কষ্টের কিঞ্চিৎ উপশম হইত। কিন্তু তাতেও বাধা, ‘ফুটিয়া ফুকারি কাঁদিতে না পাই’ এমনি আমাদের দূরদৃষ্ট।…একবার মনে হয় গুরুগোবিন্দের ঢালখানি নিয়া পলায়ন করি, মনে হয় ওই পতাকাগুলি, অস্ত্রগুলি কলঙ্কের নিদর্শনস্বরূপ রাভি নদীজলে বিসর্জন দেই; মনে হয় দলীপের ক্রীড়াসামগ্রী কামানটি বুকে করিয়া উচ্চতরালে কাঁদিতে থাকি–কত কী ভাব হয় কী লিখিব?
দেশনায়ক অশ্বিনীকুমার দেশের অতীত গৌরবের অবমাননা দেখে কেমন মর্মাহত হয়েছিলেন, এ চিঠি থেকেই তা বোঝা যাবে। তাঁর প্রিয় বাংলা, তাঁর প্রিয় বরিশালের আজকের রূপ যদি তাঁকে দেখতে হত কী করে তিনি তা সহ্য করতেন?
.
চাঁদসী
গ্রাম নয়। জননী। আমার পিতৃপুরুষের জন্মভূমি। তাঁদের জীবনপ্রভাতে শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল এ গ্রামের বাতাস, জীবন-সূর্যাস্তে তাঁদের চিতাবহ্নি নিবিয়েছে এ গ্রামের জলরাশি। এ গ্রামেই প্রথম সূর্যালোকের সঙ্গে আমার পরিচয়। আজ সে গ্রাম থেকে চলে এসেছি অনেক দূরে, তবু সেই নবান্নের ঋতু, পুজোর ঋতু, আকাশডাকা ঋতু আমার সমস্ত অস্তিত্বকে আচ্ছন্ন করে দেয়। আমার চিন্তাধারার স্তরে স্তরে লেগে আছে সেই গ্রামটির প্রতি অসীম মমত্ববোধ। সে-গ্রামের পরিচয় লিখতে গিয়ে আজ অশ্রুভারাক্রান্ত হয়ে আসছে দুটি চোখ। সে-গ্রামকে যে কিছুতেই ভুলতে পারছি না। দুঃখদৈন্য নিরাশাম্লান শরণার্থী জীবনে আমার জননী, আমার ছেড়ে-আসা গ্রামের স্মৃতি এখন আশার প্রদীপশিখার মতো অনাহত ও অমলিন।
