সোনালি ভবিষ্যতের কথা তুলত মাঝে মাঝে কচি মেয়ে কল্যাণী। সে আবদার করত, আমাদের গ্রামের এই কাঠখোট্টা নামটা পালটে কাঞ্চনবালা রাখলে হয় না? হিন্দুরা যেমন সবাই লিখতে-পড়তে জানে, মুসলমানরাও সেইরকম লিখতে-পড়তে শিখবে কবে? ওরা সবাই কেন হিন্দুর মতো স্কুলে যায় না, জ্যাঠামশায়? এমনি কত অদ্ভুত অদ্ভুত কথার স্মৃতি ভিড় জমাচ্ছে আজ মনের আকাশে। আজ সে অনেক বড়ো হয়েছে, আমাকে দেখতে এসে সেদিনও বলে গেছে, এখন আর গ্রামের ক-বিঘে জমিই আমাদের বাড়ি নয় জ্যাঠামশাই, এখন আমাদের বাড়ি সমগ্র ভারত জুড়ে!’ কল্যাণী এত দুঃখেও ভেঙে পড়েনি, সে যেন বিরাটত্বের স্বাদ পেয়েছে।
অশীতিপর বৃদ্ধ সাবডেপুটি দেবেনবাবু সমস্ত কাজ ফেলে পুজোর সময় দেশে আসতেন ছুটে। তিনি না এলে মা আসবেন কী করে? তাঁর আসার পরদিন থেকেই শুরু হত আগমনি সংগীত। ভিখারি-বাউলরা সাবডেপুটি বাবুর চারপাশ ঘিরে আরম্ভ করে দিত গান,
আসছেন দুর্গা স্বর্ণরথে
কার্তিক গণেশ নিয়ে সাথে।
আসছেন কালী পুষ্পরথে
মুন্ডমালা নিয়ে গলে।।
দুর্গাপুজোর ধুমধাম যেন আজও জ্বলজ্বল করছে চোখের সামনে। কী হইহুল্লোড়ের মধ্যে দিয়ে কেটে যেত দিনগুলো তা চিন্তা করেও আশ্চর্যবোধ হয় আজ। আজ একটি দিন কাটতে চায় না, দুঃখের জীবনপৃষ্ঠা ওলটাতে যে এত বিলম্ব হয় তা কে জানত আগে! কিন্তু সেদিন সারারাত জেগে রামায়ণগান শোনার উৎসাহ পেতাম কোথা থেকে! আনমনা হলেই সেইদিনকার রামায়ণগানের টুকরো টুকরো কথাগুলো বেরিয়ে পড়ে অজান্তে শত দুঃখকষ্টকে অগ্রাহ্য করে,
অযোধ্যানগরে আজ আনন্দ অপার
রাম রাজ্যেশ্বর হবে শুভ সমাচার।
পল্লব কুসুমহারে কিবা শোভা দ্বারে দ্বারে
প্রতি ঘরে সবে করে মঙ্গল আচার।
মধুর মঙ্গল গীত শুনি অতি সুললিত
বাজনা বাজিছে কত বাজে অনিবার।।
চোখের সামনে স্বচ্ছ হয়ে উঠছে আনন্দমুখর দিনগুলোর কথা। প্রতি ঘরে ঘরে যাদের আনন্দধ্বনি জাগত তাদের ঘরে আজ মর্মরধ্বনি কেন জাগছে? আলোকের ঝরনাধারায় কি এই দুঃখকষ্টকে ধুয়ে ফেলা যায় না আমাদের জীবন থেকে?
এমনি কত শত দুঃখের পাঁচালি মনটাকে করছে ক্ষতবিক্ষত। কোন দুষ্টু ছেলে আমাদের ঢিলের মতো চক্রাকারে ভারতময় ছিটিয়ে দিল? রোহিণী কবরেজমশায়ের ছোটো শিশির স্বর্ণপটপটি আজ গড়াতে গড়াতে এসেছে হাবড়ায়! সারাজীবনব্যাপী শ্রমের ফল, কত বাড়ির জনশূন্য ছবি হয়তো দেখছেন গোপাল দে মশায় বর্ধমানের ঘোলাটে আকাশে! জানকী দাসের লেকচার স্তব্ধ হয়ে গেছে শিয়ালদা প্ল্যাটফর্মের পূতিগন্ধময় পরিবেশে! অত বড়ো বাড়ির মালিক হেমন্ত গুহ সোনার পুতুলি পুত্রকন্যার হাত ধরে এসে মাথা গুঁজেছেন অন্ধকার ক্যাম্পে। তাঁর পঞ্চাশ খন্ড ইংরেজি বিশ্বকোশের পাঠক আজ কারা? কার্ভালোর দামি চকচকে পোশাকটা কী আজ ‘ভবের কোলায়’ (বড়ো মাঠে গড়াগড়ি যাচ্ছে? নরেন বসু উকিল হয়তো থিয়েটারের শখ মেটাচ্ছেন রাঁচিতে! তাঁর সিরাজ আজ চমকে চমকে উঠছে স্বপ্নের মধ্যে আগুন-রক্ত-তরবারি কিংবা বর্শা দেখে!
ভোলা যায় না, ভোলা যাবে না আমার লাঞ্ছিত জন্মভূমিকে। সেই সঙ্গে ভোলা যাবে না বিরাশি বছরের বৃদ্ধ শশী ঠাকরুনের চশমা এঁটে চিঠি পড়ার দৃশ্যকে, ভোলা যাবে না দামোদর বসুর সূক্ষ্ম হিসেব-বিলাসী মনকে, ভোলা যাবে না সাধু ভাষার ধ্বজাধারী ঈশ্বর বসুকে। তিনি সাধুভাষা প্রয়োগ করতেন স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করার সময়েও। তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথনের টুকরো কথাগুলো মনে পড়লে আজও হাসি পায়। একবার সামান্য কলার পাতা ছেঁড়ার জন্যে ঈশ্বরবাবু স্ত্রীকে কড়া তিরস্কার করে বলেন—’এত কষ্টে আনীত, ভাদুসার হইতে কদলীবৃক্ষ, তার পত্র ছিন্ন, কে না হয় বিষণ্ণ?’ বলেই পত্নীর পিঠে সপাং সপাং করে বেত্রাঘাত!
মনে পড়ছে গ্র্যাজুয়েট বর দেখতে গিয়ে এই গ্রামেরই একজন পাত্রের হাতের লেখা চেয়েছিলেন দেখতে। এমন কত শত কাহিনি মনকে উতলা করছে কেন জানি না। যাঁরা মনের অতলে গিয়েছিলেন তলিয়ে তাঁরা সবাই উঁকি দিচ্ছেন একের পর এক। তাঁরা সবাই কোথায় আজ? মনে মনে তাঁদের স্বাস্থ্য, অর্থ, শান্তি কামনা করছি। তাঁরা সুখে থাকুন, ভালো থাকুন।
শুনেছি আমার গাঁয়ে আর পুজো হয় না, নবান্নের ধুম নেই। মানুষহীন গ্রাম শ্বাপদসংকুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার কি কোনোদিন ছেলেরা ভোরে উঠে কাক ডাকবে–’কাউয়া কোকো কো, আমাগো বাড়ি আইয়ো’ বলে? পৌষ সংক্রান্তির আগে কৃষক-মজুররা আর কি গৃহস্থের বাড়ি এসে–”রাজার বাড়ি আইলাম রে!’ বলে দাঁড়াবে? কুমির আর বাঘের পুজোর সঙ্গে রসের পিঠে, চিতে পিঠে খাওয়া হবে আর কোনোদিন?
মনুষ্যত্বের অবমাননা পৃথিবীতে এমন ভীষণভাবে আর কোনোদিন হয়নি, তবুও দুঃখকষ্ট অপমান নির্যাতনের মধ্যে মানুষ অমৃতলাভ করবেই। পাঁচশো বছর আগে তুরস্কের রাজধানী থেকে বিতাড়িত গ্রিক খ্রিস্টানরা পশ্চিম ইউরোপে জ্বেলেছিলেন প্রজ্ঞা ও শান্তির নতুন আলো। সেই আলোয় সমগ্র ইউরোপ আজ হয়ে উঠেছে আলোকিত; অত্যাচারী তুরস্কের পরাজয় হল বিতাড়িত বিধর্মীদের কাছে। মনে হয় বাংলার কাজ হবে নতুন আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে যাওয়া–সমগ্র দেশের প্রাণে নতুন জীবন যোজনা করা। জানি ভারতের জয় অবশ্যম্ভাবী। ছোট্ট জমির মালিক আর আমরা নই, এখন সারাভারতবর্ষ আমাদের মাতৃভূমি। আমাদের সাধনা এখন বিরাট হওয়ার, মহৎ হওয়া প্রাণ-গঙ্গার ঢেউ একদিন ঐরাবতের মতো সমস্ত বাধবিপত্তিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেই, নতুন পরিবেশে আবার আমরা সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াব, আবার আমরা মানুষ হব।
