বাইশ-শো লোকের গ্রাম ছিল কাঁচাবালিয়া। তার বাসিন্দাদের অধিকাংশই ছিলেন ব্যবসায়ী, সুচিকিৎসক, সুবিচারক, কৃতী অধ্যাপক, নামজাদা শিল্পী এবং সংগীতজ্ঞ। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ অর্থোপার্জনের জন্যে বাইরে বাইরে কাটালেও জন্মভূমিকে তাঁরা ভোলেননি একদিনের জন্যেও। তাঁদের আন্তরিক টান গ্রামবাসীকে মুগ্ধ করত! মনে পড়ে, পুণ্যতোয়া নদী হিমালয়ের গাত্র ধৌত করে পলিমাটি সঞ্চয়ের কাজ সমাপ্ত করত যখন, তখন শুভ্র শরতের হত উদবোধন। লক্ষ করেছি সেই শারদপ্রাতে শ্রদ্ধাবনত হৃদয়ে ছুটে আসতেন তাঁরা এই নদীমাতৃক জন্মভূমির পায়ে হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধাভক্তির অর্ঘ্যদানের জন্যে। আজ ইচ্ছে থাকলেও মায়ের কাছে ছুটে যাওয়ার উপায় নেই আমাদের। আমরা এখন পরবাসী, অবাঞ্ছিতের দল। তা ছাড়া সেই জল, সেই হাওয়া কোথায় আজ?
মনে পড়ছে আজ বেশি করে মজিল সাহেবের কথাগুলো! আমাদের দেশ ছাড়া হতে দেখে তিনি একদিন বলেছিলেন—’আপনাদের ভয়টাই বড়ো বেশি।’ স্বীকার করতে মনে বেধেছিল তাঁর অভিযোগটি। আমরা ভীত নই, আমরা কাপুরুষ নই, আমরা দুর্বল নই। আমরা অযথা হানাহানি, রক্তপাতে অসহায় বোধ করি। এই সেদিনও আমাদের গ্রামের ছেলেরা বর্শা দিয়ে বাঘ শিকার করেছে। মাত্র ৩০ বছর আগে আমাদেরই বুটকিন সরকার একখানা খাঁড়া দিয়ে একসঙ্গে দুটো বাঘ ঘায়েল করেছিল। এগুলো গালগল্প নয়, দিনের আলোর মতোই সুস্পষ্ট। তবুও মজিল সাহেবের কথা শুনে চুপ করেই থাকতে হল। তর্ক করে গায়ের শক্তি প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে কী হবে আর? আজও তো কিছু মেয়ে-পুরুষ রয়েছে সেখানে, তাদের মনোবল প্রশংসা করার মতো। সেই শূন্যপুরীতে এখনও যে কেউ কেউ ফিরে যায় তা কি শুধু দুটো ফলের জন্যে, না, অকৃত্রিম প্রাণের টানে?
শহিদ সাহেব আসবার সময় জানিয়েছিলেন—’আপনাদের রক্ষা করলাম, আর আপনারাই আমাদের এভাবে ছেড়ে যাচ্ছেন? এসব কি ভালো করছেন মশায় আপনারা? এখান থেকে এমনভাবে দলে দলে গেলে সিকি লোক মরবেন শুধু না খেতে পেয়ে, গুণ্ডায় মারবে সিকি, আর বাকি লোক মরবেন শীত-গ্রীষ্ম-অনাহারে। এরই পিঠ পিঠ অবশ্য বলেছিলেন গম্ভীর হয়ে কেটে কেটে—’আমরা মসজিদে মোনাজাত করার সময় খোদার কাছে প্রার্থনা করেছি এই বলে,-খোদা, আমাদের প্রতিবেশীদের যেন কোনো অনিষ্ট না হয়। তারা সুখে থাকুক, শান্তিতে থাকুক।’ শহিদ সাহেবের কথা আজও কানে বাজছে। তাঁর প্রার্থনা খোদার কানে গেছে কি না জানি না কিন্তু এমন দরদি মনের পরিচয় পেয়ে সেদিন চোখ দিয়ে আমার কৃতজ্ঞতার জল ঝরে পড়েছিল।
কিন্তু সুবিধাবাদী চ্যাংড়ার রূপ সর্বত্রই এক। ওখানেও তার ব্যতিক্রম নেই। আমাদের মধ্যে যখন এই ধরনের হৃদয়াবেগের কথা হচ্ছিল ঠিক সেই সময় এসে হাজির হল আসমান। খানিকক্ষণ হাঁফ ছেড়ে সামনের চেয়ারটায় বসে দু-বার লাঠি ঠুকে অকস্মাৎ প্রশ্ন তোলে-‘কী কইছ মেয়ারা? আমাগো পাকিস্তান ছাইড়্যা মহায়রা এরকম যায় কা?’ তারপর একটা চোখ ছোটো করে আমার দিকে তাকিয়ে নিম্নকন্ঠী ষড়যন্ত্রীর মতো বলে—’হুনছি কিছু ব্যাচোনের আছে? বাড়িডা বোলে ব্যাচবেন?’ তার কথা শুনে আমরা সবাই তাজ্জব বনে গিয়েছিলাম। ছোকরা বলে কী, বাড়ি কেনার টাকা হল কোথা থেকে ওর?
কথাটা যাচাই করার জন্যে মজিল সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—’এই আপনার দল? এরাই আমাদের রক্ষা করবে বিপদ-আপদের মধ্যে?’ কাঁদো কাঁদো হয়ে ম্লানমুখে মজিল সাহেব শুধু জানালেন–সবই বুঝি ভাই, একটা কথা কী জানেন? এমনিভাবে হিন্দুরা গ্রাম ছেড়ে চলে গেলে আমরা কাদের নিয়ে থাকব বলুন? আপনাদের সঙ্গে একত্রে এতদিন বসবাস করার পরেও যদি অনাত্মীয়ের মতো আমাদের ছেড়ে যান তাহলে তার চেয়ে বড়ো সর্বনাশের কথা আর কী হতে পারে! এরা শিশু, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করার বুদ্ধি কোথায় এদের? পাপের আপাতমধুর স্বাদেই বিভোর হয়ে রয়েছে এরা, এদের কথার তাই দাম নেই কিছু। সমস্ত হিন্দু গ্রাম ছেড়ে গেলে হিন্দুর মনে যেরকম কষ্ট লাগে, আমাদেরও সেই একইরকম কষ্ট হয়। লক্ষ করেছি কথা বলতে বলতে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল তাঁর চোখ বেয়ে। জানি না মজিল সাহেবের সাঙ্গোপাঙ্গরা তাদের হিন্দুভাইদের অভাব অনুভব করেন কি না আজও, কিন্তু আমরা দু-বেলা স্মরণ করি তাঁদের অশ্রুরুদ্ধ নয়নে। আজ তাই বারবার মনে পড়ছে মজিল সাহেব আর শহিদ সাহেবের কথা। কিন্তু গ্রাম ছাড়ার সময় তাঁরা আরও নিবিড় করে বাধা দিলেন না কেন? কেন তাঁরা প্রাচীর তুলে দিলেন একই মায়ের বুকের ওপর? এ সর্বগ্রাসী দুঃখ তো ভবিষ্যতের হিন্দু-মুসলমান মানবে না। এ যে সকলকেই নিষ্ঠুরভাবে দলন করে চূর্ণ করে দেবে! তবে দুঃখী মানুষ আজও কেন জাতিভেদের জাঁতাকলে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে অকারণ? কেন তারা বিদেশি চক্রান্তের ক্রীড়নক হয়ে নিজের সর্বনাশ নিজে করছে আহাম্মকের মতো? এ প্রশ্ন কাকে করি? কে উত্তর দেবে? পাকিস্তান থেকে মজিল সাহেবও কি এমনি চিন্তাই করছেন আজ?
এমন সোনার দেশ কি কারও ছাড়তে ইচ্ছে হয়? প্রথম প্রথম ভীত মানুষ যখন দু-একজন করে ঘরবাড়ি বিক্রি করে দিয়ে চলে আসতে শুরু করে তখনও প্রমদা ঠাকরুন গৃহনির্মাণ ও উদ্যানরচনায় ব্যস্ত। দেশে এমন দাবানল জ্বলে উঠবে কে চিন্তা করেছিল? ভাইয়ে ভাইয়ে কোন্দল হয়, আবার মিটেও যায়, কিন্তু সেদিনের সামান্য ফুলকিই যে দেশজোড়া তান্ডবের সৃষ্টি করবে তার হদিশও সামান্য মানুষ পায়নি! প্রমদা ঠাকরুন মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন, গ্র্যাজুয়েট পুত্রবধূ এনেছিলেন ঘরে। নিজে লেখাপড়া তেমন না জানলেও বিদ্যার প্রতি শ্রদ্ধা ছিল তাঁর আন্তরিক। সেই বৃদ্ধ বয়সেও তিনি খাটতে পারতেন অসম্ভব। নিজের হাতে বেঁধে তিনি কত ভোজ নামিয়ে দিয়েছেন গাঁয়ের। জানি না তাঁর সাজানো বাগান আজ শুকিয়ে গেছে কি না!
