.
কাঁচাবালিয়া
জল–জল–জল, চতুর্দিক জলে ভরতি। মনোরম সরসতা। জল দেখে চিত্ত বিকল হয় না, আশা জাগে, মন ভেসে যায় সাতসমুদ্দুর তেরো নদী পারের নারকেল-সুপারিঘেরা, সবুজ দারুচিনি দ্বীপের প্রাণমাতানো পল্লিমায়ের কাছে! শুষ্ক রুক্ষ শহরের বুকে বসে আজ বেশি করে মনে পড়ছে আমার জননী জন্মভূমির কথা, আমার সোনার বরন কাঁচাবালিয়াকে। আজ আর তার সোনার রং নেই, পুড়ে কালো বিবর্ণ হয়ে গেছে। মানুষের লোভ, মানুষের স্বার্থ, ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব তার গৌরবময় ঐতিহ্যের গায়ে কালি ছিটিয়ে দিয়েছে। আমাদের বর্বরতা, আমাদের কলঙ্ক, আমাদের বিরোধ সমস্ত কিছু সৎপ্রচেষ্টারই ঘটিয়েছে অবসান। যে দেশের বাতাস টেনে নিয়ে এত বড়োটি হয়েছি, যে দেশের ধুলোয় উঠেছে শরীর গড়ে, যে দেশের খাদ্য জুগিয়েছে শক্তি, সেই দেশকে আমরা আর নিজের জন্মভূমি বলতে পারছি না ভেবে বুক ফেটে যাচ্ছে অসহ্য ব্যথায়! আজকের এই হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীর বুকে কে শান্তির বারি সিঞ্চন করবে জানি না, পৃথিবীর উত্তপ্ত বুকে কে শীতলতা বইয়ে দেবে তার সন্ধানই করছি শত দুঃখকষ্টকে অগ্রাহ্য করে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে ঘুরে। কবে দেখা পাব আমরা সেই মহামানবের, কবে বলতে পারব রবীন্দ্রনাথের মতো–’ওই মহামানব আসে, দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে?’
শরীরে শিরা-উপশিরার যেমন কাজ রক্ত চলাচলে সহযোগিতা করা, তেমনি নদীর কাজ দেশের বুকে ফসল ফলাবার। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখবার কাজে নদীই প্রধানতম সহায়, তাই আমাদের গ্রামখানি ছিল এত সজীব, এত সৌন্দর্যের প্রতীক। জালের সুতোর মতো অসংখ্য খাল-বিল দিয়ে জোয়ারের জল আসত জীবনের জোয়ার নিয়ে। খালের প্লাবন ধ্বংসমুখী হয়ে কোনোদিন কাঁচাবালিয়ার বুকে দেখা দেয়নি, সেখানে নদী বর্ষাকালেও গ্রাম প্লাবিত করে যেমন মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে না, তেমনি আবার শীতকালেও জলের অভাব ঘটিয়ে মানুষকে নাকের জলে চোখের জলে করে ছাড়ে না। উত্তর অঞ্চলের গোঁয়ার নদীর মতো দুষ্ট আমাদের গ্রামের নদী নয়, সে মানুষের মতোই মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝে, মানুষের সুখদুঃখের মধ্যেই নিজেকে জড়িয়ে রাখতে চায় সে গৃহস্থ বধূর মতো! আমার গ্রামবাসীরা সেদিক থেকে ছিল সত্যি ভাগ্যবান। অধ্যাপক হেম গুহ তাই মাঝে মাঝে রসিকতা করে নদীটিকে আহ্বান জানাতেন ‘ভেনিস সুন্দরী’ বলে!
যথার্থ নাম হয়েছিল এই ‘ভেনিস সুন্দরী’। ঝরঝরে, তকতকে, পুণ্যতোয়া ব্রীড়াবনতা শান্ত নদীর অন্য কোনো নাম যেন মানায়ই না। নারকেলকুঞ্জ, সুপারির বাগান, আম-কাঁঠাল কদলীগুচ্ছের ধারে ধারে বাঁশবন-ঘেরা সুদৃশ্য সব বাড়ি–কুড়ি-ত্রিশ হাত পরিসর খাল চলে গেছে এঁকে-বেঁকে সুতোর মতো সমস্ত বাড়িকে স্পর্শ করে। আবার কোথাও কোথাও পরিখার আকার ধারণ করে বেষ্টন করেছে গোটা গ্রামকে। সীমার মধ্যে অসীম হয়ে ওঠার সাধনাই যেন তার প্রধান সাধনা। এ হেন উত্তর বরিশালের মধ্যমণি ছিল আমার ছেড়ে-আসা গ্রামখানি। বঙ্গজ কায়স্থ প্রধান কাঁচাবালিয়ার সীমানা ছিল এক মাইলেরও কম, কিন্তু তাতেই সে কখন গড়ে তুলেছিল তার নিজের ঐতিহ্য। সৌন্দর্য সাধনার ক্ষেত্রে সে হয়ে উঠেছিল মহিমময়ী, মহীয়সী!
প্রবাদ আছে, সম্রাট শাজাহানের রাজত্বকালে দক্ষিণের মগ-অত্যাচারের হাত থেকে প্রাণ মান-ইজ্জত রক্ষার জন্যেই গুহ আর বসু বংশীয়েরা চলে এসে বসতি স্থাপন করেন এখানে। চন্দ্রদ্বীপের ভূঁইয়া কন্দর্পনারায়ণের আশ্রয়ে পার্শ্ববর্তী গাভা, নরোত্তমপুর, বাণারিপাড়া, উজিরপুর, খলিসাঁকোটা প্রভৃতি গ্রামে দেখতে দেখতে বিরাট সভ্য সমাজ গড়ে উঠল। ইংরেজ আমলের মাঝামাঝি এসে এঁদের অনেকেই কৌলিন্যের খোলস ত্যাগ করে ছোটো ছোটো নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়েন জ্ঞান ও অর্থের উৎস সন্ধানে। তাঁদের কেউ কেউ যান ঢাকায়, কেউ কেউ সরাসরি কলম্বাসের মতো পাড়ি দেন কলকাতা মহানগরীতে! সেকালে ম্যাট্রিক এবং ছাত্রবৃত্তি পাস করে অনেকে ডাক্তারি লাইনেও গিয়েছিলেন। চিকিৎসাজগতে গিয়ে সুনাম প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে কটকের জেলা অধিকর্তা মণীন্দ্র গুহের পিতা কীর্তি স্থাপন করেছেন। সে-সময় পদ্মা নদী এত বিপুলকায়া হয়ে ওঠেনি। সবে রাজা রাজবল্লভের কীর্তিনাশ করতে আরম্ভ করেছে। আমার পূর্বপুরুষগণ দেখেছেন সেই কীর্তিকে গ্রাস করেছে কী করে কীর্তিনাশা পদ্মা। প্রতিমার চালচিত্রের মতো ধীরে ধীরে ডুবে গেছে সেই সভ্যতা, সেই সংস্কৃতি, সেই বীর্যবান পুরুষের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। ভাবলেও শিহরন জাগে শরীরে– সেইদিনকার মতোই কি আমাদেরও কীর্তিনাশ হল না আজ? আজকের মতো অসহায়তা নিয়ে সেইদিনের বুকেও কি দুঃখের বুদবুদ ওঠেনি মানবমনে?
কিন্তু সেই শ্মশানের মধ্যে থেকেই আলো উঠেছে জ্বলে। সভ্যতার মৃত্যু নেই, সভ্যতার মধ্যেই মানুষ থাকবে বেঁচে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই আবার গড়ে উঠল রাস্তাঘাট, পুকুর, দালান, টিনের কোঠা, পাকা দালান–আবার গ্রাম শ্রীমন্ডিত হল রাজবল্লভের বংশধরদের আপ্রাণ চেষ্টায়। প্রাণের বাতি জ্বালালেন গ্রামে গ্রামে, আবার মানুষের মুখে ফুটল হাসি, গান, গল্প। মানুষ আবার মানুষ হল!
সেই হাসিগানের রেশ মেলাতে না মেলাতেই আবার নেমে এল বিপদের কালো যবনিকা, শঙ্কিত মানুষ দিশেহারা হয়ে প্রাণভয়ে ছুটল দেশ-দেশান্তরে! কেন এমন দুর্ভাগ্য নেমে আসে বারবার লাঞ্ছিত মানুষের ভাগ্যে? মগের অত্যাচার থেকে জীবন বাঁচাতে একবার আমাদের দেশত্যাগী হতে হয়েছিল–আবার দেশত্যাগে বাধ্য হলাম বিংশ শতাব্দীর হিংস্র বর্বরতার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে! ইতিহাস আমাদের ভাগ্যে কী লিখেছে জানি না,–আজ শুধু তার নির্মম রসিকতাটুকুই উপভোগ করছি সর্বস্ব খুইয়ে নতুন ইহুদির পর্যায়ে নেমে এসে! ভারত-পাকিস্তানের সংখ্যালঘু মন্ত্রীদ্বয় সেদিন বানারিপাড়া গিয়ে নিশ্চয়ই দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রামের শ্মশানশ্রী দেখে! দেখবার সময় তাঁদের একবারও কি মনে হয়নি সেই কাম্বোডিয়ার সুষুপ্তা সুন্দরী বা Sleeping Beauty-র উৎসভূমির এমন বৈধব্য-মলিন চেহারা কেন হল? কোথায় গেল তার সৌন্দর্য? কোথায় গেল সেই পূর্বস্মৃতির রুপালি রূপ। শতবর্ষ আগে ভয়াবহ ওলাওঠা যা করতে পারেনি, সর্বনাশী ৭৬-এর মন্বন্তরে দেশের যে হাল হয়নি, ১৩৫০-এর নাগিনির দীর্ঘশ্বাস যে গ্রামের অঙ্গে কালির কলঙ্ক লেপে দিতে পারেনি, সেই অভাবিত সর্বনাশ কেন হল স্বাধীনতা লাভের মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে? রবীন্দ্রনাথ বলেছেন মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। কিন্তু মানুষ কি আজ আর মানুষের পর্যায়ে আছে? মানুষ কেন মানুষকে আজ সাপের মতো ভয় করছে? জানি মানুষের ওপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই আজকের যুগের প্রধানতম সংগ্রাম! সেই সংগ্রামে জয়ী হব আমরা–হে ঈশ্বর, শক্তি দাও আমাদের মনে! আমরা অমৃতের পুত্র–বিষক্রিয়া আর কতদিন কাজ করবে আমাদের ভেতর?
