আমাদের গ্রামে ব্রত-পুজো-পার্বণ লেগেই থাকত। তার মধ্যে দুর্গাপুজোটাই ছিল বিশেষরকম উল্লেখযোগ্য। লক্ষ্মীপুজোর মতোই ঘরে ঘরে হত দুর্গাপুজোর আয়োজন। একটা গ্রামে চল্লিশটি পুজো, সে কী কম কথা! পুজোর সময় গ্রামের চেহারাই যেত বদলে, সবার মুখে আনন্দের ছাপ। মহালয়ার দিন থেকেই হাটে-বাজারে সর্বত্র ভিড়–ছিমছাম ধোপদুরস্ত জামা-কাপড়ে সজ্জিত যুবকদের দেখে নির্জন গাভাকে এক নতুন শহর বলেই ভ্রম হত! যেসব ঢাকি বাঁধা ছিল তারা তো আসতই, উপরন্তু বাণারিপাড়ার বাজার থেকে আরও ঢাকি বায়না করে আনা হত উৎসবকে বেশি সজীব করে তোলার জন্যে। এই ঢাক বাছাই করা যার-তার দ্বারা হত না, এর জন্যে প্রয়োজন হত অভিজ্ঞ লোকের তৈরি কান! বাজনার সঙ্গে চমকদার নাচ দেখিয়েও ঢাকিরা খদ্দেরদের মন আকর্ষণ করত অনেক সময়। সেই ঢাকিরা বেশির ভাগই ছিল ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া অঞ্চলের মুসলমান। এরা সাধারণত ‘নাগারচি’ বলেই পরিচিত ছিল। পুজোর আর একটি জিনিস বেশি করে মনে পড়ছে, সেটি হল আরতি-আমাদের দেশে বলে ‘আলতি’। এই আলতি বরিশাল জেলারই একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আচার। পুরোহিতের আনুষ্ঠানিক আরতি শেষ হয়ে গেলে বাড়ির ও গাঁয়ের ছেলেরা এবং অনেক বাড়িতে ভাড়াটে ওস্তাদরা এই আলতি দিত। এক এক বাড়িতে রাত্রি কাবার হয়ে যেত, তবু শেষ হত না আলতি! সেরে সেরে ধুনো, গুগগুল ও ঝাঁকা ঝাঁকা নারকেল ছোবড়া পুড়ে ছাই হত। কতরকম কসরত ছিল এই অনুষ্ঠানে–একসঙ্গে দু-হাতে দুটো ধুপচি ও মাথায় একটা ধুপচি নিয়ে তান্ডবনৃত্য নাচলেও মাথার ধুপচি স্থানচ্যুত হত না দেখে আমি অবাক হয়ে যেতাম শৈশবে। যাঁদের বাড়িতে এসব পাট ছিল না তাঁদের ঢাকি গিয়ে যোগ দিত পাশের বাড়িতে। আলতির সময় ঢাকিদের চাঙ্গা রাখার কত প্রক্রিয়াই না ছিল–কতভাবে সিদ্ধির শরবত করে যে ওদের খাওয়ানো হত তার ইয়ত্তা নেই।
ধান-চালের দেশ বরিশাল জেলা, কাজেই সেখানে নবান্নের ঘটা যে একটু বেশি হবে তাতে আর আশ্চর্য কী! ধনী-দরিদ্র সকলেই সাধ্যানুযায়ী নবান্ন করত। অগ্রহায়ণ মাস ভরেই চলত এই নবান্নের আবাহন। পুজোর মতোই এ উপলক্ষ্যে বাড়ি ফিরতেন অনেক প্রবাসী লোক। নীল পুজোও আমাদের গ্রামে কম হত না। কয়েকদিন ধরে ‘বালা’-র নাচ, হরগৌরীর বিবাহের পালা, নানা ধরনের সং আর শোভাযাত্রা এবং শেষে ভোগ সরানো। চৈত্রসংক্রান্তির দিন দারোগাবাড়িতে মেলা বসত। সেই থেকে সমস্ত বৈশাখ মাস ধরেই গ্রামে মেলা চলত। ছেলে-মেয়ে, বউ-ঝি, চাকর-দাসী সকলেই এই মেলা উপলক্ষ্যে বাড়ির কর্তাদের কাছ থেকে পার্বণী পেত। মেলার সময়কার হাসিখুশি ছবিটির কথা মনে পড়লে আজও উন্মনা হয়ে পড়ি। সেদিনকার আনন্দের দিন কি আর কখনো ফিরে আসবে না মানুষের জীবনে? অত বড়ো গ্রাম আজ একেবারে ছন্নছাড়া শ্মশানভূমিতে পরিণত হয়েছে। শিবাদল শ্মশান জাগিয়ে শব-সাধনায় মেতেছে, এ মাতনের শেষ কোথায়?
আমাদের অঞ্চলটি সবদিক থেকেই বরিশাল জেলার একটি উন্নত এলাকা এবং আশপাশের ছোটো-বড়ো গ্রামগুলোও বাংলাদেশে কমবেশি পরিচিত। এসবের মধ্যে বাণারিপাড়ার কথাই সবিশেষ বলা যায়–গ্রাম হয়েও শহরের মর্যাদা তার। বন্দর এবং বড়ো হাট-বাজারের গঞ্জ হিসেবে তার প্রসিদ্ধি। পাশেই নরোত্তমপুরে রায়ের হাট নামকরা হাট। বাকপুর গ্রামে মাঘী সপ্তমীতে সূর্যমণির যে বিরাট মেলা বসত তার কথা সবারই জানা। আমাদের গ্রামের পাশেই মৌলবি ফজলুল হকের গ্রাম চাখারের অধুনা খুব উন্নতি হয়েছে। হক সাহেবের দৌলতে একটি কলেজও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এখানে–এ ছাড়া নতুন নতুন রাস্তা, সাব-রেজেস্ট্রি অফিস হওয়ায় গ্রামের চেহারা গেছে পালটে। আমাদের গ্রামের একদম লাগাও পূর্বদিকে ব্রাহ্মণ প্রধান বীরমহল গ্রাম, আর তা ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে গেলেই কাঁচাবালিয়া ও রামচন্দ্রপুর। গাভার দক্ষিণ-পশ্চিমে বিল অঞ্চলে আটঘর ও কুড়িয়ানা গ্রাম দুটি নমশূদ্র-প্রধান। এ অঞ্চলের মাটিতে সোনা ফলে বলে প্রসিদ্ধি আছে। এখানকার শাকসবজি ও ফলমূল, বিশেষ করে আখ আর পেয়ারার সত্যি তুলনা হয় না। দীর্ঘ মাপের সোনালি রঙের আখ আর কাশীর পেয়ারার চেয়েও বড়ো পেয়ারা লুব্ধ করে যেকোনো লোকের মনকে! নমশূদ্ররা গ্রাম ছাড়বে না বলেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল, কিন্তু শুনলাম তারাও আটঘর ও কুড়িয়ানার মায়া ত্যাগ করে কোথায় যেন চলে গেছে।
ছুটির সময় যখন গ্রামে ফিরতাম তখনকার মানসিক অবস্থা বর্ণনা করা সম্ভবপর নয়– স্টিমার যেয়ে ভিড়বে স্টেশনে, সে পর্যন্ত দেরি সহ্য হত না প্রবাসী মনের। স্টিমার থেকেই চোখে পড়ত পল্লিমায়ের মনোমেহিনী রূপ! প্রথম সূর্যকিরণে বাসন্ডার জমিদারবাড়ির নবরত্ন মঠের চূড়া জ্বলত জ্বলজ্বল করে, খালের জলে পড়ত তার শতধা প্রতিচ্ছবি। ঘাটে বাঁধা থাকত জমিদারদের সবুজ বোট। চলার পথে একে একে উঁকি দিত বাসন্ডার স্কুল, বাউকাঠির হাট, পিপলিতার রায়ের বাড়ির দরজার মঠ, আরও কত কী! এসব অতিক্রম করলেই দেখা পেতাম গাভা স্কুলের–তখন মন বল্গাহীন, অপূর্ব হিল্লোলে হৃদয়তন্ত্রী উঠত নেচে। পটে আঁকা ছবির মতো পরিচ্ছন্ন আমার গ্রাম,-পূর্বের বাড়ির ‘রেন ট্রি’ গাছের কাছে নৌকো বেঁধে লাফিয়ে পড়তাম পল্লিমায়ের কোলে, শরীর স্নিগ্ধ হয়ে যেত তখন। তাড়াতাড়ি সোজা রাস্তায় লোকের বাড়ির মধ্য দিয়েই ছুটে যেতাম আমার কুটিরে–যেখানে জন্মভূমির সঙ্গে জননীর স্নেহের পরশ ছিল মিশে। তাঁদের দ্বৈত স্নেহে আমি ধন্য হয়েছি একদিন, কিন্তু আজ? সেসব আকর্ষণী শক্তি কোথায় গেল? নিজের গ্রামে যাওয়ার কথাও ভাবতে পারি না কেন? সব কিছু হারিয়ে কেন আমরা সর্বহারা উদবাস্তু হয়েছি? স্বাধীনতার জন্যে? সে-স্বাধীনতা কোথায়? আবার কবে আমার জন্মভূমির কোলে ঠাঁই পাব, তার দিন গোনা ছাড়া উপায় দেখছি না কিছু। মনকেই প্রশ্ন করছি বারবার–মায়ের ডাকে আবার আমরা মিলব কবে? কবে মায়ের পায়ে আবার মাথা ঠেকাবার সৌভাগ্য হবে?
