গাভার সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে তাঁরাই জানেন দারোগাবাড়ির দৃশ্য ও তার বিরাটত্বের কথা,-পূর্ববঙ্গের বড়ো বড় জমিদারবাড়ির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার স্পর্ধা রাখে এটি। খালের ধারে প্রকান্ড সুদৃশ্য ঘাটলা, নহবত, নবরত্ন মঠ–তার ওপরে স্থাপত্যশিল্পের কুশলী নিদর্শন, পুজোমন্ডপ, বিরাট বিরাট থামওয়ালা নাটখানা, লাইব্রেরি ইত্যাদি দেখলে দর্শককে বিস্ময়াবিষ্ট হতে হয়। এর পরেই সন্তোষের মহারাজা স্বর্গীয় সার মন্মথের দাদামশায় বাবু ঈশানের দালানের কথা বলা যায়। কত বিরাট আর উঁচু হতে পারে একতলা দালান এ তারই যেন একমাত্র দৃষ্টান্ত। সে একতলা কলকাতার তিনতলার সমান।
বর্ষাকালে আমাদের দেশে এঁটেল মাটির কাদা হয় খুব। পায়ের কাদা মাথায় ওঠে এবং ছাড়তে চায় না বলেই অনেকে এই কাদাকে বলেন ‘মায়া কাদা’! সত্যিই মায়া কাদা, তা না হলে সে কাদা আজও কেন তেমনি করেই মনের চারপাশে লেপটে আছে? হাজার চেষ্টাতেও উঠছে না সে-মাটি,-সে-মাটির মায়া কত তীব্র আজ দূরে বসে বুঝতে পারছি বেশি করে! ছোটোবেলায় বর্ষাকালে রাস্তার মাঝে মাঝে লম্বা লম্বা চারে (সাঁকো) পারাপার হতাম খাল। পরে গাভা সম্মিলনীর চেষ্টায় তা পাকা হয়েছে।
নেতাজি সুভাষচন্দ্রের পূতচরণের স্পর্শলাভ করে আমার গ্রাম ধন্য ও পবিত্র হয়ে আছে। হিজলি বন্দিনিবাসে পুলিশের গুলিতে নিহত শহিদ তারকেশ্বর সেনের চিতাভস্ম নিয়ে নেতাজি সেবার গৈলায় আসেন এবং বরিশাল পরিদর্শন করেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। খবর পেয়ে আরও দুজন বন্ধুর সঙ্গে গৈলায় গিয়ে চেপে ধরলাম—’সুভাষদা, আপনাকে গাভা যেতেই হবে।’ সে স্নেহের দাবি এড়াতে পারেননি তিনি। গ্রামে একটি শিল্পকলা ও কৃষি-প্রদর্শনীরও ব্যবস্থা হয় সেসময়। সুভাষচন্দ্র সেই প্রদর্শনী উদবোধন করেন। সেবার তিনি আমাদের গ্রামের খদ্দর বয়ন প্রতিষ্ঠানটিও পরিদর্শন করেন এবং গ্রামের মধ্যে এমন একটি প্রতিষ্ঠান দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি বলেছিলেন–এই গ্রাম ও এই প্রতিষ্ঠান দুটোই যথার্থ বড়ো, আর আমরা তাঁর এই প্রাণখোলা উৎসাহ-বাণী পেয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু আজ কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল! এক-একবার ভাবি, নেতাজি যদি এখনও ফিরে আসেন তাহলে আবার হারানো গ্রামকে, হারানো মাকে হয়তো ফিরে পেতে পারি।
ফুটবল খেলায় আমাদের গ্রাম একসময় ছিল শ্রেষ্ঠ–গাভার টিমের দাপটে বরিশাল জেলা কাঁপত ভয়ে। খেলা ছাড়াও নাম করার মতো ছিল আমাদের নিজস্ব থিয়েটার ক্লাব-পুজোর পর প্রতিবৎসরই থিয়েটার হত মহাসমারোহে। এই অভিনয়-প্রতিভাও জেলার গর্বের বিষয়। আমাদের থিয়েটার ক্লাব ছিল এমনি নামকরা। এ ক্লাবের অভিনয় দেখতে বানারিপাড়া, কুন্দহার, বাইসারি, নরোত্তমপুর, কাঁচাবালিয়া, নারায়ণপুর, ভারুকাঠি, রামচন্দ্রপুর, বীরমহল প্রভৃতি দূরাঞ্চল থেকেও বহুলোক আসত। গ্রামে যাত্রা হলে হিন্দু-মুসলমান সকলেই ভিড় করত-এক এক রাত্রে বিশ হাজার লোকের সমাবেশও দেখেছি। দেশ বিভাগের তিন-চার বৎসর আগে থেকে স্কুলবাড়ির উৎসাহী যুবক নির্মল ঘোষ পুজোর পর নিয়মিতভাবে তাঁর বাড়িতে তিন পালা করে যাত্রা ও সঙ্গে জারি গান দিতে আরম্ভ করেন এবং দেশ বিভাগের পরেও তা চলে আসছিল, কিন্তু এবারের শেষ ধাক্কায় সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে শুনেছি! যাত্রার সময় দেখেছি উৎসাহ মুসলমানদেরই বেশি। কুড়ি হাজার দর্শক হলে তার মধ্যে পনেরো হাজারই থাকত মুসলমান এবং তাতে স্থানীয় মুসলমান মাতব্বর ও মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকরাই শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষারও ব্যবস্থা করতেন। গান না হলে মুসলমান ভাইরাই দুঃখিত হতেন বেশি, জিজ্ঞাসাবাদ এবং অভিযোগের অন্ত থাকত না তাঁদের।
ছেলেবেলার টুকরো টুকরো কত কথাই না মনে পড়ছে আজ! স্নানের সময় পুকুরে ডোবানো, ‘নইল-নইল’ খেলা, কৃত্রিম জলযুদ্ধের মহড়া, খালে নৌকাবাইচ প্রভৃতিতে সেসব ফেলে-আসা দিনগুলো ভরপুর। আনন্দের নির্যাসে পরিপূর্ণ ছিল আমার গ্রামের দৈনন্দিন জীবন। গ্রামে পুকুরের অভাব নেই, ছোটো-বড়ো পুকুর মিলে শ-পাঁচেক তাদের সংখ্যা। এসব পুকুরে স্কুল পালিয়ে ছিপ ফেলে লুকিয়ে মাছ ধরাও ছিল মস্ত একটা আকর্ষণ। জাল দিয়ে মাছ ধরার দিনে যে হইচই চলত আজও তা মনের চোখে স্পষ্ট দেখতে পাই। দু-চারটে বড়ো দিঘিও ছিল গ্রামে, তবে তাতে জলের চেয়ে দল-দামই জমে থাকত বেশি সময়, ওপর থেকে পুকুর বলে বোঝাই যেত না। এমনি একটা দিঘিকে জঙ্গল বলে ভুল করে একবার তাড়া খাওয়া এক চোর প্রায় ডুবতেই বসেছিল! দামের নীচে প্রায় দশ-বারো হাত জল থাকত সবসময়। ভবানী ঘোষের বাড়ির দরজার দিঘির পাড়ে দিনের বেলাতেই গা ছমছম করত–দিঘির পাড়ে তাল, তেঁতুল, গাবগাছের সমাবেশ সে-স্থানটিকে করেছিল আরও ভয়ংকর। শুনেছি আগে নাকি ওই দিঘির জলে চড়কের গাছ ফেলে রাখা হত এবং আর কেউ তার কোনো সন্ধান পেত না–কিন্তু চড়ক পূজার আগের দিন দিঘির পাড়ে এসে ঢাক বাজালে চড়কগাছ নিজে থেকেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠে পড়ত। গ্রামের মুসলমান পাড়ার শেষপ্রান্তে অবস্থিত ‘গুনা চোতরা’-র দিঘি সম্পর্কেও একইরকম অলৌকিক কাহিনি শোনা যায়।
ছোটোবেলার এক উত্তেজনাকর খেলা ছিল ঘুড়ির প্যাঁচ, অর্থাৎ ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা। এ নিয়ে বহু কলহ-বিবাদ হয়ে গেছে বন্ধুদের সঙ্গে! ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে দুর্ঘটনাও কম ঘটেনি–জীবনান্ত পর্যন্ত হয়ে গেছে। আমিও একবার সাক্ষাৎ যমালয় থেকে সসম্মানে এসেছি ফিরে। মাস ছয়েক ঝোলভাতের ব্যবস্থা করে দিয়ে ডাক্তার দাদু হেসেছিলেন আমার দুরন্তপনার কথা শুনে,–বাবা-মাও কম ভর্ৎসনা করেননি সেদিন। ঘুড়ি-লাটাই সেইদিনই দূর করে দিয়েছিলেন বাড়ি থেকে, অসহ্য ব্যথায় আমি পিটপিট করে শুধু দেখেই গিয়েছিলাম মর্মান্তিক ঘটনাগুলো! আজ মনে পড়লে হাসি পায়, ছোটোবেলায় ঘুড়ি-লাটাইকে কী দুর্মূল্য বস্তু বলেই না মনে হত! আর তা অন্য লোককে দান করে দেওয়ায় সেদিন যে দাগ লেগেছিল তার কোনো অর্থই আজ আর ভেবে পাই না। সে মন আজ অদৃশ্য, সামান্যকে অসামান্য করে দেখা যে কত কঠিন তা আজ বুঝতে শিখেছি। সে মন কী আমাদের সম্পূর্ণ মরে গেছে? এই ঘুড়ি ওড়ানোর মতো আর একটা ডানপিটে কাজ ছিল আমাদের–সে হচ্ছে অন্ধকার রাত্রিতে মজা করে ডাব পেড়ে খাওয়া। এর জন্যেও বহুলাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছে আমাদের। ডাব-সমুদ্রের দেশেও ডাব চুরি করতে গিয়ে বকুনি খেয়েছি। অবশ্য এটা ঠিক চুরির পর্যায়ে পড়ে না–এটা ছিল অ্যাডভেঞ্চার এক ধরনের। এ খেলা তারুণ্যের দুঃসাহসিকতায় ছিল ভরা, যে দুঃসাহসিকতার নেশা আজকের দিনের জীবনকেও চঞ্চল করে তোলে মধ্যে মধ্যে।
